- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- আগস্ট ৯, ২০২৫
‘খালিদের শিবাজি’ ঘিরে উত্তাল মহারাষ্ট্র ! ছবি বন্ধের দাবিতে কেন্দ্রকে চিঠি মহারাষ্ট্র সরকারের
ছবি এখনো মুক্তি পায়নি, মুক্তি পেয়েছে শুধু ট্রেলার। তাতেই তোলপাড় রাজ্য-রাজনীতি। ‘ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ’-কে নিয়ে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে বিতর্কিত মারাঠি ছবি ‘খালিদের শিবাজি’ বন্ধের দাবি জানিয়ে কেন্দ্রকে চিঠি পাঠাল মহারাষ্ট্র সরকার। কট্টরপন্থী গোষ্ঠীদের চাপের মুখে দাঁড়িয়ে রাজ্যের শাসক বিজেপি নেতৃত্ব এ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের। এহেন পরিস্থিতিতে অস্বস্তিতে মহারাষ্ট্র সরকার। ক-দিন আগেই সংস্কৃতি দফতরের তরফে জানানো হয়েছিল, ‘খালিদ কা শিবাজী’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয়েছে, এ এক গর্বের মুহূর্ত মারাঠি সিনেমার পক্ষে। স্বয়ং সংস্কৃতি মন্ত্রী আশীষ শেলার প্রশংসা করেছিলেন ছবি ও নির্মাতাদের। কিন্তু বিতর্ক ঘনীভূত হতেই ভোল পাল্টেছে প্রশাসন।
ছবির ট্রেলারে দেখানো হয়েছে, এক মুসলিম কিশোর খালিদ ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠে। ব্যস, তাতেই ক্ষুব্ধ হিন্দু মহাসঙ্ঘ-সহ একাধিক ডানপন্থী সংগঠন। ছবির বিরুদ্ধে রাজ্য জুড়ে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। হিন্দু মহাসঙ্ঘের সভাপতি আনন্দ ডেভ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘এই সিনেমায় শিবাজী মহারাজকে ধর্মনিরপেক্ষ দেখাতে চায়, যা আমাদের মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। শিবাজী কেবল হিন্দুদের, মারাঠাদের —এমন ঐতিহাসিক চরিত্রকে ভিন্য ধর্মের অনুপ্রেরণার উৎস দেখানো মানেই ইতিহাস বিকৃতি।’ তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘ছবিটি যদি নিষিদ্ধ না হয়, তবে আমরা রাজ্যের প্রেক্ষাগৃহে বিক্ষোভ করব। বিশেষ করে পুনে ও গ্রামীণ মহারাষ্ট্রে কোনো হলে এই ছবি চলবে না।’ ছবি নিয়ে সরব হয়েছেন রাজ্যের সংস্কৃতি ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আশীষ শেলার। তাঁর দাবি, ‘ইতিহাসের বিকৃতি সহ্য করা হবে না। কীভাবে ছবিটি সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেল, খতিয়ে দেখা হবে। এমনকি কান চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হওয়ার পেছনেও কোনো চক্রান্ত আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।’ বিতর্কে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সদ্য বিজেপি ছেড়ে বেরোনো গোশামহল বিধায়ক টি রাজা সিংও। তাঁর দাবি, ‘এখানে শিবাজী মহারাজকে হেয় করছে। ট্রেলারে বলা হচ্ছে, তাঁর সেনাবাহিনীতে মাত্র ৩৩ শতাংশ হিন্দু ছিলেন, বাকি মুসলিম। রায়গড় দুর্গে মসজিদ তৈরি করিয়েছেন তিনি। মুসলিমদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণা, এমন ধারণা চালিয়ে দেওয়া মানে ইতিহাস বিকৃতি। আমরা যেখানে এই ছবি দেখানো হবে, সেসব প্রেক্ষাগৃহ আমরা জ্বালিয়ে দেব।’
অন্যদিকে, কংগ্রেস সচিন সাওয়ান্তের দাবি, শুধুমাত্র ট্রেলার দেখে ছবি বন্ধের দাবি কোনো যুক্তিসম্মত অবস্থান হতে পারে না। বরং এর ফলে শিবাজিকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় চেতনার গণ্ডিতে বেঁধে ফেলার অপচেষ্টা করছে বিজেপি। তাঁর প্রশ্ন, ‘খালিদের কাছে শিবাজি মহারাজ আদর্শ হতে পারেন না কেন? মুসলিমদের কাছে শিবাজি অনুপ্রেরণা হলে বিজেপির এত আপত্তি কোথায়?’ তাঁর মতে, শিবাজি মহারাজ ছিলেন ‘রায়তের রাজা’, কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়। সাওয়ান্ত আরো বলেছেন, ‘শুধু হিন্দুত্বের প্রতীক করে শিবাজিকে সংকীর্ণ ভাবধারায় আটকে ফেলতে চাইছে বিজেপি। অথচ ইতিহাস বলে, শিবাজির সেনাবাহিনীতে বহু মুসলিমদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। এমনকি, তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ছিলেন এক মুসলিম সেনানায়ক।’ রায়গড় দুর্গে মসজিদ নির্মাণ নিয়েও ঐতিহাসিক প্রমাণ তুলে ধরেছেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর দাবি, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ জি.এস. সরদেশাই রচিত ‘নিউ হিস্ট্রি অব দ্য মারাঠাস’ বইয়ে স্পষ্টভাবে লেখা আছে, শিবাজি তাঁর মুসলিম সৈনিকদের কথা ভেবেই রায়গড় দুর্গে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। একই তথ্য পাওয়া যায় শংকর বিষ্ণু আউলাসকর রচিত ‘রায়গড়চি জীবন্তকথা’ গ্রন্থেও। মহারাষ্ট্র রাজ্য সাহিত্য পরিষদ সেই গবেষণার প্রামাণ্যতা স্বীকার করেছে। কংগ্রেস নেতার আরো অভিযোগ, বিজেপি-শাসিত দেশে ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’, ‘দ্য কেরালা স্টোরি’-র মতো বহু ইতিহাসবিকৃত ছবি বিনা বাধায় মুক্তি পায়, অথচ ইতিহাসনিষ্ঠ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্মিত ছবি দেখেই শাসকদলের গাত্রদাহ শুরু হয়।
উল্লেখ্য, ছবিটির পরিচালক রাজ প্রতীম মোড়ে ২০১৯ সালে তাঁর মারাঠি ছবি ‘খিস্সা’র জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর নতুন ছবি ‘খালিদের শিবাজি’ এ বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয়, যা মারাঠি ছবির পক্ষে একটি গর্বের মুহূর্ত বলে অনেকে মনে করছিলেন। মহারাষ্ট্র সরকার সূত্রে খবর, পরিচালক এবং প্রযোজকের কাছে ইতিমধ্যেই কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে ছবির মুক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। এ দিকে শিল্পী-সংস্কৃতিক মহলের একাংশ বলছেন, সৃজনশীল স্বাধীনতার গায়ে আবার তরবারির আঘাত পড়েছে। আরেকাংশ বলছেন, ইতিহাসের নামে অনুভূতিতে আঘাত করলে তার প্রতিক্রিয়াও তো আসবেই। ফলে নানা মুনির নানা মতে, কট্টরপন্থীদের হুঁশিয়ারির তোপে ‘খালিদের শিবাজি’ ডানা মেলার আগেই মারাঠা রাজ্যে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। ইতিহাস ও পরিচয় রাজনীতির কেন্দ্রে এনে বিজেপি নতুন করে শিবাজির নাম ভাঙিয়ে মেরুকরণের পথে হাঁটছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
❤ Support Us







