- দে । শ
- জুন ১৫, ২০২৬
তৃণমূলের বিদ্রোহীদের নতুন ঠিকানা ‘এনসিপিআই’-এর অন্দরে ফাটল। ‘আমাকে না জানিয়েই সিদ্ধান্ত’- দাবি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের
সংসদের করিডরে এমন রাজনৈতিক নাটকীয়তা খুব কমই দেখা যায়। ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে ছাপ ফেলতে না পারা অল্প পরিচিতির রাজনৈতিক দল রাতারাতি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। কারণ, তৃণমূল কংগ্রেসের সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় সহ ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ ঘোষণা করেছেন, তাঁরা ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-এর সঙ্গে একীভূত হয়েছেন এবং লোকসভায় পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চাইবেন। আর এ নিয়ে ‘এনসিপিআই’-এর অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতানৈক্য।
তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদদের ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— কী এই এনসিপিআই? কোথা থেকে এল এ দল? এবং কেনই বা তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা ওই দলকেই নিজেদের নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা হিসেবে বেছে নিলেন? নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, ‘এনসিপিআই’ ‘নিবন্ধিত অথচ স্বীকৃতিহীন রাজনৈতিক দল’। যদিও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দলটি ‘এনসিপিএন’ নামে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি দলটির নিবন্ধন হয়। পশ্চিমবঙ্গে নিবন্ধিত হলেও দলটি প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ের জন্য বেছে নেয় ত্রিপুরাকে। দলের নথিতে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে শিউলি কুণ্ডুর নাম রয়েছে। তাঁর স্বামী উত্তীয় কুণ্ডু দলের সভাপতি। হাওড়া জেলার বানীপুর এলাকায় দলটির নিবন্ধিত কার্যালয়। একই ঠিকানায় শিউলি কুণ্ডুর সঙ্গে যুক্ত আরও দু–টি সংস্থারও নথিভুক্তি রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটির মোট অনুদান প্রাপ্তির পরিমাণ মাত্র ১ লক্ষ ১৩ হাজার টাকা।
২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে ‘এনসিপিআই’ ৭টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ৪টি আসনে মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২টি কেন্দ্রে নিজেদের প্রতীকে লড়ে দলটি। চাওমানু কেন্দ্রে এনসিপিআই প্রার্থী পান ৫৩৬ ভোট। কৈলাসহরে দলের প্রার্থীর ঝুলিতে আসে ২৮৬ ভোট। সব মিলিয়ে দলটির প্রাপ্ত ভোট মাত্র ৮২২। দল-সমর্থিত এক নির্দল প্রার্থী আমবাসা কেন্দ্রে ৩৭৬ ভোট পান। সে হিসাব ধরলে ‘এনসিপিআই’-ঘনিষ্ঠ প্রার্থীদের মোট ভোটসংখ্যা দাঁড়ায় ১,১৯৮। কোনো ক্ষেত্রেই জয়ের লড়াইয়ে তারা উল্লেখযোগ্য জায়গা করে নিতে পারেনি। ত্রিপুরায় দলের হয়ে লড়া একাধিক প্রার্থীর অভিযোগ, ভোট মিটতেই কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায় দলীয় নেতৃত্ব। কৈলাসহরের প্রাক্তন প্রার্থী জাহাঙ্গির আলির দাবি, নির্বাচনের সময় কলকাতা থেকে এসে যোগাযোগ করেছিলেন শিউলি কুণ্ডু। ভোটের পর আর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। ভোটে প্রচারের তেমন ব্যবস্থা ছিল না। মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রার্থী দাঁড় করানো। ভোটের পর আর দলের কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে, এত দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রায় অদৃশ্য থাকা দলটি আচমকাই কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটের জেরে! ‘বিদ্রোহী’ সাংসদরা সোমবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে পৃথক আসন বিন্যাসের আবেদন জানান। তাঁদের দাবি, লোকসভায় তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। শিবিরের অন্যতম মুখ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন, তাঁদের শক্তি আরও বাড়তে পারে। তাঁর দাবি, ‘আমরা পৃথক সংসদীয় গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চাইব।’ অন্য দিকে, প্রবীণ তৃণমূল নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘এনসিপিআই’-এর সঙ্গে একীভূত হয়েছে। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কৌশল পরে ঠিক করা হবে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিদ্রোহী সাংসদদের এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ-বিরোধী আইনের বিধান। আইন অনুযায়ী, কোনো আইনসভার দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য একসঙ্গে অন্য দলে মিশে গেলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দলত্যাগের অভিযোগ থেকে সুরক্ষা মিলতে পারে। সে কারণেই তৃণমূলের ‘বেসুরো’ সাংসদরা ‘এনসিপিআই’-কে বেছে নিয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। সূত্রের খবর, নতুন দলে যোগ দিলেও সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের নেতৃত্বাধীন এ গোষ্ঠী বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)-কেই সমর্থন করবে।
তবে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব। লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলনেতা অভিষেক ব্যানার্জি স্পিকারকে লেখা চিঠিতে দাবি করেছেন, শুধু আইনসভার দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন যথেষ্ট নয়। মূল রাজনৈতিক দলেরও আনুষ্ঠানিক একীভবন প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক দল এবং আইনসভার দল পৃথক সত্তা। কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছামতো নতুন নেতা বা হুইপ নিয়োগ করতে পারে না। সুদীপ, কাকলিদের তৎপরতার মধ্যেই সাংগঠনিক স্তরে একাধিক পরিবর্তন এনেছে তৃণমূল। দলীয় সূত্রের খবর, ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের সঙ্গে নাম জড়ানো কয়েক জন সাংসদকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যুব সংগঠন, মহিলা সংগঠন এবং উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলায় নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলের অনুগত সাংসদদের নিয়ে লোকসভা শাখাকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, তৃণ-নেতাদের যোগে ‘এনসিপিআই’ দলের অন্দরেও ফাটল ধরেছে। দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শান্তনু দে দাবি করেছেন, তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের দলে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। শুধু তাই নয়, এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করেছেন তিনি। শান্তনুর দাবি, ‘আমি এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এ ঘটনার বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। জানানো হলে আমি এর বিরোধিতা করতাম। এখনো করছি।’ তাঁর অভিযোগ, দলের সভাপতি উত্তীয় কুণ্ডুর সিদ্ধান্তেই এ পদক্ষেপ করা হয়েছে। শান্তনু বলেন, ‘উত্তীয়র সিদ্ধান্তেই নিশ্চয়ই এটা হয়েছে। আমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। আমাকে না জানিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।’ শান্তনুর আরও দাবি, তাঁকে ‘ন্যাশনাল অর্গানাইজিং জেনারেল সেক্রেটারি’-র দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তবু ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনের সময় দলের যাবতীয় সাংগঠনিক কাজ তিনিই সামলেছিলেন। একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। শান্তনু জানান, তিনি ‘আরএসএস’ এবং বিজেপির আদর্শে বিশ্বাসী। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের এই যোগদান যে তিনি ভালো চোখে দেখছেন না, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট।
অন্য দিকে, এ বিষয়ে দলের সভাপতি উত্তীয় কুণ্ডু কোনো মন্তব্য করেন নি। শান্তনুর প্রসঙ্গে তিনি কেবল বলেছেন, ‘দলে তাঁর কার্যকালের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে।’ দলের আর এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ শিউলি কুণ্ডুও আপাতত এ নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ। তিনি বলেছেন, ‘আমি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলাম। পদত্যাগ করেছি। এ মুহূর্তে আর কিছু বলব না। পরে যা বলার বলব।’ তবে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের যোগদানে তিনি খুশি কি না, সে প্রশ্নের উত্তরে শিউলির সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘হ্যাঁ। আমি তাঁদের স্বাগত জানাচ্ছি।’
❤ Support Us






