Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুন ২৪, ২০২৬

‘এসআইআর’-এর জেরে কার্ড বাতিল, ঝুঁকির মুখে কয়েক লক্ষ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘এসআইআর’-এর জেরে কার্ড বাতিল, ঝুঁকির মুখে কয়েক লক্ষ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের রেশন ব্যবস্থার আওতা থেকেও ছেঁটে ফেলার ঘোষণা করেছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। এ সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধিতা করে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেতমজুর সমিতি। কিন্তু এ মুহূর্তে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ না করে আবেদনকারীকে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার, বিচারপতি বি ভি নাগারথনা ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, রেশন কার্ড সংক্রান্ত প্রশ্নটি একটি পৃথক ‘কজ অব অ্যাকশন’ বা স্বতন্ত্র আইনি বিষয়ের আওতায় পড়ে। ফলে তা নিয়ে প্রথমে হাই কোর্টেই যেতে হবে।

‘পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেত মজুর সমিতি’র তরফে শীর্ষ আদালতে দাবি করা হয়, ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার ফলাফলকে জোরপূর্বক রাজ্যের গণবণ্টন ব্যবস্থা (পিডিএস) এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করছে রাজ্য সরকার। এর জেরে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ খাদ্য নিরাপত্তার অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। সংগঠনের আইনজীবী প্রসন্ন এস জরুরি ভিত্তিতে মামলাটি শুনানির আর্জি জানিয়ে আদালতে বলেন, ‘যাঁদের নাম এসআইআর-এ বাদ পড়েছে, তাঁদের রেশন তালিকা থেকেও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভয়ংকর সমস্যায় পড়তে পারেন।’ আইনজীবীর বক্তব্য শুনে বিচারপতি নাগারথনা জানতে চান, আবেদনকারী কেন কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হননি!

আইনজীবী তখন আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান, ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়াকে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয়, রেশন কার্ড কিংবা খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের প্রশ্নটি সম্পূর্ণ আলাদা। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ভোটার তালিকা সংশোধন ও রেশন সুবিধা প্রাপ্তির মধ্যে সরাসরি আইনি সম্পর্ক আছে কি না, তা পৃথক ভাবে বিচার্য। বিতর্কের সূত্রে ৪ জুনের একটি সরকারি নির্দেশিকা। ওই দিন পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য ও সরবরাহ দফতর রাজ্য জুড়ে বিশেষ যাচাইকরণ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেয়। উদ্দেশ্য ছিল, গণবণ্টন ব্যবস্থার আওতায় থাকা অযোগ্য উপভোক্তাদের চিহ্নিত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। নির্দেশিকায় বলা হয়, ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ায় যাঁদের নাম বাদ পড়েছে বা যাঁরা অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, তাঁদের তথ্যও যাচাই প্রক্রিয়ায় বিবেচিত হবে। সংগঠনের দাবি, এই নির্দেশ কার্যকর হলে পশ্চিমবঙ্গে ৩৫ লক্ষ থেকে ৬০ লক্ষ মানুষের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নবান্ন সূত্রে জানানো হয়েছিল, যাঁদের ‘অ্যাবসেন্টি, শিফটেড, ডেড অথবা ডুপ্লিকেট’ (এএসডিডি) ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাঁদের আবেদন ‘এসআইআর’ চলাকালীন বাতিল হয়েছে অথবা যাঁদের নাম পরবর্তী শুনানির পরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের বিষয়েও খতিয়ে দেখা হবে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তথ্যপত্র বিলির সময় যাঁদের ‘এএসডিডি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁরাও এই যাচাইয়ের আওতায় থাকবেন। তবে খাদ্য দফতর একই সঙ্গে জানিয়েছে, যাঁরা ‘এসআইআর ট্রাইব্যুনাল’-এ আবেদন করেছেন অথবা ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ (সিএএ)-এর আওতায় আবেদন জমা দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট আপিল বা আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের রেশন কার্ড সক্রিয় থাকবে।

আবেদনকারী সংগঠনের দাবি, খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রকল্পে সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোটার তালিকার অবস্থানকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা ‘জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন’-এর মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হবে। সংগঠনের বক্তব্য, খাদ্য নিরাপত্তা কোনো নির্বাচনী বা নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না। অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল মানুষদের খাদ্যশস্য পাওয়ার অধিকার ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না-থাকার উপর নির্ভর করতে পারে না। আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, রাজ্য সরকারের নয়া নীতির ফলে রাজ্যে ৩৫ লক্ষ থেকে ৬০ লক্ষ মানুষের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ। আবেদনকারীদের বক্তব্য, রাষ্ট্র এক বার কোনো জনকল্যাণমূলক সুবিধা প্রদান করলে তা হঠাৎ করে প্রত্যাহার করা যায় না। তা কল্যাণরাষ্ট্রের মৌলিক নীতির বিরোধী।

সংগঠনের বক্তব্য, ‘পিডিএস’ এমন একটি কল্যাণমূলক ব্যবস্থা, যার মূল উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল পরিবারগুলিকে ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা প্রদান করা। দরিদ্র মানুষের হাতে ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যশস্য পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এ ব্যবস্থার সৃষ্টি। একই ভাবে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র লক্ষ্য আর্থিক ভাবে অসচ্ছল মহিলাদের সহায়তা করা। ফলে এ ধরনের প্রকল্পে সুবিধা পাওয়ার প্রশ্নকে ভোটার তালিকার সংশোধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা আইনের উদ্দেশ্যকে বিকৃত করতে পারে। যদিও সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। বেঞ্চের মতে, প্রথমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন যে আবেদনটির প্রকৃত ভিত্তি ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া, না কি খাদ্য দফতরের পৃথক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। সে কারণেই বিষয়টি নিয়ে প্রথমে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। ফলে পশ্চিমবঙ্গে ‘এসআইআর’ এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের যোগসূত্র নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার পরবর্তী আইনি লড়াই আপাতত গড়াতে চলেছে কলকাতা হাই কোর্টের দোরগোড়ায়। সেখানেই আপাতত এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে— ভোটার তালিকা সংশোধনের ফল কি আদৌ খাদ্য নিরাপত্তার মতো মৌলিক কল্যাণমূলক অধিকারের উপর প্রভাব ফেলতে পারে?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!