- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ১৫, ২০২৫
ফ্রিজে ‘নিষিদ্ধ’ মাংস রাখার সন্দেহে পিটিয়ে খুন: আখলাক হত্যাকাণ্ডে সব অভিযোগ তুলে নিতে উদ্যোগী যোগী সরকার
দাদরির বিসাহা গ্রামে গুজবকে কেন্দ্র করে প্রৌঢ় মোহাম্মদ আখলাককে গণপিটুনিতে খুনের প্রায় এক দশক পর, সেই বহুচর্চিত মামলায় নতুন মোড়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিতে চায় উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকার। আদালতে ইতিমধ্যেই জমা পড়েছে সরকারের আবেদন। বিচারপূর্ববর্তী এ সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে উত্তাল হয়েছে রাজ্য-রাজনীতি।
২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। গ্রেটার নয়ডার বিসাহা গ্রামে লাউডস্পিকারে ঘোষণা হয়— প্রৌঢ় আখলাক নাকি ফ্রিজে ‘নিষিদ্ধ’ মাংস রেখেছেন। মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এলাকাজুড়ে। অভিযোগ, সেই ঘোষণার পরেই একদল দুষ্কৃতী আখলাকের বাড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘর থেকে টেনে বার করে বেধড়ক মারধর করা হয় তাঁকে। গুরুতর জখম হন তাঁর ছেলে দানিশও। আখলাককে বাঁচানো যায়নি। দানিশ দীর্ঘ অস্ত্রোপচার ও হাসপাতালে দিন কাটিয়ে প্রাণে ফিরে আসেন। ঘটনার পর আখলাকের স্ত্রী ১০ জনের নামোল্লেখ করে অভিযোগ দায়ের করেন। অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার-পাঁচ জনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন তিনি। সে সময় রাজ্যে ছিল অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টির সরকার। মামলার তদন্ত শুরু হয় দ্রুতগতিতে এবং সুরজপুর জেলা আদালতে বিচার চলতে থাকে।
এ ঘটনায় যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় বিজেপি নেতা সঞ্জয় রানার ছেলে বিশাল রানা (কিছু রিপোর্টে বিষ্ণু নামে উল্লেখ) এবং তাঁর একাধিক পরিচিত। খুন, খুনের চেষ্টা, দাঙ্গা, বেআইনি জমায়েত— সব মিলিয়ে একাধিক জামিনঅযোগ্য ধারায় মামলা হয়েছিল তাঁদের বিরুদ্ধে। মাংসের নমুনা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে রিপোর্টে দাবি করা হয়, সেটি ‘গরু বা তার বংশধর’-এর মাংস। আখলাকের পরিবার পরবর্তীতে অভিযোগ করে, নমুনা বদলে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার বিচার চলতে চলতে প্রায় দশ বছর পার। এরইমধ্যে উত্তরপ্রদেশে সরকার বদল হয়েছে। ক্ষমতায় এসেছে যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। একের পর এক বিতর্কিত পদক্ষেপ আর বক্তব্যের জেরে ধারাবাহিকভাবে খবরের শিরোনামে থেকেছেন যোগী আদিত্যনাথ। এবার আখলাখের সরকারের অবস্থানে বড়ো ধরনের পরিবর্তন। সুরজপুর আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি ভাগ সিং ভাটি জানান, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ এসেছে। সে চিঠির ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবর আদালতে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। আগামী ১২ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩২১ ধারায় মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল। সরকারি চিঠিতে আরো জানানো হয়েছে, আখলাকের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া মাংস ‘নিষিদ্ধ’ মাংস বলে নিশ্চিত হয়েছে, সেই যুক্তিতেই মামলা না চালানোর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে সরকার। প্রশ্ন উঠছে শুধুমাত্র বিশেষ এক মাংস রাখার ‘অপরাধে’ কি একজন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা যায়? তাঁর পরিবারের উপর হামলা চালানো যায়? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর অবশ্য নেই কারোর কাছেই। আখলাকের পরিবারের আইনজীবী ইউসুফ সাইফি বলেছেন, ‘এমন কোনো সরকারি নথি এখনও হাতে পাইনি। শুনেছি মাত্র। নথি পাওয়ার পরেই মন্তব্য করব।’ অন্যদিকে সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্য, মামলাটি প্রত্যাহার করা হবে কি না— সর্বশেষ সিদ্ধান্ত আদালতের। অনুমতি মিললেই সমস্ত অভিযোগ তুলে নেওয়া হবে।
এ পর্যন্ত প্রথম সাক্ষী হিসাবে কেবল নিহত আখলাকের মেয়ে শায়স্তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অভিযুক্ত ১৫ জন-ই বর্তমানে জামিনে মুক্ত। ২০১৫ সালের আখলাক গণপিটুনি গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। গোরক্ষার নামে একাধিক রাজ্যে অনুরূপ হত্যার ঘটনাও সামনে এসেছিল এর পর। এখন প্রায় এক দশক পরে যোগী সরকারের মামলা প্রত্যাহারের পদক্ষেপে বিসাহা গ্রাম থেকে লখনউ— নানা মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, ন্যায় বিচার কি তবে আর রইলো না ‘নয়া ভারতে’? আদালত ১২ ডিসেম্বর কী নির্দেশ দেয়— এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ।
❤ Support Us






