- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- অক্টোবর ১০, ২০২৫
১০ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে ‘কুরুক্ষেত্র’, দায়িত্বে উজান গঙ্গোপাধ্যায়
‘যুদ্ধ নয়, প্রশ্ন। পরাজয় নয়, চিন্তা’— এমন এক স্লোগানকে সামনে রেখে, আজ, ১০ অক্টোবর থেকে নেটফ্লিক্সে শুরু হচ্ছে বাংলার নতুন গর্ব, আন্তর্জাতিক মানের থ্রি-ডি অ্যানিমেশন সিরিজ—‘কুরুক্ষেত্র’। পরিচালনায় কৌশিক পুত্র উজান গঙ্গোপাধ্যায়। এখনো অবধি অভিনেতা হিসেবে খ্যাতি ছিল উজানের, এবার তিনি পরিচালনার আসনে। তাও আবার মহাভারতের মতো জটিল, বহুস্তরীয় মহাকাব্যকে ঘিরে। আর তা শুধু ভারতেই নয়, এই অ্যানিমেশন সিরিজ পৌঁছচ্ছে ১৯০টি দেশে, ৩৪টি ভাষায়।
ছোটবেলায় ক্লাসের ইয়ারবুক কিংবা স্কুল ম্যাগাজিনের কভার পাতায় যাঁর আঁকা ছবি থাকত, সে উজানই আজ হাজার বছরের ভারতীয় ঐতিহ্যকে তুলে ধরছেন আন্তর্জাতিক পর্দায়। ছবি আঁকার প্রতি ভালবাসা থেকেই তাঁর এই পথচলা, বলছিলেন তিনি। জানা যাচ্ছে, ৩ বছর আগেই এই প্রোজেক্টের প্রস্তাব পেয়েছিলেন উজান। তখন সদ্য বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরছেন। আর সেখান থেকেই শুরু দীর্ঘ পথচলা। মুম্বই, পুণে ও কলকাতা— ৩ শহরের শতাধিক শিল্পীর যৌথ প্রয়াসে তৈরি হয়েছে এই সিরিজ।
কেন অ্যানিমেশন? এমন প্রশ্নে উজান বলেন, ‘একজন বৃদ্ধা হয়তো অর্জুনকে দেখেছেন এক রূপে, আর কলকাতার গড়ফার এক ছাত্রের চোখে তিনি অন্যরকম। কিন্তু রক্ত-মাংসের কোনো অভিনেতা একা সেই কল্পনাকে ধারণ করতে পারে না। অ্যানিমেশন সেই কল্পনার সীমানা ভাঙে।’ এখানেই না কি অ্যানিমেশনের মাহাত্ম্য, প্রতিটি দর্শকের নিজস্ব কল্পনায় চরিত্রেরা তৈরি হয় নিজের মতো করে এবং অ্যানিমেশন সেই কল্পনাকে স্থান দেয় পর্দায়। সিরিজে রয়েছে ১৮টি পর্ব। প্রতিটি পর্ব একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কাহিনি। অর্থাৎ, এখানে সময় নয়, গুরুত্ব পেয়েছে চরিত্র। ‘যুদ্ধের আগের প্রস্তুতি, দ্বিধা, নৈতিক দ্বন্দ্বই আসল নাটক’— বলছেন উজান। ভ্রাতৃহত্যার বেদনা, আত্মীয়হননের সংশয়, ধর্ম আর কর্তব্যের দ্বন্দ্ব, এসব জটিল টানাপোড়েনই উঠে এসেছে সিরিজে। কাহিনী নিয়ে সংক্ষেপে বলেন পরিচালক বলেছেন, ‘এটা কোনো একরৈখিক যুদ্ধের গল্প নয়। গল্পের ভেতর গল্প, প্রশ্নের ভিতর উত্তর আর উত্তরের ভিতর আরও প্রশ্ন খোঁজার যাত্রা।’
যেখানে ভারতের বেশিরভাগ অ্যানিমেশন স্টুডিও কেন্দ্রিক হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, সেখান থেকে আলাদা হয়ে কলকাতার ‘হাই টেক অ্যানিমেশন স্টুডিও’-তেই তৈরি হয়েছে এই সিরিজের বেশিরভাগ কাজ। প্রায় ৫০০ জন বাঙালি শিল্পী ও কলাকুশলী নীরবে এই প্রজেক্টে কাজ করেছেন গত দুই বছর ধরে। সিরিজে সঙ্গীত পরিচালনায় রয়েছেন সিমাব সেন, গীতিকার হিসেবে রয়েছেন গুলজার। এমন একটি সিরিজের টাইটেল কার্ডে নিজের ছেলের নাম দেখে গর্বিত কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘এই কাজটা শুধু উজানের নয়, এটা বাংলা সিনেমার ভবিষ্যতের এক দৃষ্টান্ত।’
ঝলক দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সিরিজটি পুরোপুরি থ্রি-ডি অ্যানিমেশনে তৈরি। পরিচালক জানিয়েছেন, এতে ব্যবহার হয়েছে মোশন ক্যাপচার, হাই-ডাইনামিক রেন্ডারিং, ভার্যা ও অগ্নি-রেন্ডারের মতো দেশীয় সফটওয়্যার। এক একটি দৃশ্য তৈরি করতে হয়েছে স্টোরি বোর্ড থেকে শুরু করে পিভি, তারপর লাইট, কালার, টেক্সচার এবং শেষে ডাবিং ও মিউজিক। পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল পরিশ্রমসাধ্য, ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা এক বিশাল নির্মাণ। উজানের কথায়, ‘একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখা আর অ্যানিমেশনের চিত্রনাট্য সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে টাইম-কোড বুঝে শট বাই শট লিখতে হয়। শেখার মধ্য দিয়েই এগিয়েছি।’ ‘মহাবতার নরসিংহ’-এর পর ভারতীয় অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রি এক নতুন দিগন্তে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালে যার বাজারমূল্য ছিল এটির ১৮ হাজার কোটি টাকা, ২০২৬ নাগাদ যা পৌঁছতে পারে ৩৫ হাজার কোটিতে। তার মধ্যে পুরাণ-নির্ভর কনটেন্টের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ভারতীয় পুরাণ নিজেই এক অ্যানিমেশনযোগ্য রূপকথা—দৃশ্যমান, প্রতীকময়, আবেগঘন এবং দার্শনিক প্রতিবিম্ব। বিশ্ব যেখানে ডিজনি-পিক্সার-এর হাত ধরে ‘হারকিউলিস’ বা ‘মোয়ানা’ বানায়, সেখানে ভারতের মাটিতে বাংলার হাত ধরে উঠে আসছে ‘কুরুক্ষেত্র’। উজান বলেছেন, ‘আমি মহাভারতকে সাহিত্য হিসেবে পড়েছি। শুধু দর্শককে গল্প বলার নয়, তাঁদের ভাবনার ভিতর ঢুকতে পারার চেষ্টা করেছি।’ বাংলা থেকে উঠে এসে, মহাকাব্যকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়ার এই সাহসী প্রয়াস নিঃসন্দেহে এক নতুন দৃষ্টান্ত। এখানে মহাভারত শুধুই ধর্মযুদ্ধ নয়, আত্মসন্ধানের কাহিনি। আজ, ১০ অক্টোবর, নেটফ্লিক্সের পর্দায় শুরু হচ্ছে এই যুদ্ধ—রক্তপাত নয়, চিন্তার।
❤ Support Us






