- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- অক্টোবর ১১, ২০২৫
রেয়ার আর্থ রফতানি নিয়ে শি কৌশলে ট্রাম্পের গুস্সা ! দক্ষিণ কোরিয়ায় আসন্ন বৈঠক বাতিল, দিলেন শতভাগ শুল্কের হুঁশিয়ারি
শক্তি প্রদর্শনের কূটনীতিতে আবারও তোপ দাগলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার এক নাটকীয় ঘোষণায় তিনি জানিয়ে দিলেন, আগামী ১ নভেম্বর থেকে চিনের পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক বসাতে চলেছে তাঁর প্রশাসন। শুধু তাই নয়, সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার-এর উপরও রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা ঘোষণা করেন তিনি।
তবে, শুধু শুল্কেই থেমে থাকেননি ট্রাম্প। এ মাসের শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়োজিত এশিয়া-প্যাসিফিক ইকনমিক কো-অপারেশন শীর্ষ সম্মেলনে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বহু প্রতীক্ষিত বৈঠক বাতিলের ইঙ্গিতও দিয়েছেন। ট্রাম্পের বলেছেন, ‘এই পরিস্থিতিতে শি-র সঙ্গে সাক্ষাতের আর কোনো মানে হয় না।’ ট্রাম্পের আচমকা ঘোষণায় শুধু আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল অবাক নয়, হতবাক মার্কিন শেয়ার বাজারও। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এনএএসডিএকিউ সূচক পড়েছে ৩.৬ শতাংশ এবং এস অ্যান্ড পি ৫০০ সূচক নেমেছে ২.৭ শতাংশ, যা গত ৬ মাসে সর্বোচ্চ পতন। ঘনঘন উক্তিমালার জন্য বিখ্যাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরক ভাষায় লিখেছেন, ‘চিন অদ্ভুত রকম আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। তারা গোটা বিশ্বকে বন্দি করে রাখতে চাইছে। এটি বিশ্ব রাজনীতির জন্য ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত।’
ওয়াশিংটন বলছে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণ চিনের উপর এমন রফতানি শুল্ক আরোপিত করা হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম দুর্লভ খনিজ রফতানির দেশ হিসাবে, বেজিং বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা ৫ টি নতুন উপাদানকে রফতানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনছে— হোলমিয়াম, এরবিয়াম, থুলিয়াম, ইউরোপিয়াম এবং ইটারবিয়াম। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডজনখানেক পরিশোধন প্রযুক্তি ও আধা-পরিবাহী ব্যবহারকারীদের উপর কড়া নজরদারি। অর্থাৎ, বিদেশি সংস্থাও এই নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়বে, যারা চিনা কাঁচামাল ব্যবহার করে তাদের দেশে উৎপাদন করে থাকে। মূলত, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সরবরাহ-শৃঙ্খলে নিজেদের একাধিপত্য বজায় রাখতেই বেজিংয়ের এই দৌর্বল্য, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।এই মুহূর্তে বিশ্বের মোট ‘রেয়ার আর্থ’ সরবরাহের ৯০ শতাংশেরও বেশি আসে চিন থেকে। এই উপাদানগুলি ব্যবহৃত হয় স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, যুদ্ধবিমান, রাডার এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি প্রযুক্তিতে। এমন এক সময়ে এই নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত এল, যখন আমেরিকার সঙ্গে সাময়িক ‘বাণিজ্যিক শান্তি’ বজায় ছিল বেজিংয়ের।
বেজিংয়ের ঘোষণার পরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন ট্রাম্প। তাঁর মতে, এটা চিনের তরফে ‘অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন আচরণ’ করা হচ্ছে এবং এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে কোনও আলোচনা করার মানে হয় না। তাঁর সাফ কথা, ‘আমি শি-র সঙ্গে বৈঠকে রাজি ছিলাম। কিন্তু এখন তো সেটার আর প্রয়োজনই নেই।’ যদিও পরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প খানিকটা গলা নরম করে বলেন, ‘আমি তো সেখানে থাকব। দেখা যাক উনি আসেন কি না।’ তাঁর দাবি, ‘যদি চিন তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়, তবে শুল্কের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।’ ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এ ঘোষণা আরো একবার মার্কিন-চিন বাণিজ্য-যুদ্ধকে জোরদার করতে চলেছে। এর আগে বছরের শুরুতে উভয় দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, একে অপরের পণ্যের উপর ত্রিমুখী শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। পরে, বহু মাস আলোচনার পর পারস্পরিক আগ্রাসনে কিছুটা শিথিলতা আসে। এমনকি, শি-র সঙ্গে বৈঠক ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসন আশাবাদী ছিল যে কিছু সমাধানের পথে পৌঁছানো যাবে।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলে দিল চিনের ‘রেয়ার আর্থ’ নিয়ন্ত্রণের নয়া ঘোষণায়। চিন, যে এই মুহূর্তে এটিকে বাণিজ্যিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে মরিয়া ড্রাগনের দেশ। মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত রাডার থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, সবকিছুতেই চিনের খনিজের গুরুত্ব অপরিসীম। ওয়াশিংটনের ভয়, এই রফতানি নিয়ন্ত্রণ আসলে তাদের রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলবার কৌশল। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর বিশ্লেষক গ্রেসলিন বাসকারানের জানিয়েছেন, ‘চিনের পদক্ষেপ আসলে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পকে লক্ষ্য করে। আমেরিকার হাতেও খুব বেশি বিকল্প নেই। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের নিজেদের সরবরাহ-শৃঙ্খল পুনর্গঠন করতে হবে, তা না হলে চাপ আরো বাড়বে।’ ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন-এর চিন-বিষয়ক বিশ্লেষক জোনাথনের মতে, ‘শি এখন বুঝিয়ে দিতে চাইছেন যে, তাঁরা চাপ সহ্য করতে জানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের আগের কিছু শুল্ক আরোপের সময় চিন কিছুটা ব্যকফুটের ছিল, কিন্তু এবার তারা প্রথমে চাল চালল।’ তবে সব দরজা এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি বলেই মনে করছেন অনেকে। কারণ, চিনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের এই নতুন বিধিনিষেধ ডিসেম্বরের আগে কার্যকর হবে না। ফলে নভেম্বরের মধ্যে ফের কোনও আলোচনার টেবিলে বসার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
আপাতত পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দুই পরাশক্তির মধ্যে এমন উত্তেজনার ফলে শুধু রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, বিশ্ব অর্থনীতিও বিপদের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষকেরা। কারণ, ‘রেয়ার আর্থ’-এর উপর চিনের একচেটিয়া দখল, আর সেই অস্ত্রকে সামনে রেখেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপে ফেলার কৌশল—এই দুই মিলেই বিশ্বব্যবস্থাকে তীব্র অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। বৈঠক হবে কি না, শুল্ক লাগু হবে কি না, চিন নিজের অবস্থান থেকে সরবে কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর এই মুহূর্তে অজানা। তবে আপাতত ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘চুপ করে থাকার দিন শেষ।’ বেজিং এ পর্যন্ত ট্রাম্পের ঘোষণার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, আমেরিকার এমন আচরণকে ‘অযৌক্তিক এবং উসকানিমূলক’ হিসাবেই দেখা হচ্ছে।
❤ Support Us








