- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ৫, ২০২৬
ত্রিশঙ্কু তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের পথে থালাপতি বিজয় ? মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা স্ট্যালিনের
দ্রাবিড় রাজনীতির দীর্ঘ সাত দশকের পরিচিত সমীকরণ বদলে গেছে আচমকাই। ডিএমকে-আইডিএমকে-সহ পোড়খাওয়া রাজনৈতিক দলগুলিকে কার্যত ধূলিসাৎ করে অভিনেতা-রাজনীতিক বিজয়ের নেতৃত্বাধীন তামিলগা ভেত্ত্রি কাঝাগম আত্মপ্রকাশের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনেই ২৩৪ আসনের মধ্যে ১০৮টি দখল করে একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে স্ট্যালিনের দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম বা ডিএমকে দ্বিতীয় স্থানে নেমে এসেছে। সাত দশক ধরে রাজ্যের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসা দ্রাবিড় দ্বৈত আধিপত্যের ভিতর এ ফল নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক বাঁক।
ডিএমকে সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন এম কে স্ট্যালিন। রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আর্লেকর-এর কাছে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। সোমবার ফলপ্রকাশের পর থেকেই ডিএমকে শিবিরে অস্বস্তির আবহ স্পষ্ট ছিল। সন্ধ্যায় দলীয় সদর দফতরে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের পর সমাজমাধ্যমে স্ট্যালিন লিখেছিলেন, ‘আমি বড়ো জয়ও দেখেছি, পরাজয়ও দেখেছি। এত দিন ডিএমকে আদর্শ শাসক দল হিসেবে কাজ করেছে, এ বার আদর্শ বিরোধী দল হিসেবে কাজ করবে।’ তাঁর এ বার্তার পরই মঙ্গলবার তাঁর পদত্যাগের খবর কার্যত ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্যকে আরও স্পষ্ট করে দিল। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে রাজভবনের তরফে এখনো কোনো ঘোষণা করা হয়নি।
তামিলনাড়ুর ২৩৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮ বিধায়কের সমর্থন। কিন্তু ফলাফলে কোনো দলই সেই ‘জাদু সংখ্যা’য় পৌঁছতে পারেনি। বিজয়ের দল একশোর বেশি আসনে জয় নিশ্চিত করেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোরগোড়ায় এসে থেমে গিয়েছে। ফলে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যে একমাত্র তামিলনাড়ুতেই ঝুলন্ত বিধানসভার ছবি। তবে এ নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাৎপর্য কেবল ত্রিশঙ্কু বিধানসভা নয়। আরও গভীর এবং ঐতিহাসিক বিষয় হলো— তামিলনাড়ুর মানুষ এ বার যেন একসঙ্গে বিদায়বার্তা শুনিয়ে দিয়েছেন দুই দ্রাবিড় প্রধান দলকে। দীর্ঘ প্রায় ছয় দশক ধরে রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ডিএমকে ও এআইএডিমকে। দ্রাবিড় অস্মিতা, আঞ্চলিক গর্ব, ভাষিক পরিচয় এবং সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতি ঘিরে দুই দল পালা করে শাসন করেছে রাজ্য। জাতীয় দল হিসেবে কংগ্রেস বহুবার চেষ্টা করেও দুই শক্তিকে সরাতে পারেনি।বিজেপিও ব্যর্থ। শেষ পর্যন্ত কখনো ডিএমকে, কখনো এআইএডিএমকে-র সঙ্গে জোট বেঁধেই এই সর্বভারতীয় দলগুলিকে রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রাখতে হয়েছে। সে ইতিহাসে ২০২৬ এক বিশেষ বছর— কারণ মাত্র ২ বছর আগে গড়া একটি দল প্রথম নির্বাচনে এসে দুই প্রতিষ্ঠিত দ্রাবিড় শক্তিকেই অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
ফলাফলের অঙ্কও সে পরিবর্তনের ভাষা বলছে। টিভিকে ২৩৪টির মধ্যে ১০৮টি আসনে জয় পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে। ডিএমকে এককভাবে ৫৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। তাদের নেতৃত্বাধীন সেক্যুলার প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের মোট আসন ৭৩। অন্য দিকে, প্রধান বিরোধী এআইএডিএমকে এককভাবে ৪৭টি আসন পেয়েছে। তাদের নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের ঝুলিতে গিয়েছে ৫৩টি আসন। এই অঙ্ক স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ভোটাররা কোনো একক শক্তির হাতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে দেননি। বরং তাঁরা পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামোর ভিতরেই নতুন সমীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে দিয়েছেন।
১৯৭১ সালের পর থেকে ডিএমকে কখনও টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এবারও সেই অদৃশ্য রাজনৈতিক জিনক্স কাটল না। বরং ফলাফলে পরাজিত হয়েছেন দলের একাধিক শীর্ষ নেতা ও বর্তমান মন্ত্রী। দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে চলচ্চিত্র তারকাদের ক্ষমতায় আসাও নতুন ঘটনা নয়। তামিলনাড়ুতে এক সময়ে এম.জি রামচন্দ্রন এবং জয়লতিতা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত করে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেছেন। প্রতিবেশী অন্ধ্রপ্রদেশে এন.টি রামা রাও একই পথে সফল হয়েছেন। স্বাধীন ভারতে দল গড়েই সরকার গঠনের নজিরও রয়েছে, প্রফুল্ল কুমার মহান্ত কিংবা অরবিন্দ কেজরীওয়াল তার উদাহরণ। কিন্তু মাত্র ২ বছর আগে দল গঠন করে, কোনো প্রতিষ্ঠিত জোটের ভরসা না নিয়ে, প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে একক শক্তিতে লড়ে রাজ্যের এক নম্বর দল হয়ে ওঠার নজির সত্যিই বিরল। চেন্নাই শহরের ১৬টির মধ্যে ১৪টি আসনে জয় পেয়েছে টিভিকে। সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা এসেছে কোলাথুর কেন্দ্রে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন পরাজিত হয়েছেন টিভিকে-র ভি এস বাবুর কাছে। উপমুখ্যমন্ত্রী উদয়নীধি স্ট্যালিন অল্প ব্যবধানে নিজের চেপক-তিরুভাল্লিকেনি আসন ধরে রাখতে পেরেছেন। অন্য দিকে, এআইএডিএমকে সাধারণ সম্পাদক এডাপ্পাড়ি কে পালানিস্বামী নিজের এডাপ্পাড়ি কেন্দ্র ধরে রেখেছেন। তবু সামগ্রিক ফলাফলে স্পষ্ট, দুই প্রধান দলের বহু দশকের অটল ঘাঁটিতেও ভোটারদের মনোভাব বদলেছে।
অন্যদিকে, নিজের লড়াইয়েও বিজয় ব্যক্তিগত ভাবে বড়ো সাফল্য পেয়েছেন। তিনি যে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন; পেরাম্বুর এবং তিরুচিরাপল্লি পূর্ব — ২ টিতেই জয়ী হয়েছেন। পেরাম্বুরে তাঁর জয়ের ব্যবধান ৫৩,৭১৫ ভোট, আর তিরুচিরাপল্লি পূর্বে ২৭,৪১৬ ভোট। দলীয় সূত্রের খবর, তিনি সম্ভবত একটি আসন ছেড়ে দিয়ে পেরাম্বুরই ধরে রাখবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্রাবির ভূমে ভোটের এ ফল সরল অর্থে ‘বিজয়-ঝড়’ নয়, আবার একরৈখিক সরকারবিরোধী ঢেউও নয়। বরং এর ভিতরে রয়েছে দুই স্তরের ক্ষোভ। প্রথমত, বিদায়ী শাসক ডিএমকে-র বিরুদ্ধে দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র, প্রশাসনিক আত্মতুষ্টি এবং মাটির স্তরে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে জনঅসন্তোষ। গত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা, নারীর নিরাপত্তা, মাদক সমস্যা এবং জাতিভিত্তিক সহিংসতার অভিযোগ বারবার উঠেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ডিএমকে এই অভিযোগগুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
দ্বিতীয়ত, জয়ললিতা-র মৃত্যুর পর এআইএডিএমকে-র ভিতরে যে দীর্ঘস্থায়ী অন্তর্দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেটিও ভোটারদের আস্থা ক্ষয়ে দিয়েছে। ফলে এক নতুন বিকল্পের জন্য জমি অনেকটাই প্রস্তুত ছিল। সে জায়গাতেই বিজয় রাজনৈতিক ভাবে সুবিধা পেয়েছেন। রাজ্যের মানুষের প্রত্যাশা, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মানসিকতা মাথায় রেখে তিনি দলীয় কর্মসূচি এবং নির্বাচনী ইস্তাহার সাজিয়েছিলেন। ভোটের দিন থেকেই আভাস মিলেছিল যে যুবসমাজের বড়ো অংশ নতুন দলের দিকে ঝুঁকছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সে স্রোতই শেষ পর্যন্ত ভোটবাক্সে বাস্তব রূপ পেল। যুব ভোট, শহুরে মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ক্লান্তি— এই তিনের সমাবেশেই টিভিকে-র উত্থান।
ফলাফলের পরে সরকার গঠন নিয়ে এখন শুরু হয়েছে নতুন অঙ্ক। রাজ্যপালের কাছে সরকার গঠনের দাবি জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে টিভিকে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য সময় চাওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের খবর, কংগ্রেস ইতিমধ্যেই বিজয়কে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের আগে জোট গঠনের প্রস্তাব কংগ্রেস প্রত্যাখ্যান করেছিল— সে রাজনৈতিক স্মৃতি মাথায় রেখে বিজয় এখনই হাত শিবিরের সঙ্গে হাত মেলাবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, সরকার গঠনের জন্য বিজয় ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র জোটে থাকা ছোট দলগুলির সমর্থন আদায়ের পথেও এগোতে পারেন। কংগ্রেস, ভিসিকে, সিপিআই এবং সিপিএম-সহ কয়েকটি দলও বিজেপিকে দূরে রাখতে সম্ভাব্য বাহ্যিক সমর্থনের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান খতিয়ে দেখছে। ফলে আগামী কয়েক দিনের রাজনৈতিক দরকষাকষি তামিলনাড়ুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা পি চিদাম্বরম বিজয়কে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, তামিলনাড়ুর মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। রাহুল গান্ধিও ফোনে বিজয়কে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই জনাদেশ যুবসমাজের ক্রমবর্ধমান কণ্ঠস্বরের প্রতিফলন।’
❤ Support Us







