Advertisement
  • খাস-কলম
  • আগস্ট ৭, ২০২৫

জাতিসত্তার অট্টহাসি

তপোধীর ভট্টাচার্য
জাতিসত্তার অট্টহাসি

অসমে সুকৌশল দমননীতি ও নৈরাজ্যিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। ওয়াকিব মহলের ধারণা, যে-কোনো মুহূর্তে শাসনের নামে শোষণ বাড়িয়ে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে – ১৯৬১, ১৯৭২ কিংবা ১৯৭৯, ১৯৮৩-র রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির মতোই। সম্প্রতি, নাগরিক অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত (সি আর পি সি) সমন্বয় কমিটি ও কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বানে, দিন কয়েক আগে, শিলচরের সি টি ভি চত্বরে বরাকের তিন জেলার বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, ভাষিক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু আর উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে যে-কায়দায় তাঁদের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং উচ্ছেদিত মানুষের গণতান্ত্রিক প্রতিরোধকে নির্মূল করতে যে-ভাবে গুলি চালানো হয়েছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, গভীর সংকটের পূর্বাভাস। সি আর পি সি তার উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

সাম্প্রতিককালে, কোনো ইস্যুতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এরকম ক্ষোভের ঐক্য দেখা যায়নি। শাসকের নিযুক্ত প্রতিনিধিরা প্রকান্তরে হুমকি দিয়ে বলেছেন, লোকগণনায় বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী মাতৃভাষা লেখালে তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ হিসাবে শনাক্ত করা হবে। বিহারের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের মতো, অসমেও ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। সি আর পি সি-র সভায়, সবার সম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে, বরাক উপত্যকার তিন জেলায় সম্মেলিত প্রতিবাদ করা হবে। ২৮ জুলাই এর-প্রস্তাব অনুযায়ী সভায়, পথসভায়, পথ হাঁটায় সামাজিক যে-ক্রোধ দেখা গেল, তা কোথাও সীমা লঙ্ঘন করেনি, কিন্তু তার ক্ষোভ আর অঙ্গীকার বৃহত্তর ঐক্যর সঙ্গে গলা মেলাল। সজল উচ্চারণে ঘোষণা করা হয়, ১. নিরপরাধ মানুষের উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে। ২. রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষার মর্যাদা কাউকে খাটো করতে দেওয়া হবে না। ৩. বিহারের মডেলে অসমের ভোটার তালিকা সংশোধনের চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে। ৪. ভারতের রাষ্ট্রপতি, অসমের রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী, ভারতের মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে এসব বিষয় উল্লেখ করে স্মারকপত্র দেওয়া হবে।

সে দিনের সভায়, সি আর পি সি-র কো-চেয়ারম্যান সাধন পুরকায়স্থ বলেছেন, জনগণের ওপর জনগণেরই নির্বাচিত সরকার যে-ধরণের নক্কারজনক অত্যাচার শুরু করেছে, তা ভারতের ঐতিহ্য, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী। ব্যপক ঐক্য গড়ে তুলে মানবিক প্রতিরোধ ছাড়া ভিন্নতর উপায় আর নেই। সভামুখ্য হিসাবে লক্ষ্য করলাম, সবস্তরের প্রতিনিধিদের, বিশেষ করে ভাষিক আর ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ নিশ্চুপ বসে থাকল না। সরব সবাই। বলতে আর ভাবতে ভালো লাগছে, ১৯৬১, ১৯৭২, ১৯৭৯-এর সংকটকালেও আমরা এরকম সুদৃঢ় ঐক্য, মর্মের অঙ্গীকার, বলিষ্ট প্রত্যয় দেখিনি। নানা ফাঁদ তৈরি করে শাসক ওইসব সময়ে জাল বিছিয়ে, বিষবৃক্ষের বীজ ছড়িয়ে দিয়েছিল। আজ আর তা সম্ভব না।

বাঙালি ঘরে-বাইরে আক্রান্ত। মূল বঙ্গীয় সমতটের বাইরে বাঙালি ভোটার আজ এক মহাশক্তি। তাদের শত্রু ভাবছে কুচক্রী শাসক। সুযোগ পেলেই অনুপ্রবেশকারী, ঘুসপেটিয়া, বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আখ্যান জুড়ে দিচ্ছে। এ-এক মহাপাপ। এ পাপের সদুত্তর দেবে আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সমগোত্রীয় সামাজিকতা। যারা বলছে, বাংলাভাষা বলে কোনো ভাষা নেই। তাঁরা যে কত মূর্খ, কত নির্বোধ এবং বঙ্গভূমি, বঙ্গভাষা, বঙ্গসংস্কৃতির দন্তহীন কবন্ধ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এঁদের আচরণ দেখে মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে হাসছেন মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বাণীকান্ত কাকতি, তারাপুরওয়ালার মতো বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের মহাজনেরা। হাসছেন নীহাররঞ্জন, সূর্যকুমার ভুঁইয়া, এনামুল হক। শূন্যে যাঁর সত্তা শাশ্বত চিহ্ন নিয়ে উড়ে বেড়ায়, জাগিয়ে তোলে আমাদের বহুভাষিকের ভাষাচেতনাকে, সেই কালজয়ী হরিনাথ দে ও হো হো করে বিদ্রূপ করছেন – এ কোন্ মগের মুলুক তৈরি করছ মৌনীবাবারা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!