- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬
এবার জমিরও ‘আধার’! রাজ্যের প্রায় ৬ কোটি প্লট পেতে চলেছে নিজস্ব ইউনিক পরিচয়
নাগরিকদের আধার কার্ড রয়েছে। এবার সে ধাঁচেই কি জমিরও হবে নিজস্ব পরিচয়? রাজ্যের কয়েক কোটি জমির প্লটকে একটি করে নির্দিষ্ট ‘ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’-এর আওতায় আনার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সরকারি পরিভাষায় এই ব্যবস্থার নাম ‘ইউনিফায়েড ল্যান্ড পার্সেল আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ বা ‘ইউএলপিআইএন’। প্রশাসনের অন্দরে যার পরিচিতি হয়েছে ‘জমির আধার’ নামে। লক্ষ্য, জমির পরিচয়কে একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল নম্বরে বেঁধে ফেলা। যাতে জমির মালিকানা, অবস্থান, দাগ, খতিয়ান থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট নথি— সব কিছুই দ্রুত চিহ্নিত করা যায়।
দেশ জুড়েই ডিজিটাল ভূমি-নথি ব্যবস্থার অংশ হিসাবে ‘ইউএলপিআইএন’ চালুর কাজ চলছে। কেন্দ্রীয় ভূমি সম্পদ দফতরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি জমির প্লটের ভৌগোলিক অবস্থান বা -এর ভিত্তিতেই তার জন্য ইউনিক পরিচয় তৈরি করা হয়। পশ্চিমবঙ্গও সে ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। রাজ্যে এ প্রকল্পের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো জমির মানচিত্রকে আরও নির্ভুল করা। কারণ, একটি প্লটের ইউনিক পরিচয় নির্ধারণ করতে হলে, সে জমির অবস্থান ও সীমানা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য থাকা জরুরি। পুরনো মৌজা ম্যাপের সঙ্গে বর্তমান জমির অবস্থান মিলিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় সংশোধন করার কাজ সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, রাজ্যের প্রায় ৪২ হাজার মৌজার জমির মানচিত্রকে ধাপে ধাপে ‘জিও-রেফারেন্স’ এবং ‘ডিজিটাইজ’ করা হচ্ছে। সরকারি নথিতেও পশ্চিমবঙ্গের মৌজা ম্যাপের জিও-রেফারেন্সিংয়ের সঙ্গে ‘ইউএলপিআইএন’ তৈরির কাজকে যুক্ত করে এগোনোর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ রয়েছে।
কী ভাবে হবে এই কাজ?
প্রথমে সংশ্লিষ্ট মৌজার পুরনো মানচিত্রের সঙ্গে মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখা হবে। কোথায় জমির সীমানা বদলেছে, কোথায় প্লট ভাগ হয়েছে, কোথায় নতুন রাস্তা বা অন্য কোনো পরিবর্তন এসেছে— সে সব তথ্য যাচাই করা হবে। তার পরে সংশোধিত তথ্যকে ডিজিটাল মানচিত্রে রূপান্তর করা হবে। অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হবে সংশ্লিষ্ট জমির অবস্থান। সে সমস্ত ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতেই তৈরি হবে প্লটের ইউনিক পরিচয়। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, ‘ইউএলপিআইএন’ তৈরির আগে জমির ‘ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপ’ বা মৌজা মানচিত্রের ‘জিও-রেফারেন্সিং’ প্রয়োজন। অর্থাৎ, কাগজে থাকা পুরনো জমির মানচিত্রকে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করাই এ ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
পশ্চিমবঙ্গে এই কাজের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ, রাজ্যের ভূমি-নথির পরিকাঠামো বহু পুরনো। সরকারি নথি অনুযায়ী, রাজ্যে ৪২,০৪২টি মৌজার জন্য বিপুল সংখ্যক ‘ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপ’ রয়েছে। পুরনো পদ্ধতিতে তৈরি সেই মানচিত্রগুলিকে আধুনিক ‘জিআইএস’-ভিত্তিক ব্যবস্থায় নিয়ে আসার কাজ দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। নয়া প্রকল্পের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুরনো জমির নথির সঙ্গে নতুন ডিজিটাল মানচিত্রের যোগসূত্র তৈরি করা। অর্থাৎ, শুধু একটি নম্বর দিলেই কাজ শেষ নয়। সেই নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্লটের রেকর্ড, মালিকানা ও মানচিত্রের তথ্যও যুক্ত করতে হবে। তবেই তৈরি হবে জমির একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পরিচয়।
এতে সুবিধা কোথায়?
বর্তমানে রাজ্যের কোনো জমি চিহ্নিত করতে গেলে মৌজা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর-সহ একাধিক তথ্যের প্রয়োজন হয়। জমির মালিকানা বদল, জমি ভাগ হওয়া কিংবা পুরনো নথি যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও এই একাধিক তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে নেওয়া অনেক সময় জটিল হয়ে ওঠে। ‘ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন’ ব্যবস্থা চালু হলে একটি নির্দিষ্ট নম্বরের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্লটকে চিহ্নিত করা অনেক সহজ হবে। সরকারের বৃহত্তর ডিজিটাল ভূমি-নথি ব্যবস্থার লক্ষ্যও জমির তথ্যকে একই জায়গায় এনে নাগরিক ও প্রশাসন— উভয়ের জন্য তা সহজলভ্য করা। কেন্দ্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘ইউএলপিআইএন’ জমির পরিচয় নির্ধারণ, ভূমি প্রশাসন, সম্পত্তি সংক্রান্ত লেনদেনে স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হতে পারে জমি সংক্রান্ত জালিয়াতি রোখার ক্ষেত্রে। কোনো প্লটের নির্দিষ্ট ডিজিটাল পরিচয়, ভৌগোলিক অবস্থান আর সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকলে ভুয়ো পরিচয়ে জমি দেখানো বা জাল নথির মাধ্যমে মালিকানা দাবি করার মতো ঘটনা শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। জমির সীমানা নিয়ে বিবাদ দেখা দিলেও ডিজিটাল ম্যাপের সাহায্যে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ বাড়বে। ফলে, শুধু সাধারণ জমির মালিক নন, প্রশাসনের কাজেও এর প্রভাব পড়তে পারে। জমি সংক্রান্ত কোনও সরকারি কাজের ক্ষেত্রে একাধিক নথি ঘেঁটে একই প্লটের পরিচয় নিশ্চিত করার বদলে একটি ‘ইউনিক আইডি’ ব্যবহার করা গেলে তথ্য খোঁজার সময় কমবে। ভূমি দফতর, রেজিস্ট্রি দফতর ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে তথ্যের সমন্বয়ও সহজ হতে পারে।
বাংলার জমি-নথির ডিজিটাল পরিকাঠামোয় এমন সমন্বয়ের কাজ ইতিমধ্যেই চলছে। সরকারি ব্যবস্থায় ‘নিজের সম্পত্তি জানুন’-র মতো পরিষেবায় জেলা, ব্লক, মৌজা এবং প্লট বা খতিয়ান নম্বরের মাধ্যমে জমির তথ্য খোঁজার সুযোগ রয়েছে। পরবর্তী ধাপে এই ব্যবস্থার সঙ্গে ‘ইউনিক প্লট আইডি’ যুক্ত হলে জমির পরিচয় আরও নির্দিষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে নতুন করে জমি কেনাবেচা বা রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট প্লটের ইউনিক পরিচয় দলিলে উল্লেখ করার ব্যবস্থা করা হতে পারে। তবে, প্রশাসনের ভাবনায় শুধু ডিজিটাল নম্বরেই অবশ্য বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ রূপ পেলে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকের হাতে একটি ‘ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে। আধার কার্ডের মতো দেখতে সেই কার্ডে থাকবে জমির ইউনিক নম্বর। সে নম্বর ব্যবহার করে সরকারি পোর্টালে সংশ্লিষ্ট জমির তথ্য দেখা যাবে, এমন ব্যবস্থাই গড়ে তোলার লক্ষ্য।
তবে গোটা ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের উপর। প্রথমত তথ্য কতটা নির্ভুল। পুরনো মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমান জমির অবস্থার ফারাক থাকলে কিংবা মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য আপডেট না থাকলে শুধু নতুন বিশেষ নম্বর দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সে কারণেই ‘জিও-রেফারেন্সিং’, মাঠ-পর্যায়ের যাচাই আর জমির রেকর্ড নিয়মিত আপডেট করা এ প্রকল্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কাজের সঙ্গে জমির মালিকদের স্বার্থের বিষয়টিও জড়িত। নতুন ডিজিটাল মানচিত্রে কোনো প্লটের সীমানা বা আয়তনে পুরনো নথির সঙ্গে পার্থক্য ধরা পড়লে তা কী ভাবে সংশোধন করা হবে, মালিকের আপত্তি জানানোর সুযোগ কী থাকবে— সেসব প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ রাখা প্রয়োজন। কারণ, ডিজিটাল মানচিত্রে ভুল ঢুকে পড়লে তা পরবর্তী সময়ে নতুন জটিলতার কারণ হতে পারে।
যদিও রাজ্যের প্রশাসনিক মহলের আশা, পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ ভাবে বাস্তবায়িত হলে জমি সংক্রান্ত পরিষেবায় ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। সাধারণ মানুষকে জমির পরিচয় বোঝাতে একাধিক নম্বর বা পুরনো নথির উপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে সরকারি দফতরগুলির মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানও দ্রুত হতে পারে। শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এর সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে। কোনো শিল্পপ্রকল্পের জন্য জমি বাছাই, জমির মালিকানা যাচাই কিংবা জমি সংক্রান্ত সরকারি নথি পরীক্ষা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্রুত এবং নির্ভুল তথ্য পাওয়া গেলে বিনিয়োগকারীদের হয়রানি কমতে পারে। প্রশাসনের একাংশের আশা, সে কারণেই দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবস্থা শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও সহায়ক হয়ে উঠবে।
❤ Support Us






