Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা স | হ | জ | পা | ঠ
  • মে ৫, ২০২৫

আবার সবুজ বিপ্লব ! অত্যাধুনিক ‘জেনোম এডিটিং’ প্রযুক্তি ব্যবহারে বিশ্বের প্রথম বিশেষ ধান তৈরি করল ভারত

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
আবার সবুজ বিপ্লব ! অত্যাধুনিক ‘জেনোম এডিটিং’ প্রযুক্তি ব্যবহারে বিশ্বের প্রথম বিশেষ ধান তৈরি করল ভারত

আধুনিক প্রযুক্তির কৃষিবিজ্ঞানের বিশ্ব ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা। ২১শ শতকের প্রজনন প্রযুক্তি ‘জেনোম এডিটিং’-এর ব্যবহারে দুটি নতুন ধান তৈরি করেছেন তাঁরা। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান ভ্যারাইটি দুটি উদ্বোধন করেছেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানের গুণগত মান উন্নত করা হয়েছে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই আবিষ্কার কৃষি ক্ষেত্রে এক বিশাল অগ্রগতি, যা খাদ্য নিরাপত্তা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে। জানা যাচ্ছে, নতুন ধানের প্রকারগুলি ২৫ শতাংশ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। এছাড়াও এগুলি কম জলের ব্যবহারে উৎপাদন করা যাবে।

ভারতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নয়াদিল্লি ও হায়দ্রাবাদের ধান গবেষণা-এর বিজ্ঞানীরা এই ভ্যারাইটিগুলি তৈরি করেছেন, যা যে কোনো জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। বিজ্ঞানীদের এই আবিস্কারের মাধ্যমে, ভারত বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ‘জেনোম এডিটেড’ বা জিই ধানের বিশেষ ধরন তৈরি করল। উচ্চ উৎপাদন, জলবায়ু অভিযোজন আর জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এ আবিষ্কার বৈপ্লবিক হয়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞানীদের দাবি, উদ্ভাবিত নতুন ২ ধানের প্রকার তৈরিতে কোনো বিদেশি ডিএনএ ব্যবহার করা হয় নি, তাই এগুলি জিনগত পরিবর্তিত বা জিএম নয়। অতএব, জিএম খাদ্য নিয়ে গোটা বিশ্বে যে দ্বিধা আর সংশয় রয়েছে, এ ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বলেছেন, ‘এই নতুন ফসলগুলি শুধু উৎপাদন বাড়াবে না, বরং পরিবেশের দিক থেকেও ইতিবাচক ফলাফল দেবে। জল সাশ্রয়, গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো-সহ একাধিক পরিবেশ সংক্রান্ত লাভ পাওয়া যাবে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘এই আবিষ্কার এমন এক প্রযুক্তির উদারণ যেখানে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি আর পরিবেশ রক্ষা দুইই হবে। ভবিষ্যতে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, উৎপাদন বৃদ্ধি করতে এবং বিশ্বের জন্য ভারত থেকে খাদ্য সরবরাহ করতে নতুন দিনের সূচনা হল।’ ভারতকে আগামী দিনে বিশ্বের খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা গর্বিত, আমাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে এ বছরে প্রায় ৪৮,০০০ কোটি টাকার বাসমতী চাল রপ্তানি করা হচ্ছে।’ যদিও নতুন ভ্যারাইটি দুটি বাসমতী চালের নয়।

এই সফলতা, ‘ভারতের কৃষি গবেষণার জন্য সোনালী-সুন্দর দিন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন কৃষি গবেষণা বিভাগের সচিব, আইসিএআর-এর মহাপরিচালক ড. এমএল জাট। তিনি কৃষিক্ষেত্রে চাহিদা ভিত্তিক গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘কৃষকদের চাহিদা ভিত্তিক উৎপাদন সম্পর্কে জানানো ও তাঁদের মতামত সংগ্রহ করার প্রয়োজন রয়েছে। এ কাজ নিশ্চিত করবে, আমাদের নতুন গবেষণা দেশের কৃষকদের প্রয়োজনীয়তার সাথে মানানসই কি না। তাঁদের সমস্যার কার্যকরী সমাধানসূত্র কি না। ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের বিজ্ঞানীরা দুটি ‘জেনোম এডিটেড’, জলবায়ু সহনশীল, উন্নত নতুন চালের ধরণ তৈরি করেছেন । ‘ডিআরআর ধান ১০০ (কামলা)’ আর ‘পুসা ডিএসটি ধান ১’ – এগুলি ভারতের জেনোম এডিটেড ফসলের জন্য নির্ধারিত বিধি অনুসারে উপযুক্ত পরিবেশ সংক্রান্ত বিধি অনুসারে ছাড়পত্র পেয়েছে। এই ধানগুলি ৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে চাষ করা হলে, অতিরিক্ত ৪.৫ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদিত হবে এবং গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০ শতাংশ (৩২,০০০ টন) কমবে। এছাড়াও, এই ফসলের চাষাবাদের জন্য কম সেচের প্রয়োজন পড়বে। ফলে, বেঁচে যাওয়া জল অন্য ফসল চাষে ব্যবহার করতে পারবেন কৃষকরা। ধানের এই নতুন উদ্ভাবনে অন্যান্য ফসলেও উচ্চ উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীলতা আর উন্নত গুণমানের জন্য আধুনিক এই পদ্ধতির ব্যবহারের পথ প্রশস্ত করেছে। শিবরাজ চৌহান ‘মাইনাস ৫ আর প্লাস ১০’-এর সূত্রও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ধান চাষের ৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি কমিয়ে, একই এলাকায় ১০ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফলে ডালশস্য ও তৈলবীজ চাষের জন্য বেশি জায়গা পাওয়া যাবে।’

ভারতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নয়াদিল্লির প্রধান বিজ্ঞানী ড. সি বিশ্বনাথন বলেন, ‘আজ ভারত, নতুন করে বিশ্ব ইতিহাস রচনা করেছে।’ অস্ট্রেলিয়ার মুরডক বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক চেয়ারম্যান, প্রফেসর রাজীব বর্ষণী ফার্স বলেন, ‘ভারতের নতুন এ উদ্ভাবনের আমি প্রশংসা করি। ভারত বায়োটেকনোলজি সরঞ্জাম ব্যবহার করে ফসলের সহনশীলতা, উৎপাদনশীলতা আর টেকসই হবার ক্ষেত্র উন্নত করতে কাজ করছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ও সম্পদ সীমাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশে মোকাবেলা করা যাবে। তবে এর মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের জীবনযাত্রার মান ও উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো।

২০২৩-২৪ সালের বাজেট ঘোষণা অনুযায়ী, ভারত সরকার কৃষি ফসলের জন্য জেনোম এডিটিং প্রযুক্তির জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। বর্তমানে আইসিএআর বহু ফসল, তেলবীজ এবং মটরশুঁটির জন্য জেনোম এডিটিং গবেষণা শুরু করেছে। বিশ্ব যখন খাদ্য সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বায়োটিক ও এবায়োটিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছে, তখন দ্রুত ও আধুনিক কৃষি উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তাঅ পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শুধু কৃষি নয়, উন্নত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণী, মাছ ও মাইক্রোবিয়াল প্রকার তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছে আইসিএআর। ‘জেনোম এডিটিং’, বিশেষ করে সিআরআইএসপিআর-সিএএস প্রযুক্তি বর্তমানে প্রজননের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি বিজ্ঞানীরা জীবদেহে লক্ষ্যভিত্তিক পরিবর্তন করতে সক্ষম হএছেন। বিদেশী ডিএনএ ছাড়াই নতুন আর চাহিদামত বৈশিষ্ট্য তৈরি করার ক্ষেত্রে মিলেছে সাফল্য। ২০১৮ সালে ‘ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল সায়েন্স ফান্ড’ এর আওতায় ধানের ‘জেনোম এডিটিং’ গবেষণা প্রকল্প শুরু করেছিল আইসিএআর।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!