- বি। দে । শ
- জুন ২৭, ২০২৬
মার্কিন মধ্যস্থতায় ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর ইজরায়েল-লেবাননের, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণে জোর
পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান হতে চলেছে? না কি আরও এক দফা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, যার পরিণতি অনিশ্চিত? প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে। তবে আপাতত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন ত্রিপাক্ষিক কাঠামোগত (ফ্রেমওয়ার্ক) চুক্তি নতুন আশার সঞ্চার করেছে। চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহর সশস্ত্র উপস্থিতি সরিয়ে দেওয়া, তাদের সামরিক পরিকাঠামো ভেঙে ফেলা এবং সীমান্তে স্থায়ী নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা।
শুক্রবার, ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিয়োর উপস্থিতিতে সংঘর্ষবিরতির লক্ষ্যে ত্রিপাক্ষিক কাঠামোগত চুক্তিতে সই করেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াওয়াদ এবং ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার। ওয়াশিংটনের দাবি, এ সমঝোতার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সীমান্ত সংঘর্ষের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তির পথে এগোনোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হলো। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ আদৌ এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবে কি? কারণ, সংগঠনটি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, চুক্তির বাস্তবায়নে তারা কোনো ভূমিকা নেবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনৈতিক সাফল্য বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তার পর সীমান্তে হামলার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় হিজবুল্লাহ। ইজরায়েল দাবি করে, উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও দেশকে রক্ষা করতেই তারা লেবাননের ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান চালাতে বাধ্য হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে প্রবেশ করে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী, শুরু হয় বিমান হামলা ও স্থল অভিযান। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের জেরে লেবাননে ৪ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ইজরায়েলের অন্তত ৩২ জন সেনা আধিকারিক এবং ৪ জন সাধারণ নাগরিক। বহু মানুষ সীমান্ত অঞ্চল ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। উত্তর ইজরায়েলের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়েছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলেও হাজার হাজার পরিবার ঘরছাড়া।
উত্তপ্ত এ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরান ও আমেরিকার মধ্যে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমঝোতার পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে উঠেছিল লেবানন-ইজরায়েল সংঘাত। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ না হলে বৃহত্তর কোনো আঞ্চলিক সমঝোতায় তারা এগোবে না। সে প্রেক্ষাপটেই গত কয়েক মাস ধরে ওয়াশিংটনে শুরু হয় একাধিক দফার গোপন ও প্রকাশ্য আলোচনা। শেষ পর্যন্ত পাঁচ দফা বৈঠকের পর শুক্রবার আলোচনারই ফল হিসেবে সামনে আসে নতুন ত্রিপাক্ষিক চুক্তি। চুক্তি ঘোষণার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিয়ো বলেন, এটি কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়, বরং দীর্ঘ ও কঠিন এক যাত্রার সূচনা। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা শুরুরও শুরুতে দাঁড়িয়ে। সামনে বহু কঠিন কাজ অপেক্ষা করছে। আমরা সে কঠিনতাকে হালকাভাবে দেখছি না। কিন্তু এ উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ।’
রুবিয়ো আরও বলেন, লেবাননের মানুষ বহু দশক ধরে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপের মূল্য দিয়েছেন। একই সময়ে উত্তর ইজরায়েলের সাধারণ মানুষও বছরের পর বছর সীমান্ত পেরিয়ে আসা হামলার আতঙ্কে জীবন কাটিয়েছেন। তাঁর মতে, দু–দেশের সাধারণ মানুষই নিরাপত্তা ও শান্তির পরিবেশে বেঁচে থাকার অধিকার রাখেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, এ চুক্তির মূল লক্ষ্য লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হিজবুল্লাহর সামরিক পরিকাঠামো ভেঙে দেওয়া। এ উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে ‘মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ ফর লেবানন’ নামে নতুন ত্রিপাক্ষিক সামরিক সমন্বয় কাঠামো। এ গোষ্ঠীই চুক্তির প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়ন আর তার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, হিজবুল্লাহকে সমস্ত ধরনের হামলা বন্ধ করতে হবে এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে যেতে হবে। একই সঙ্গে তাদের অস্ত্রসম্ভার ও সামরিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক ভাবে যাচাই করা হবে। এ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর ধাপে ধাপে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার শুরু হবে। চুক্তির দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে, লেবাননের সেনাবাহিনী ধাপে ধাপে দেশের সর্বত্র কার্যকর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র সংগঠনগুলিকে নিরস্ত্রীকরণ ও তাদের সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করার পরই ইজরায়েলি বাহিনী সীমান্তের ওপারে ফিরে যাবে।
যদিও, চুক্তি স্বাক্ষরের কিছু ক্ষণের মধ্যেই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দেন, বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহারে তাড়াহুড়ো করবে না তাঁর দেশ। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘হিজ়বুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চল থেকে ইজরায়েলি বাহিনী সরবে না।’ তিনি আরও জানান, প্রথম পর্যায়ে দু‘টি ‘পাইলট জ়োন’-এ চুক্তির পরিকল্পনা কার্যকর করা হবে। একটি লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং অন্যটি নদীর উত্তরে। ওই সব এলাকা থেকে ইজরায়েলি বাহিনী সরে গেলে সেখানে নিয়ন্ত্রণ নেবে লেবাননের সেনাবাহিনী। তবে নিরাপত্তা অঞ্চল থেকে আপাতত সাধারণ লেবাননি নাগরিকদেরও ফিরতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। তাঁর দাবি, হিজবুল্লাহর পুনরায় অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন নয়া চুক্তিকে দেশের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ধাপে ধাপে ইজরায়েলি বাহিনী সরে গেলে লেবাননের মানুষ নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত ভূখণ্ড ফিরে পাবেন। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলি ঘরে ফিরতে পারবেন, দেশের সার্বভৌমত্বে আর বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াওয়াদ বলেন, দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার পর এ পর্যায়ে পৌঁছনো সম্ভব হয়েছে। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের নেতৃত্ব, প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের কূটনৈতিক উদ্যোগ, রাষ্ট্রদূতদের নিরলস প্রচেষ্টা ও লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা এ সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করেছে। তাঁর আশা, চুক্তি সঠিকভাবে কার্যকর হলে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘরে ফেরার পথও খুলে দেবে।
ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার অবশ্য অন্য এক রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘এই ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে ইরান, হিজবুল্লাহর কোনো ভূমিকা নেই, ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যেই শান্তির রাস্তা তৈরি হচ্ছে।’ একই সঙ্গে তিনি ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর আত্মত্যাগের প্রশংসা করে বলেন, তাঁদের ত্যাগ ছাড়া এ পর্যায়ে পৌঁছনো সম্ভব হতো না। চুক্তিতে লেবাননের পুনর্গঠনেও বড়ো আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। রাষ্ট্রপুঞ্জের সহযোগিতায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মানবিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। পাশাপাশি বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে ৩০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে দেশের সর্বত্র সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
উল্লেখ্য, কয়েক দিন আগেই আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘর্ষবিরতির একটি সমঝোতা স্মারক (মউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। সে সূত্রে গত সপ্তাহে সুইৎজারল্যান্ডে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। একে অপরকে কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। ফলে বৃহত্তর আঞ্চলিক শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। তবে এর চেয়েও বড়ো প্রশ্ন, হিজবুল্লাহ যদি নিরস্ত্রীকরণে সম্মত না হয় বা চুক্তির শর্ত কার্যকর করতে অস্বীকার করে, তবে এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ কী হবে? তাই কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, পশ্চিম এশিয়া ঘিরে ওয়াশিংটনের এই ‘সমঝোতা পর্ব’ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও, প্রকৃত শান্তির পরীক্ষা হবে আগামী দিনগুলিতে। সীমান্তে যদি গুলি না থামে, হিজবুল্লাহ যদি অস্ত্র না নামায়, ইজরায়েল সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে এবং ইরান-আমেরিকার বৃহত্তর সমঝোতা যদি আদৌ না টেকে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফেরবার সম্ভাবনা নেই।
❤ Support Us







