Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • ডিসেম্বর ৮, ২০২৫

অজ্ঞাত মাঝি সরকারের প্রতি অটল আস্থা, এসআইআর-এ না জঙ্গলমহলের মূলনিবাসীদের। উদ্বেগে জেলা প্রশাসন

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অজ্ঞাত মাঝি সরকারের প্রতি অটল আস্থা, এসআইআর-এ না জঙ্গলমহলের মূলনিবাসীদের। উদ্বেগে জেলা প্রশাসন

রাজ্যে প্রায় শেষ পথে ‘এসআইআর’-এর প্রাথমিক কাজ। ১৬ ডিসেম্বর প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশ হবার কথা। তবে এখনো অনেক প্রান্তিক অঞ্চলে জমা পড়েনি সব ফর্ম। তড়িঘড়ি কাজ শেষ করতে বদ্ধ পরিকর ইলেকশন কমিশন। চাপ বাড়ছে বিএলওদের উপরে। কিন্তু জঙ্গলমহলের গ্রামে প্রবেশ করতেই প্রশাসনের আধিকারিকদের সামনে যেন দেয়াল তুলে দাঁড়াল মূলনিবাসী মানুষজন। হাতে ফর্ম, সঙ্গে বোঝানোর সমস্ত যুক্তি, কিছুই কাজে এল না। ‘আমরা মাঝি সরকারের মানুষ। ভারতের নাগরিকত্ব লাগবে কেন?’— এই একটি কথাতেই থমকে গেল ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার পুরো উদ্যোগ।

বাঁকুড়ার রানিবাঁধ ব্লকের রাওতোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের মুচিকাটা ও ভেদুয়াশোল, দুটি গ্রামের মূলনিবাসী ভোটাররা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করবেন না। বরং আধার, ভোটার কার্ড–সহ সরকারি নথিই তাঁরা স্বেচ্ছায় জমা দিয়েছেন এক অজ্ঞাত পরিচয়ের সংগঠনের কাছে, যার নাম—‘সমাজবাদ অন্তঃরাষ্ট্রীয় মাঝি সরকার’। জেলার এসডিপিও অভিষেক যাদব, বিডিও অনীশা যশ এবং সঙ্গে থাকা পুলিশ–প্রশাসনের আধিকারিকেরা নেমেই বুঝে গিয়েছিলেন, আজকের কাজ সহজ নয়। হাতে এনুমারেশন ফর্ম, সঙ্গে আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রস্তুতি, সবই ছিল। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেল, গ্রামবাসীদের কাছে এসবের কোনো গুরুত্বই নেই। তাঁদের মুখে একটাই কথা—‘আমরা মাঝি সরকারের মানুষ।’

অধিকারিকরা যখন ‘এসআইআর’ ফর্ম পূরণের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে শুরু করেন, তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে উঠে আসে প্রতিবাদী সুর। কেউ বলেন, তাঁদের ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণের বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ বলেন, তাঁদের নিজেদের আলাদা পরিচয় আছে— আদি পরিচয়। আবার কেউ তীব্র ক্ষোভে প্রশ্ন করেন, বহু বছর যখন কোনও সরকারি সাহায্য তাঁদের কপালে জোটেনি, তখন আজ হঠাৎ এই তাগিদ কেন। প্রশাসনের যুক্তি যে তাঁদের কোনোভাবে টলাতে পারবে না, তা বুঝতে সময় লাগেনি। মাঝে মাঝে কথার উত্তেজনা এতটাই ঘন হয়ে উঠছিল, যে মনে হচ্ছিল যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এক যুবক এগিয়ে এসে বলে উঠলেন, ‘এত দিন তো আমাদের কেউ মনে রাখেনি। এখন কয়েকটা ফর্ম না-ভরায় এত মাথাব্যথা কেন? আমাদের ভাল-মন্দে কেউ আসে না। খিদে নিয়ে থেকেছি, আরও থাকব। এসআইআর-এ অংশগ্রহণ করব না।’ প্রশাসনের আধিকারিকেরা কোনো মতে পরিস্থিতি শান্ত রাখলেন, কিন্তু সমর্থন তো দূরের কথা, বিন্দুমাত্র নরম হল না গ্রামবাসীদের মন।

বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার ভোটাররা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তাঁদের পরিচয় মাঝি সরকারের দেওয়া কার্ডেই সার্থক। ভারতের আধার, ভোটার, প্যান কার্ড, এই সবই তাঁরা স্বেচ্ছায় জমা দিয়েছেন সেই সংগঠনের কাছে। প্রবীণ রামজীবন হাঁসদার বক্তব্য শুনলে মনে হবে যেন কোনো রাজকীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধি কথা বলছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তো আদি রাজা এই দেশের। ভারত তো পরে এসেছে। আমাদের জমি, জল, জঙ্গল ছিল শুরু থেকে। তা হলে আমাকে কেন প্রমাণ করতে হবে আমি এখানে থাকি? আমাদের ভোটদানের প্রয়োজন নেই। মাঝি সরকারের পরিচয়ই যথেষ্ট। যে চাকরি করে, সে রাজা কী করে ? তাই চাকরি ছাড়তে হয় মাঝি সরকারের পথে এলে।’ একই সুর লক্ষ্মীকান্ত হাঁসদার কথায়। তিনি আশ্চর্য বিশ্বাস নিয়ে বলেন, এ দেশে দুটি সরকার— গণতান্ত্রিক সরকার এবং মাঝি সরকার। আর তাঁরা যেহেতু মূলনিবাসী, তাই তাঁদের প্রকৃত আনুগত্য মাঝি সরকারের প্রতিই। আধার–ভোটার কার্ড তাঁরা বাতিল করেছেন, কারণ সেগুলো তাঁদের কাছে ‘বাইরের’ মানুষের কাগজপত্র। বাবুরাম কিস্কু তাঁর বক্তব্যকে আরও প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে দাবি করেন, ১৯৫১ সালে নয়াদিল্লি থেকেই নাকি মাঝি সরকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তাই তাঁদের নাগরিকত্বের প্রশ্নই ওঠে না। ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে, এ যুক্তিও কোনোভাবেই স্পর্শ করতে পারেনি তাঁদের মন।

শেষ পর্যন্ত অফিসারদের পরাজয় স্বীকার করেই গ্রাম ছাড়তে হল। জমা হয়নি কোনো ফর্ম, কাজে লাগেনি কোনো প্রতিশ্রুতি, শুধু রইল তাঁদের দৃঢ় ঘোষণা, তাঁরা ভারত সরকারের নাগরিক নন। এ ঘটনার জেরে উদ্বেগ কিন্তু শুধু প্রশাসনের গায়ে আটকে নেই। রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোড়ন পড়েছে। ট্রাইবাল ডেভলপমেন্ট কালচারাল বোর্ডের ডিরেক্টর ও তৃণমূলের এসটি সেলের সভাপতি গঙ্গারাম মুর্মুর মতে, এ সবের পেছনে রয়েছে এক সুপরিকল্পিত মগজধোলাই। তাঁর দাবি, ওড়িশা ও ছত্তিশগড় থেকে পরিচালিত ‘সমাজবাদ অন্তঃরাষ্ট্রীয় মাঝি সরকার’ নামের সংগঠন দরিদ্র আদিবাসীদের বাইরে নিয়ে গিয়ে শেখাচ্ছে— সরকার তোমাদের কিছুই দেয় না; তোমাদের প্রকৃত সরকার মাঝি সরকার। তাঁদের দেওয়া পরিচয়পত্রই আসল। তারপর এই ভুল ধারণা নিয়েই গ্রামের মানুষ ফিরে আসছেন। গঙ্গারাম মুর্মুর মতে, এটি নিছক ভুল বোঝানো নয়, বরং সাংবিধানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত। বিজেপি নেতা সুভাষ সরকারের কথায়,
‘ওঁরা কেন নিজেদের উন্নয়নের রাস্তা বন্ধ করছেন, বুঝতে পারছি না। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’ রাজ্যের মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর কথায়, কেউ মূলনিবাসীদের ভুল পথ দেখাচ্ছে, ভারতীয় নাগরিকত্ব অস্বীকার করার শিক্ষা দিচ্ছে। প্রশাসন ও পুলিশ নজরদারি করছে, যা যা আইনের আওতায় করা দরকার, সবই হবে।

এদিকে একই ছবি দেখা যাচ্ছে পুরুলিয়ার বান্দোয়ান বিধানসভায়। সেখানে কুকড়ুডাবর, ধবনী, পুকুরকাটা থেকে শুরু করে কালুডি, জোড়াশাল— বেশ কয়েকটি গ্রামে একইভাবে মাঝি সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, তাঁরা ভারতের নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে নারাজ। সুরেখা মুর্মু নামের এক বিক্ষুব্ধ মহিলা স্পষ্ট বলেন, সরকারি প্রকল্প তাঁদের কাছে কোনোদিন পৌঁছয়নি। তাঁরা বঞ্চিতই ছিলেন এবং বঞ্চিত থাকতেই আপত্তি নেই। তাই মাঝি সরকারের কার্ডই তাঁদের কাছে যথেষ্ট। দুই জেলার এহেন পরিস্থিতি মিলিয়ে জঙ্গলমহল জুড়ে নতুন এক চাপা উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। মাওবাদীদের দাপট থেমেছে বহু বছর। প্রশাসনের বহু চেষ্টায় শান্তির বাতাস ফিরে এসেছে। ঠিক এমন সময় গ্রামবাসীদের একাংশের এই অবস্থান নতুন প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে— যে মানুষদের দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন, সুবিধা, সুযোগের বাইরে থাকতে হয়েছে, তাঁদের এই ক্ষোভকে কি সহজেই ব্যবহার করা হচ্ছে কোনো ছায়া-সংগঠনের স্বার্থে? এই ভুল বোঝানো কি কেবল পরিচয়ের প্রশ্ন, না কি আরো বড়ো কোনো বিপদের ইঙ্গিত?

তবে, জেলা প্রশাসন বলছে, তারা এত সহজে হাল ছাড়ছে না। আবার তাঁরা ফিরবেন গ্রামগুলোয়। আবার বোঝাবেন, যুক্তি দেবেন, চেষ্টা করবেন যাতে ‘এসআইআর’-এর কাজ শেষ করা যায়। কিন্তু প্রশাসনও স্বীকার করছে, মানুষের মনে যদি ভুল ধারণা শিকড় গেঁড়ে বসে, তাকে উপড়ে ফেলা সহজ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অচলায়তন ভাঙবে কি না, মাঝি সরকারের প্রভাব কতটা গভীরে ঢুকেছে এবং জঙ্গলমহলের সামগ্রিক সামাজিক–রাজনৈতিক পরিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতখানি— এসব প্রশ্নই এখন অস্বস্তির মতোই ছায়া ফেলেছে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার প্রশাসনের অন্দরে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!