- বি। দে । শ স | হ | জ | পা | ঠ
- আগস্ট ২১, ২০২৫
উপগ্রহ ছিনতাই, পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগে চাঁদে শক্তি দখল : মহাকাশই আগামীর যুদ্ধক্ষেত্র
মহাকাশ এখন শুধু বিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্র নয়, হয়ে উঠছে আগামীর যুদ্ধমঞ্চ। ট্যাঙ্ক, কামান, মিসাইলের সীমা পেরিয়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে কক্ষপথে। সম্প্রতি রাশিয়ার বিজয় দিবসে এ সত্য আরো একবার চাক্ষুষ হলো। একদিকে যখন চলছে কুচকাওয়াজ অন্যদিকে ইউক্রেনের টেলিভিশন স্যাটেলাইট হাইজ্যাক করে রুশপন্থী হ্যাকাররা সম্প্রচার করল মস্কোর সামরিক প্যারেডের দৃশ্য। ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ আচমকা টেলিভিশনে দেখলেন রুশ ট্যাঙ্কের গর্জন, অস্ত্রের ঝলকানি। প্রচলিত যুদ্ধের বাইরে গিয়ে এ ঘটনা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিল, সাইবার স্পেস ও আউটার স্পেসই হয়ে উঠছে ২১ শতকের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র।
বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে প্রায় ১২,০০০ সক্রিয় স্যাটেলাইট। জিপিএস থেকে শুরু করে ইন্টারনেট, সামরিক নজরদারি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থা—সবকিছুর নিয়ন্ত্রক এই কৃত্রিম উপগ্রহরাই। আর তাই, সেগুলিই হয়ে উঠেছে প্রতিপক্ষের সহজ শিকার। নেটরাইজ সংস্থার প্রধান নির্বাহী তথা প্রাক্তন মেরিন কর্পস অফিসার টম পেস বলেছেন, ‘স্যাটেলাইটের সঙ্গে পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যাহত হলে বিশাল বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। ভাবুন তো, যদি হঠাৎ জিপিএস বন্ধ হয়ে যায়, কী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে !’ স্যাটেলাইট হাইজ্যাকের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় মার্কিন স্যাটেলাইট পরিষেবা সংস্থা ‘ভিয়াসত’-এর সংযোগ হ্যাকারদের হাতে আক্রান্ত হয়। কিয়েভের অভিযোগ, রাশিয়ার মদতেই এ সাইবার হানা। লক্ষাধিক মডেমে ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্ধ করে দেওয়া হয় পরিষেবা। আমেরিকার আশঙ্কা, রাশিয়া গোপনে তৈরি করছে এক ভয়ঙ্কর মহাকাশ-অস্ত্র, যা এক ধাক্কায়
নিম্ন-কক্ষপথের প্রায় সমস্ত স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে সক্ষম। শুধু বিস্ফোরণ নয়, এই অস্ত্রের সঙ্গে থাকবে নিউক্লিয়ার ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস প্রযুক্তিও, যা পুরোপুরি ভস্ম করে দেবে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি।
রাশিয়ার এ অস্ত্র যদি কখনো বাস্তবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে অন্তত এক বছর ধরে মহাকাশে কোনো কার্যকর স্যাটেলাইট কাজ করবে না। তাতে না থাকবে নেভিগেশন, না থাকবে সামরিক নজরদারি, বিপর্যস্ত হবে আধুনিক জীবন, বাণিজ্য, এমনকি পরমাণু হামলার সম্ভাবনাও থেকে যাবে অনুধারিত। আমেরিকার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক টার্নার এহেন পরিস্থিতিকে আখ্যা দিয়েছেন, ‘মহাকাশের কিউবান মিসাইল সংকট’ বলে। তাঁর মন্তব্য, ‘এটি স্পুটনিকের মতোই এক যুগান্তকারী ঘটনা। কিন্তু স্পুটনিক মহাকাশ যুগের শুরুয়াৎ করেছিল, এটি তার সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।’ তবে এখানেই শেষ নয়। শুধু কক্ষপথ নয়, এখন নতুন লড়াইয়ের ময়দান চাঁদ-ও।
নাসার-এর ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক শন ডাফি জানিয়েছেন, চাঁদে ছোট একটি পারমাণবিক চুল্লি বসাতে চলেছে আমেরিকা। উদ্দেশ্য, শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের চন্দ্রঘাঁটি গড়ে তোলা। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘চিন বা রাশিয়ার আগে আমরাই সেখানে পৌঁছতে চাই। চাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলি দখল করতে চাই। আমেরিকার জন্য।’
শন ডাফি জানিয়েছেন, চাঁদে রয়েছে একধরণের দুর্লভ পদার্থ, হেলিয়াম-৩। যা বিজ্ঞানীদের মতে, পারমাণবিক ফিউশন প্রযুক্তিতে এটি বিপুল শক্তি উৎপাদনে সহায়ক হতে পারে। যদিও সে প্রযুক্তি এখনো বাস্তবতা থেকে বহু দূরে, কিন্তু তা ঘিরে এখন থেকেই শুরু হয়েছে কূটনৈতিক এবং মহাকাশ রণনীতি। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জোসেফ রুকে বলেন, ‘এটা কোনো সায়েন্স ফিকশন নয়। বাস্তব আগামীর দিকে দ্রুত ছুটছে। ভবিষ্যতের শক্তির চাবিকাঠি যে দখল করবে, সেই-ই হবে আসল ক্ষমতাধারী।’ চাঁদ ও মহাকাশে আগ্রাসনের অভিযোগে চিন অবশ্য দায় চাপিয়েছে আমেরিকার ঘাড়ে। ওয়াশিংটনে চিনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রই মহাকাশকে যুদ্ধক্ষেত্র করে তুলছে। সামরিক জোট তৈরি করছে, অস্ত্র মোতায়েন করছে। আমরাই বরং চাই, মহাকাশে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় থাকুক।’
উল্লেখ্য, মহাকাশে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায়, ২০১৯ সালে গঠিত হয় ‘ইউএস স্পেস ফোর্স। যদিও এখনও তুলনামূলকভাবে ছোট বাহিনী, তবে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এর ক্ষমতা। তাদের লক্ষ্য, মহাকাশকে রক্ষা করা, স্যাটেলাইটকে সুরক্ষা দেওয়া, এবং প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জবাবি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মার্কিন স্পেস ফোর্সের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘মহাকাশ এখন নতুন এক যুদ্ধক্ষেত্র। এই ক্ষেত্র দখল ও নিয়ন্ত্রণ করাই আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম লক্ষ্য।’ বিজ্ঞান মহলে প্রশ্ন উঠছে, অদূর ভবিষ্যতে কি সত্যিই ‘মহাকাশ যুদ্ধ‘ হতে চলেছে? তা হলে ধ্বংসের পরিমাপ যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা এখনো অজানা। আশঙ্কা অমূলক নয়, কিন্তু রাশিয়া, চীন এবং আমেরিকার গতিপ্রকৃতি দেখলে স্পষ্ট, মহাকাশে আধিপত্যের লড়াই এখন বাস্তব। প্রযুক্তির সঙ্গে কূটনীতি, আর কূটনীতির সঙ্গে ক্ষমতার লড়াই, সব মিলিয়ে মহাকাশ ক্রমশ হয়ে উঠছে নতুন ভূ-রাজনৈতিক রণভূমি।
❤ Support Us








