Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫

অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্বই হবে ২৬ এর নির্বাচনের ইস্যু। পদ্মই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, ভোটবার্তা শাহর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্বই হবে ২৬ এর নির্বাচনের ইস্যু। পদ্মই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, ভোটবার্তা শাহর

‘শুধু অনুপ্রবেশ ঠেকানো নয়, বে-আইনিভাবে ঢুকে পড়া প্রত্যেককে চিহ্নিত করে দেশের বাইরে পাঠানো হবে’— ৩ দিনের রাজ্য সফরের শুরুতেই অনুপ্রবেশ ইস্যুকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে কার্যত নির্বাচনী সুর বেঁধে দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মঙ্গলবার দুপুরে কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠকে বসে রাজ্যের তৃণমূল সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একের পর এক তোপ দাগেন তিনি। শাহের বক্তব্যে বার বার ফিরে আসে একটি অভিযোগ— পশ্চিমবঙ্গকে পরিকল্পিত ভাবে বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত করা হয়েছে, যার অভিঘাত শুধু রাজ্যের ভিতরেই নয়, দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার উপর পড়ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, বাংলার ভৌগোলিক সীমারেখাই শুধু নয়, রাজ্যের জনবিন্যাসও বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আর সে প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকায় নয়, বরং প্রশ্রয়দাতার ভূমিকা নিচ্ছে। শাহের কথায়, অনুপ্রবেশ কোনো আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। তাঁর অভিযোগ, সীমান্ত রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ রুখতে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন, তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত রেখে শাহ জানিয়ে দেন, আসন্ন ভোটে অনুপ্রবেশই হবে বিজেপির প্রধান ইস্যু। তিনি ঘোষণা করেন, বাংলায় বিজেপি সরকার গঠিত হলে শুধু অনুপ্রবেশ রোখা নয়, ইতিমধ্যেই যারা বেআইনিভাবে ঢুকেছে, তাদের চিহ্নিত করে দেশের বাইরে পাঠানো হবে। তিনি জানান, এমন এক ‘মজবুত নিরাপত্তা বলয়’ তৈরি করা হবে, যাতে মানুষ তো দূরের কথা, পাখিও সীমান্ত পেরোতে না পারে। মতুয়া সম্প্রদায়ের উদ্দেশেও আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, যাঁরা শরণার্থী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন, তাঁরা ভারতের নাগরিক এবং তাঁদের কোনো ক্ষতি হবে না—এটাই বিজেপির প্রতিশ্রুতি।

এরপর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি আক্রমণ করে অমিত শাহ প্রশ্ন তোলেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর জন্য রাজ্য সরকার কেন জমি দিতে বারবার গড়িমসি করছে। তাঁর অভিযোগ, গোটা দেশে সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে রাজ্যগুলি জমি দিয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র ব্যতিক্রম। সীমান্তে অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে রাজ্য পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। কেন অন্য রাজ্যগুলিতে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, অথচ পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে—তার ব্যাখ্যাও রাজ্য সরকারকে দিতে হবে বলে দাবি শাহের। পাশাপাশি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন প্রসঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্যের দ্বন্দ্বের কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, এক দিকে কেন্দ্র সিএএ কার্যকর করতে চাইলে রাজ্য সরকার বিরোধিতা করে, অন্য দিকে সীমান্ত সুরক্ষার সমস্ত দায় চাপিয়ে দেওয়া হয় বিএসএফের উপর। এই দ্বিচারিতা রাজ্যবাসীর মধ্যেও অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির অভিযোগে মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করে তিনি বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধুমাত্র ভোট হারানোর ভয়েই অনুপ্রবেশ, কেন্দ্রীয় প্রকল্প কিংবা আইনশৃঙ্খলার মতো গুরুতর বিষয়ে মুখ খুলতে চান না। তাঁর কটাক্ষ, তোষণের রাজনীতি করেই ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে তৃণমূল কংগ্রেস।

নারী নিরাপত্তা নিয়েও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। সন্ধ্যার পর মহিলাদের বাইরে না বেরোনোর ‘পরামর্শ’কে তিনি মধ্যযুগীয় মানসিকতার নিদর্শন বলে আখ্যা দেন। আরজি কর হাসপাতাল, সন্দেশখালি ও দুর্গাপুরের ঘটনার উল্লেখ করে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগও তোলেন তিনি। রাজ্যের শিল্প, অর্থনীতি, রাজ্যের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ, বদ্ধ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে শাহের আক্রমণ আরো তীব্র। তাঁর দাবি, বাংলায় বড়ো শিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। বাম আমলে শিল্পের যে ক্ষতি হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা পুরোপুরি শেষ করে দিয়েছে বলে কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে অর্থনৈতিক সুযোগ এখন সীমিত কয়েকজনের মধ্যেই আবদ্ধ। উন্নয়নের বদলে সিন্ডিকেট রাজ চলছে। তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা গলা অবধি দুর্নীতিতে ডুবে আছে, অথচ মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেন না, কারণ তিনিও এই সিন্ডিকেটের থেকে লাভবান হন, কিন্তু ভোগে সাধারণ মানুষ। পিএম কিসান, আয়ুষ্মান ভারতের মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্প রাজ্যে কার্যকর না হওয়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন শাহ। তাঁর দাবি, মোদীর জনপ্রিয়তাকে ভয় পায় বলেই রাজ্য সরকার এই প্রকল্পগুলিকে আটকে রাখছে। পাশাপাশি মুখ্যসচিব ও ডিজি নিয়োগে কেন্দ্রীয় বিধি মানা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।

সব শেষে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে আবেদন জানিয়ে শাহ বলেন, কংগ্রেস, বাম ও তৃণমূল— সবাইকে দীর্ঘ সময় দেওয়া হয়েছে। এবার নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপিকে সুযোগ দেওয়ার সময় এসেছে। পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার হলে বাংলায় উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটবে বলেই তাঁর দাবি। রাজনৈতিক মহলের মতে, লোকসভা নির্বাচনের পর বিধানসভা ভোটের মুখে অনুপ্রবেশ ইস্যুকেই ফের এক বার কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে সামনে আনতে চাইছে বিজেপি। কলকাতায় অমিত শাহের এই সাংবাদিক বৈঠক সেই কৌশলেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

তবে, অমিত শাহের বঙ্গ সফরের মধ্যে রাজ্য বিজেপির আদি–নব্য দ্বন্দ্ব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। সোমবার সল্টলেক পার্টি অফিসে ও পরবর্তী বৈঠকে প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষসহ বহু প্রবীণ নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় মূলত ক্ষমতাসীন শিবিরের নেতারাই শাহকে ঘিরে রেখেছেন বলে দলীয় সূত্রের অভিযোগ। শাহ বৈঠকে বুথস্তরে জনসংযোগ বাড়ানো, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা ও মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক, এসআইআর এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি অনুপ্রবেশ, ধর্মীয় বিভাজন, শিল্প, কৃষি, সড়ক পরিবহন ও মহিলাদের ক্ষমতায়নের মতো বিকল্প উন্নয়ন মডেল প্রচারের নির্দেশও দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে দলের অভ্যন্তরের দ্বন্দ্ব গভীর অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলেই মত দলের একাংশের। ক্ষমতাসীন তৃণমূলের সাংগঠনিক ক্ষমতা এই মুহূর্তে শক্তিশালী, এর বিরুদ্ধে নির্বাচনে জয় পেতে নিবিড় জনসংযোগ, প্রবল প্রচার, বুথভিত্তিক কর্মীদের সক্রিয় করা, স্ক্রুটিনি, বিকল্প মডেল তুলে ধরতে হবে। আর তা করতে হলে, দলীয় কোন্দল যতসম্ভব দ্রুত মেটাতে হবে, এমনই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!