- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- নভেম্বর ৬, ২০২৬
সিঙ্গুরে ফের শিল্প ! অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা, নতুন শিল্পনীতিতে একাধিক ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
দীর্ঘদিনের শিল্পায়ন বিতর্ক, টাটা গোষ্ঠীর ন্যানো প্রকল্প প্রত্যাহার এবং জমি আন্দোলনের স্মৃতি পেরিয়ে ফের শিল্পের আলোচনায় উঠে এল হুগলির সিঙ্গুর। রাজ্যে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করতে গিয়ে সিঙ্গুরে ভারী বাণিজ্যিক গাড়ি তৈরির কারখানা গড়ার পরিকল্পনার কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ বিষয়ে দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে কথাবার্তাও হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে শুধু সমঝোতাপত্র (MoU) স্বাক্ষর করে প্রচারের আলোয় আসতে চান না বলেও স্পষ্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার নিউটাউনে রাজ্যের নতুন শিল্পনীতির রূপরেখা প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই তিনি জানান, সিঙ্গুরে শিল্প স্থাপনের জন্য রাজ্য সরকার বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, শিল্পের জন্য জমি সংক্রান্ত কোনও উদ্যোগে কৃষকদের উপর বলপ্রয়োগ করা হবে না। বামফ্রন্ট সরকারের আমলের মতো জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে কৃষকদের রক্ত ঝরবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
সিঙ্গুরের শিল্পায়ন প্রসঙ্গ উঠতেই ফিরে এসেছে রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাস। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীর ন্যানো গাড়ি তৈরির কারখানা গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ আন্দোলন ও রাজনৈতিক টানাপড়েনের পর শেষ পর্যন্ত সিঙ্গুর থেকে প্রকল্প গুটিয়ে নেয় টাটা গোষ্ঠী।
২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় এসে অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। সিঙ্গুরের জমিতে নেমে ধানের বীজ ছড়িয়ে কৃষকদের হাতে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার বার্তাও দিয়েছিলেন তিনি। সেই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ধরে সিঙ্গুরে নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও বাস্তবে বড় কোনও শিল্প প্রকল্প গড়ে ওঠেনি।
গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে সিঙ্গুরে সভা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অন্যদিকে, মোদীর সভার পাল্টা হিসেবে সিঙ্গুরের অদূরে জনসভা করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে সিঙ্গুর বিধানসভা কেন্দ্রে পরাজিত হন তাঁর দলের প্রার্থী। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই সিঙ্গুরে শিল্পায়নের সম্ভাবনা নিয়ে শিল্পমহলের আগ্রহ বাড়ে। রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়ও এর আগে সিঙ্গুর নিয়ে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এ বার মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় সেই পরিকল্পনা আরও স্পষ্ট হল।
শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি শিক্ষিত বেকার রয়েছেন। কাজের সুযোগের অভাবে প্রায় ৭০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভিন্রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, কর্মসংস্থান বাড়াতে রাজ্যে নতুন শিল্প ও উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তাজপুর বন্দরের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আদানি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়েছিল যে, সেখানে রাজ্য সরকারের নিজস্ব জমি না থাকায় বন্দর তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সিঙ্গুরের ক্ষেত্রে সরকার শিল্প স্থাপনের জন্য উদ্যোগী হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বাস্তবায়নের দিকটিই বেশি গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
নতুন শিল্পনীতিতে বিনিয়োগ টানতে একাধিক আর্থিক সুবিধার কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। পরিবেশবান্ধব বা সবুজ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী শিল্প সংস্থাগুলিকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। বড় শিল্পের জন্য থাকছে পৃথক প্যাকেজ। এই প্যাকেজের আওতায় সংস্থাগুলিকে সর্বোচ্চ ১২০ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মহিলা কর্মীদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে সমস্ত সংস্থা মহিলাদের বেশি সংখ্যায় কাজে নিয়োগ করবে, তারা অতিরিক্ত সুবিধা পেতে পারে। পাশাপাশি কর্মরত মহিলাদের জন্য হস্টেল তৈরি করতে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক অনুদান দেওয়ার কথাও জানিয়েছে রাজ্য সরকার।
উৎপাদনকারী শিল্প সংস্থাগুলির জন্য রাজ্য পণ্য ও পরিষেবা কর বা SGST-এর ক্ষেত্রেও আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি, বৃহৎ এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের শিল্প—সব ধরনের বিনিয়োগকেই নতুন নীতির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু উৎপাদন শিল্প নয়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ সুবিধার কথা বলা হয়েছে নতুন শিল্পনীতিতে। হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্যাম্প ডিউটি ছাড়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
রাজ্যের অনগ্রসর এলাকাগুলিতে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উৎসাহ ভাতা বা ইনসেনটিভ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এবং রুগ্ন শিল্প পুনরুজ্জীবনের উপরেও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সবুজ বিদ্যুৎ ব্যবহার, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজকেও নতুন শিল্পনীতিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতের শিল্প সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে মোট ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে রাজ্য সরকার। এই ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠকে রাজ্যে শিল্পের অনুকূল পরিবেশ তৈরির আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বাংলায় আর কোনও সিন্ডিকেট বা তোলাবাজি চলবে না। সঙ্কল্পপত্রে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথাও জানিয়েছেন তিনি। আগের সরকারের আমলে চিত্তরঞ্জন ও হলদিয়ার মতো শিল্পাঞ্চলের অবস্থা খারাপ হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এ দিনের বৈঠকে পণ্যবাহী লরির অতিরিক্ত পণ্য বহন বা ওভারলোডিং বন্ধ করার জন্য শিল্পপতিদের কাছে আবেদন জানান তিনি। তাঁর মতে, পরিবহণ ব্যবস্থায় নিয়ম মেনে চলা এবং শিল্পের পরিকাঠামো উন্নত করা জরুরি।
এদিকে, রাজ্যে শিল্প সংস্থাগুলির প্রাপ্য বকেয়া উৎসাহ ভাতার পরিমাণ যে বিপুল, তা স্বীকার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে বকেয়া প্রণোদনার টাকা মিটিয়ে দেওয়া হবে। তবে কবে সেই টাকা দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে এখনই কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেননি তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা না করে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া বাস্তবসম্মত হবে না।
সব মিলিয়ে নতুন শিল্পনীতির মাধ্যমে রাজ্যে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে সরকার। আর সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সিঙ্গুর। ন্যানো প্রকল্পের অসমাপ্ত শিল্পায়নের স্মৃতি বহন করা এই এলাকায় অশোক লেল্যান্ডের সম্ভাব্য ভারী বাণিজ্যিক গাড়ির কারখানা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর শিল্পমহল ও রাজ্যবাসীর।
❤ Support Us





