Advertisement
  • খাস-কলম ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • ডিসেম্বর ১৩, ২০২৩

অস্থির সময় আর মানব সংকট — দেশ-ভাষা ভেদে বিশ্বজোড়া একই প্রতিচ্ছবি

অমিত মুখোপাধ্যায়
অস্থির সময় আর মানব সংকট — দেশ-ভাষা ভেদে বিশ্বজোড়া একই প্রতিচ্ছবি

 

 
সাবিনা ডোরোহই রোমানিয়ার এক সমাজ সচেতন পরিচালক, তাঁর “ক্লারা” (২০২৩) প্রদর্শিত হল ২৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে ।
 
ফি বছর রোমানিয়া থেকে কর্মহীন নিরুপায় মানুষ কাজের সন্ধানে জার্মানিতে চলে যায় । দেশে পরে থাকে সন্তান এবং পরিবার। শিশুরা বঞ্চিত হয় মা-বাবার স্নেহ থেকে, ব্যাহত হয় সামাজিক কাঠামো । প্রত্যেক বছর পেটের দায়ে রোমানিয়া থেকে জার্মানিতে কাজের সন্ধানে যান পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ । ক্লারা ছায়াছবির শুরুতেই পর্দায় ফুটে ওঠে পরিযায়ী শ্রমিকদের করুণ তথ্য।
 
সিনেমাটির মূল চরিত্র ক্লারা একজন বিবাহবিচ্ছিন্না মহিলা । দেশে নিদারুণ অর্থনৈতিক সঙ্কট, কাজ হারাচ্ছেন একের পর এক মানুষ । ক্লারাও তাদেরই একজন । তিনি শিক্ষকতার কাজ হারিয়েছেন । পুত্রকে নিজের বাবার কাছে রেখে তাঁকেও কাজের সন্ধানে দেশ ছাড়তে হলো । জার্মানিতে একটি বাচ্চার দেখভালের দায়িত্ব পান তিনি, পারিশ্রমিকও যুতসই । হঠাৎ একদিন খবর পেলেন তাঁর ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । কাজের জায়গায় ছুটির আবেদন করলেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ ছুটি দিতে নারাজ । শেষে একপ্রকার জোড় করেই ফিরে এলেন দেশে । ফিরতি পথে খবর পেলেন, ছেলে আহত অবস্থায় ভর্তি এক হাসপাতালে । ড্যানিউব নদীতে নৌকা চালাতে গিয়ে সে চোট পেয়েছে । হাসপাতালে মায়ের সঙ্গে দেখা হলেও একাকিত্বের তীব্র অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে । অন্যদিকে দেশের শিশু সুরক্ষা সংস্থার রক্ত চক্ষু, ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে, ছেলের ঠিকানা হবে অনাথ আশ্রম । জার্মানি থেকে ফিরে আসার পর থেকেই সংকট বাড়তে থাকে ক্লারার জীবনে । পরিবারেও চাপ বাড়ছে, পাড়াতেও দুর্নাম, যে সে ছেলের প্রতি উদাসীন । এর মধ্যে ক্লারার প্রাক্তন স্বামী ইংল্যান্ডে ছেলেকে ছুটিতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়, সেখানে সে তার নতুন স্ত্রী কন্যা নিয়ে থাকেন । এদিকে পরিচিত একজনের সুপারিশে ঘুষ দিয়ে নিজের দেশে কাজ খুঁজতে থাকে ক্লারা । সেখানেও অনিশ্চয়তা । তাই ছেলে বুঝিয়ে সে আমার ফিরে যায় জার্মানিতে ।
 
শেষ দৃশ্যে ঠাকুরদার সঙ্গে নাতি যায় ক্লারাকে বিদায় জানাতে । আজকের রোমানিয়ার কর্মসংস্থান কত বিপন্ন, কত নিরুপায় অসহায় মানুষ বাধ্য হয়ে কত কী করছে তা যেন ওই দৃশ্যে ফুটে ওঠে । এই পরিস্থিতি খুব কি অচেনা আমাদের কাছে ! এ ছবি তাই এক জায়গায় গিয়ে ভুবনায়িত হয়ে যায় ।
 
আরেক বিখ্যাত মহিলা পরিচালক পোল্যাণ্ডের আগ্নেস্কা ওলাণ্ড তাঁর “গ্রিন বর্ডার” (২০২৩) ছবিতে দেখিয়েছেন নানা দেশ থেকে বেলারুশ হয়ে পোল্যাণ্ড ও সুইডেন যেতে কত বেপরোয়া শরণার্থীরা । সারা ছবিতে ছড়িয়ে থাকে এই সংকটের ভয়াবহ চেহারা ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে পড়ে যায়, যখন হিটলারের ভয়ে ভুয়ো পাসপোর্ট দেখিয়ে প্রতিবেশী দেশেগুলোতে পালাত মানুষ আর তাদের সীমান্ত থেকে তাড়ানো হতো । এরিখ মারিয়া রেমার্ক তাঁর নাইট ইন লিসবন উপন্যাসে দেখিয়েছেন কেমন করে নিখুঁত জাল করা হতো পাসপোর্ট এবং তাই ভোররাতে সরাইখানাগুলোতে পুলিশ রেইড করে কলার টেনে বলত, কী নাম ! ঘুমের ঘোর কাটার আগে আজন্মলালিত ঠিক নাম বললেই ফেরত পাঠিয়ে দিত !
 
ঘুমের মধ্যেও মানুষকে খেয়াল রাখতে হতো, আমি কিন্তু আর আমি নই, এখন অন্য কেউ ! এ ছবি দেখায় সেই বিপন্নতা চলেছেই। মালপত্রের মতোই সীমার এপার ওপারে পিং পং বল হিসেবে ছুঁড়ে ফেলা চলেছে পুরুষ নারী ও শিশুদের । আফগানিস্তান থেকে পালানো এক মহিলার পাসপোর্ট থাকলেও আত্মীয়র সঙ্গে দেখা করানোর বদলে বারংবার হেনস্থা করে নিখোঁজ করে দেওয়া হয় তাকে । অজস্র পরিবার হয় বিচ্ছিন্ন, অনেকে প্রাণও হারান । অত্যাচার অতি তীব্র হয়ে উঠলে দর্শকের পক্ষে সওয়া কঠিন হয়। রাতের আঁধারে একমাত্র ইতিবাচক দিক দেখানো হয় কিছু জনসেবা দেওয়া সংস্থার প্রায় অতিমানবিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করার ঘটনায় । তাদেরও ভোগ করতে হয় অত্যাচার ও নানা শাস্তি ।
 
এ ছবিও কোথায় বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে, যে পৃথিবীতে কেউ যেন নিজভূমে নিশ্চিত নয় ! প্রতিবার চলচ্চিত্র উৎসবে কয়েকটি ছবি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে থাকেই । এবারও আছে, বিশেষ করে “জোন অব ইন্টারেস্ট” (ইংল্যান্ড, ২০২৩)(এখানে ইহুদি ক্যাম্পের অমানবিক অত্যাচার আসে কেবল দূরাগত শব্দের আভাসে, মূল আলো থাকে ক্যাম্পের পাশেই থাকা এক সমরনেতার সপরিবারে অকথ্য বিলাসে আয়েসি জীবনযাপনের অশ্লীল বিবরণ!) এবং আরও দুয়েকটি ছবি, তবে নতুন দৃষ্টিতে দেখানো হয় । কখনো তারা এর অভিঘাত ভুলতে পারে না । অথচ আমাদের এখানে দেশভাগ নিয়ে, নাগরিক অত্যাচার নিয়ে তেমন নির্মাণ হয় কই !
 
ফিলিপিনো পরিচালক লাভ দিয়াজ (Lav Diaz) বিশ্ব জুড়ে বন্দিত, কিন্তু স্বল্পসংখ্যক বাছাই দর্শকের কাছে । তাঁর ছবি অতি ধীর লয়ে চলে, প্রায় বেলা তার এর মতোই, নিরুত্তাপভাবে গম্ভীর সুরে তাঁর দেশের নিকট ও দূর অতীতের অনুসন্ধান করে চলে । এ হেন দিয়াজের নবতম সৃজন “এসেন্সিয়াল ট্রুথ আবাউট দ্য লেক” (২০২৩), তিন ঘন্টা পঁয়ত্রিশ মিনিটের নির্মাণ, ২০০৪-০৫ সালের দুতার্তের সময়ের গণহত্যা, বিশেষ করে এস্মেরাল্ডা স্টুয়ার্টের নিখোঁজ হয়ে যাবার ঘটনা নিয়ে নির্মিত ।
 
ডিটেকটিভ দফতরের এক প্রবীণ আধিকারিক, হারমেস পাপাউরান, পনের বছর পরে, কেসটির নতুন তদন্ত করে চলেছেন তাল নামের লেকের চারপাশ জুড়ে ।
 
প্রথম দৃশ্যেই ক্লাসমেটরা, পুনর্মিলনীর ধাঁচে দেখা করে । কিন্তু মাত্র দু’জন ছেলে মেয়ে আসে, দেখা যায় তারা সেই গোয়েন্দা পাপাউরান ও মেয়েটি তার এখনকার বস । সে প্রশ্ন তোলে পনের বছর পরে তদন্ত ফের চালু করার যৌক্তিকতা নিয়ে । জবাব আসে সে আদতে হয়ত মর্ষকামী, নিজেকে যন্ত্রণা দিতে ভালোবাসে, সত্যকে শেষ পর্যন্ত খুঁজতে গিয়ে যত কিছু কষ্ট, সব সইতে চায়, বিচার দিতে চায় ।
 
এক নাচের অনুষ্ঠানে যায় পাপাউরান, সেখানে এস্মেরাল্ডা স্টুয়ার্টের স্মরণে ফিলিপিনো ঈগলের পাখার ডানাওলা নাচ হয়, তরুণ প্রজন্ম তাকে প্রকৃতি ও পাখি বাঁচানোর সচেতনতা ছড়ানোর জন্য জননায়িকার মর্যাদা দেয় ।
 
তথ্যপ্রমাণ ও সূত্র খুঁজতে যাবার সময় এক ব্যবসায়ী ধনকুবের জাক বারকেরো গোয়েন্দাকে কফির নিমন্ত্রণ করে লেকের পাশের ডেরায় । সেখানে জাক সরাসরি বলে, আমি জানি তুমি আমাকে প্রধান সন্দেহভাজন, নয়ত অংশগ্রহণকারী বলে মনে কর । আমি এস্মেরাল্ডাকে নিয়ে কিছুই জানি না । দেখ কী প্রমাণ তুমি পাও, মনে হয় পাবে না কিছু ! জাক বলে, এস্মেরাল্ডা ভালো মডেল, গায়ক, আন্দোলনকারী, নাচিয়ে, নানা শাস্ত্র পড়েছে, কিন্তু সবই ছয় মাসের জন্য, তার মধ্যেই সে আগ্রহ হারিয়ে ফেলত ।
 
সারা ছবি জুড়ে দমকা হাওয়া, গাছপালা দোলে, যেন শান্ত জনপদে চাপা অশান্তির আভাস দেয় । এর মাঝে ভূমিকম্প আসে, অগ্নুৎপাত হয়, কাদা ছেয়ে ফেলে শহর, পশুপাখিসহ মানুষ মরে, আগেকার সাক্ষ্যপ্রমাণ মেলা আরও কঠিন হয় । তবু পাপাউরান গিয়ে মেয়েটির বান্ধবী জেনকে প্রশ্ন করে রটিয়ে দেওয়া আত্মহত্যার কথা সত্যি কিনা । জেন বলে তা অসম্ভব । সূত্রহীন পাপাউরান রেগে ভাঁড় ফেলে সিঁড়িতে, পরে বাসনপত্র ছুঁড়ে মারে নিচে মাটিতে । ক্লাসমেট বান্ধবী তাকে তেঁতুল গাছের নিচে রাতে ঘুমোতে দেখে আদেশ করে তদন্ত বন্ধ করে দিতে । তবু একা পাপাউরান ঘুরে বেড়ায় লেকের চারধারে । যায় বন্ধু রিকার্ডোর বাড়িতে, সে মৃত, সঙ্গী মেলচোরা আতিথ্য দেয়, বলে এস্মেরাল্ডার মৃত্যু নিয়েও অনেক রটনা আছে । তার ওখানে এক সন্দেহজনক ময়লাকুড়ুনিকে দেখা যায়, এক কেকবিক্রেতাকে পাপাউরানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে ভেবে খুন করায় জাক বারকেরো । শেষ দৃশ্যে মাটি খুঁড়ে বউ ও মেয়েকে খোঁজা শ্রমিকের কাজ থেকে সূত্র আশা করে পায় না পাপাউরান । সে গিয়ে কেকবিক্রেতার মায়ের সঙ্গে দেখা করে, প্রথম বার কান্নায় ভেঙে পড়ে ।
 
এ ছবি অনুভব করার, অনবদ্য পাপাউরানের চরিত্র দেখে অবাক হওয়ার । সে যখন বলে শাসক নয়, আদেশ নয়, কেবল আইন মানো, সত্য ছাড়া সন্তুষ্ট হয়ো না, মানুষ মারা বা অত্যাচার করা পুলিশের কাজ নয়, তখন মনে হয় কোথায় চলে গেছে পৃথিবী ! পাপাউরান বিরল প্রজাতির লুপ্তপ্রায় অস্তিত্ব হয়ে মনে থেকে যায় । আর থাকে লাভ দিয়াজের অনন্য ইতিহাসচেতনা, দীর্ঘ বিশ্লেষণ আর গল্পের বিস্তৃতি, যেখানে কেউ অভিনয় করেছে বলে মনেই হয় না ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!