Advertisement
  • খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
  • আগস্ট ৪, ২০২৩

বাংলাদেশে শাসন করবে কে , ঠিক করবে বাংলাদেশেরই জনগণ। শিকড় খোঁজার ক্ষমতা তাদের প্রগাঢ়, বিস্ময়কর

পঙ্কজ শরণ
বাংলাদেশে  শাসন করবে কে , ঠিক করবে বাংলাদেশেরই জনগণ। শিকড় খোঁজার ক্ষমতা তাদের প্রগাঢ়, বিস্ময়কর

চিত্র: সংবাদ সংস্থা

বহু কারণেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উচ্চশিখরে আসীন। একই ইতিহাস, ভূপ্রকৃতি ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণের ধারক দুই দেশ।এসব কারণেই দুই দেশের মধ্যে যেমন রয়েছে অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক, আবার কখনো ফাটলও দেখা দেয় । এই দুটি বাস্তবতারই মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। কিন্তু প্রতিটি সুসময় এবং দুঃসময়ের পর বাস্তবতা আমাদের মুখের দিকে তাকায়—আমাদের দুই দেশের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। দুই দেশেরই নেতৃবৃন্দের বাস্তবতা গ্রহণের পরিণতি বোধ থাকতে হবে এবং বুঝতে হবে যে, সার্বভৌমত্ব বলতে আমরা যে আপসহীন বিষয়টি বিশ্বাস করতে চাই, ব্যাপারটা আসলে সেরকম নয়। এর মানে এরকম নয় যে, রাজনৈতিক সীমান্ত অথবা আঞ্চলিক সংহতি, অথবা জাতিসংঘের চার্টারে উল্লিখিত নিয়মকানুনগুলোর সঙ্গে আপস করতে হবে। ভারত ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কল্পনার চেয়েও বেশি দূরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এক দেশের উন্নয়ন আরেক দেশেও প্রতিফলিত হয়। যার পর সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ একটি বিদ্যমান বাস্তবতা। সেই হিসাবে দুই দেশেরই সার্বভৌম স্বার্থ খাপ খাইয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এ কথা হয়তো দুই দেশেরই জাতীয়তাবাদী এবং পিউরিস্টদের কাছে সুখকর মনে হবে না। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য সত্য।

আমার কর্মজীবনের একটি বড়ো সময় আমি বাংলাদেশে কাটিয়েছি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর কাজ করেছি। আমি দুদেশের সম্পর্কের ওঠানামা দেখেছি এবং দেখেছি—এক দেশের ভাগ্যের সঙ্গে আরেক দেশ কীভাবে জড়িত । আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম নিজেদের দেশের ভবিষ্যত্ নির্ধারণ করছে। এক হিসাবে এটি খুবই ভালো লক্ষণ। কারণ এটা নিজস্ব আত্মপরিচয় তৈরি করে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর থেকে শুরু করে যে পরিমাণ ঝড়-ঝঞ্ঝা গেছে তার থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে নিজেদের মেধাদক্ষতা তারা বুঝতে পারবে। গ্রাম ও শহরগুলোতে বাংলাদেশ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দেশ পরিচালনা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। পাকিস্তানের সময়ের বা ব্রিটিশ আমলের চেয়ে আজকের বাংলাদেশি নতুন প্রজন্ম নিজেদের অনেক বেশি দেখতে পারছে ।

তথাপি আত্মপরিচয়ের জন্য যুদ্ধ এখনো অনেক বাকি । রাজনীতি, সংস্কৃতি সামাজিক আচার-আচরণ জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এই প্রশ্ন জড়িয়ে আছে । এমন কি স্পর্শকাতর জাতীয়তার রয়েছে বিকল্প ব্যাখ্যা, রয়েছে ইতিহাসের বিকৃতি । আজও কেউ কেউ বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে প্রশ্ন করেন । এবং প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশ সত্যিই স্বাধীন কি না । এক হিসাবে সবকিছু নিয়েই তো বিতর্ক করা যায়, কোনোকিছুই চিরন্তন বা স্থির নয় । বাংলাদেশের শেকড় কতটা ভাষাভিত্তিক এবং কতটা ইসলামি পরিচয়ের—সেই প্রশ্ন এখনো ঘুরে বেড়ায়। এক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় ।

বাংলাদেশের ভূমি এবং রিসোর্সের চাপ রয়েছে। ১৯৭১ সালে এই দেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটির মতো। এখন জনসংখ্যা ১৭ কোটির কাছাকাছি। এদের বেশির ভাগই বয়স তিরিশ বছরের নিচে। তুলনা করলে দেখা যায়, এঁদের সংখ্যা রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চল ডুবে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে লবণাক্ত জল প্রবেশ করছে। এসব মানুষের কল্যাণ ও জীবনধারণের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। ১২ লাখ রোহিঙ্গার আরাকান থেকে অনুপ্রবেশ বাংলাদেশের ইকোসিস্টেমের ওপর আরো একটি আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত প্রতিবন্ধকতার পরও কয়েক বছরে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। যারা বাংলাদেশের সফলতা নিয়ে সন্দিহান ছিল, তাদের অবাক করে দিয়েছে।

সুস্পষ্ট অভিজ্ঞতা আর তথ্যের ভিত্তিতে এটা বলা যেতে পারে যে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের উত্থান এমন একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতির সঙ্গে যুগপত্ভাবে মিলে গেছে, যারা ভারতের সঙ্গে দ্রুত গতিতে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ভারতের সঙ্গে এই সুসম্পর্ক রক্ষা বাংলাদেশের জন্য কল্যাণকর ও লাভজনক হয়েছে। এটি অর্থনৈতিক সংহতি, কানেকটিভিটি, বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযোগ স্থাপনে বৃহত্ ও স্থায়ী উদ্যোগের অবতারণা করেছে । এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কৌশলগত ঐকমত্য । ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষা শুধু দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় ইতিবাচক অবদান রাখেনি, বরং এটি বাংলাদেশের জন্যও মঙ্গলজনক হয়েছে সার্বিকভাবে। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সেই মৌলিক চুক্তিতে ফিরে গেছে, যা একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে তার উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছিল। সেই নীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে বাঙালি পেয়েছিল মুক্তির অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারণা ও চেতনা দাঁড়িয়ে রয়েছে এসব নীতির ওপর। পরপর দুটি এবং আরেকটি কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির সরকারের আমলে বাংলাদেশের প্রতি দিল্লির নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। আরেকটি কথা, এই সময় গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতি ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের ক্ষেত্রেও এটি তৈরি করেছে এক অনন্য উদাহরণ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ভারত যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। এমনকি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ভারতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সেভেন সিস্টারের অঞ্চলগুলোকে বিশেষ করে ভারতের মূল জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। এটি নিকটবর্তী কিংবা দূরবর্তী কোনো তৃতীয় পক্ষের নয়, বরং শুধু ভারত ও বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয়। তারাই আন্তঃক্রিয়াশীল জটিল শক্তির মোকাবিলা করে কীভাবে পারস্পরিক শান্তিময় পরিবেশে বসবাস করতে হয়, সে ব্যাপারে সম্যক অবগত। ভারতীয় উপমহাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার এটাই ভিত্তিমূল।

ভারতের কাছে বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে অগ্রাধিকার লাভ করে। এই দেশ ভারতের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির পরিসর থেকে বেরিয়ে যায় না। এর বিপরীতে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মনোযোগ দমকা হাওয়ার মতো ক্ষণস্থায়ী ও বিক্ষিপ্ত প্রকৃতির। এটা সব সময় সহায়ক নয়। বৃহত্তর বৈশ্বিক ক্যানভাসে খেলা ছাড়া বড়ো শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশ আবারও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশিরাও রাজনীতিতে আনন্দ বোধ করেন। বাংলাদেশের জনগণকে বাইরের হস্তক্ষেপ, জবরদস্তি, হুমকি বা প্রভাব ছাড়াই ভোট দিতে ও তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে দেওয়া উচিত। শাসনব্যবস্থা বেছে নেওয়ার অধিকার একমাত্র বাংলাদেশের জনগণের। গণতন্ত্র বাইরে থেকে রপ্তানিও করা যায় না। এই দেশের নিজস্ব শিকড় খুঁজে বের করার এবং এর লোকদের প্রতিভা অন্বেষণের উপায় ও সক্ষমতা রয়েছে।

ভারত আর বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে, আমাদের আশা করা উচিত যে, রাজনৈতিক শ্রেণি এবং বাংলাদেশি সমাজের অন্যান্য স্তম্ভ একে অন্যের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে ভারতের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক একীকরণ ও শক্তিশালী সম্পর্কের দিকেই অগ্রসর হবে। সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, এটি সম্ভব এবং এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িতও হয়েছে। এই সুবিধাগুলো সংরক্ষণ না করার কোনো কারণ নেই, বরং এর ওপর ভিত্তি করেই দুই দেশের সম্পর্ককে আরো উচ্চমাত্রায় উন্নীত করা মোটেও অসম্ভব নয়।

লেখক: ভারতের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ও রাশিয়ায় নিযুক্ত ভূতপূর্ব ভারতীয় রাষ্ট্রদূত


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!