- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ২৪, ২০২৫
মাতৃদুগ্ধে প্রাণঘাতী ইউরেনিয়াম ! বিহারে সঙ্কটে ৭০% সদ্যজাত, আশঙ্কায় চিকিৎসক মহল
বিহারের ৬ টি জেলাজুড়ে স্তন্যদায়িনী মায়েদের দুগ্ধে ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি মিলেছে। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে সেই উদ্বেগজনক তথ্য। গঙ্গা-সমতলভূমির মাটি ও জলে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে আগেই বিভিন্ন মহলে আশঙ্কা ছিল। কিন্তু স্তনদুগ্ধের মতো সংবেদনশীল খাদ্য উৎসে ইউরেনিয়াম পাওয়া যাওয়ায় স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ থেকে সাধারণ মানুষের মনে ঘনিয়ে উঠেছে প্রবল আশঙ্কা আর বিপদের কালো মেঘ।
দীর্ঘদিন ধরে এই গবেষণা চালিয়েছে পাটনার মহাবীর ক্যানসার সংস্থা ও গবেষণাকেন্দ্র, লাভলি পেশাদার বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিল্লি এইমসের গবেষকরা। নেচার প্রকাশনার অন্তর্গত ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র থেকে জানা গিয়েছে, ১৭ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ৪০ জন স্তন্যদানকারী মায়ের দুধের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রত্যেকের স্তনদুগ্ধেই ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি রয়েছে। যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী বা শারীরিক অক্ষমতার মারণবিষ হয়ে উঠতে পারে। ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত এই সমীক্ষা চলেছে। ভোজপুর, সমস্তীপুর, বেগুসরাই, খগড়িয়া, কাটিহার এবং নালন্দা, এই ৬ জেলার গ্রাম ও শহরাঞ্চল ঘুরে গবেষকদল সংগ্রহ করেছে দুধের নমুনা। কাটিহারের এক মায়ের দুধে সবচেয়ে বেশি ইউরেনিয়াম ধরা পড়েছে, যা গবেষকদেরও বিস্মিত করেছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, মাতৃদুগ্ধে পাঁচ দশমিক দুই পাঁচ মাইক্রোগ্রাম প্রতি লিটার পর্যন্ত ইউরেনিয়াম মিলেছে কোনো কোনো নমুনায়। যদিও আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা এ পর্যন্ত স্তনদুগ্ধে ইউরেনিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট মান নির্ধারণ করেনি। তা সত্ত্বেও শিশুর খাদ্যে তেজস্ক্রিয় ধাতুর উপস্থিতি যে বিপদের ইঙ্গিত বহন করে, তা গবেষকরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। মায়েদের ক্ষেত্রে তাত্ক্ষণিক ক্ষতি না হলেও, শিশুদের বিকাশমান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ইউরেনিয়ামের রাসায়নিক বিষক্রিয়ার প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। কম ওজন, অপরিণত কিডনি এবং শরীর থেকে বিষাক্ত ধাতু বার করে দেওয়ার সীমাবদ্ধ ক্ষমতা, এসব কারণেই ওই শিশুদের প্রাণের ঝুঁকি রয়েছে। গবেষকদল ‘মন্টে কার্লো’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ণয় করেছেন। দুধের মাধ্যমে যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম শিশুদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে, তা বিশ্লেষণ করে তাঁদের ধারণা, সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশ অ-ক্যান্সারজনিত জটিলতার মুখোমুখি হতে পারে। ক্যান্সারের সম্ভাবনা তেমন দেখা না গেলেও, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, স্নায়বিক বিকাশ ব্যাহত হওয়া এবং আচরণগত সমস্যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
চাঞ্চল্যকর এই গবেষণা রিপোর্ট সামনে আসতেই, দেশের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, মায়েদের স্তনবৃন্তে এই ইউরেনিয়াম এল কোথা থেকে? গবেষকরা মনে করছেন, মূল উৎস ভূগর্ভস্থ জলই। বিহারের বহু জেলা দীর্ঘদিন ধরেই ভূগর্ভস্থ জলে ইউরেনিয়াম দূষণে ভুগছে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সুপৌল, নালন্দা, বৈশালি সহ বেশ কিছু স্থানে পানীয় জলের ইউরেনিয়াম-স্তর ‘হু’-র অনুমোদিত সীমাকে বহু গুণ ছাড়িয়ে গেছে। শিলাস্তরে প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা ইউরেনিয়াম, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন, ফসফেট সার, শিল্পবর্জ্য এবং অপরিশোধিত নর্দমার জল, এসবই মিলেমিশে দূষণের মাত্রা আরও বাড়াচ্ছে। যেহেতু বিহারের অধিকাংশ মানুষ পানীয় ও গৃহস্থালির কাজে ভূগর্ভস্থ জলের ওপরই নির্ভর করেন, তাই দুধে এই ধাতুর উপস্থিতি তাদের দৈনন্দিন জল-গ্রহণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত বলে গবেষকদের মত। যদিও দুধে ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব জলের তুলনায় অনেক কম। কারণ ইউরেনিয়াম শরীরে প্রবেশ করলে হাড়, কিডনি ও রক্তের প্রোটিনে জমা হতে চায়, স্তনগ্রন্থিতে নয়। ফলে স্তনদুগ্ধে যে দূষণ পাওয়া যাচ্ছে তা মায়ের দীর্ঘমেয়াদি জমাকৃত ধাতুর প্রভাব নয়; বরং সাম্প্রতিক জল ও খাদ্যাভ্যাসের প্রতিফলন। এ প্রসঙ্গে দিল্লির এইমসের গবেষক চিকিৎসক ড. অশোক শর্মা বলেন, ‘স্তনদুগ্ধে যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম ধরা পড়েছে, তা অত্যন্ত কম। তাই মা বা শিশুর স্বাস্থ্যের তাত্ক্ষণিক ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। তবে বছরের পর বছর শরীরে এই ধাতু ঢুকতে থাকলে যে বিপদ বাড়বে, তা অস্বীকার করা যায় না।’ পাশাপাশি তিনি আরো স্পষ্ট করে দেন, ‘স্তনদুগ্ধের উপকারিতা যে অপরিসীম, তা এ ঘটনায় বদলাবে না। আতঙ্কিত হয়ে, হঠাৎ করে স্তন্যদান বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই।’
গবেষকদলও একই সতর্কতা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, স্তন্যদানের বিকল্প এখনো নেই। বরং জরুরি হয়ে দাঁড়াচ্ছে দূষণের উৎস খুঁজে বের করা এবং নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করা। তবে, রাজ্যজুড়ে ভূগর্ভস্থ জলের নিয়মিত পরীক্ষা, বায়োমনিটরিং, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের বিশেষ পরামর্শ এবং প্রয়োজনে উন্নতমানের জল ফিল্টার ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বিহারের পরিবেশগত সংকট যে দিনে দিনে গভীর হচ্ছে, এ গবেষণা তারই সর্বশেষ প্রমাণ। শিশুর সুস্থতা রক্ষায় এখন প্রশাসনের রক্ষণশীলতা নয়, দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের প্রয়োজন, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
❤ Support Us






