- কে | রি | য়া | র-ক্যা | ম্পা | স ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- ডিসেম্বর ১৭, ২০২৩
ধারাবাহিক আত্মকথা: আমাদের বিদ্যানিকেতন
আমি শিক্ষাঙ্গনের যৎসামান্য কারিগর, আমাদের অতীতের যা কিছু সঞ্চয়, সে অমূল্যকে এড়িয়ে নয়, সঙ্গে নিয়েই নির্বিশেষের ধারাবাহিকতাকে, তার অভিপ্রায়ের নির্মাণকে বিশেষায়িত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
সংগঠিত, পরিকল্পিত জীবনবোধ আর বৃহৎ প্রেমের দর্শন নিয়ে বললেন আদর্শবান শিক্ষাব্রতী । দর্শনের শিক্ষা আর সংগঠনের প্রাথমিক লক্ষ্য কীভাবে তাঁকে, তাঁর যুগোপযোগী নির্মাণকে ছুঁয়ে আছে, জানালেন সে অব্যক্ত, ব্যতিক্রমী বৃত্তান্ত ।
সম্পাদক
১৭.১২.২০২৩
• পর্ব-১৯ •
একটি সহজসত্য, বিনয়ের সঙ্গে, বলা জরুরি । ধ্যানধারণার, শৃঙ্খলার পরিসর তৈরিতে আমি গভীর বিশ্বাসী । অভিজ্ঞতার আয়তন কম হলেও, বলতে দ্বিধা নেই, এপর্যন্ত ব্যক্তিজীবনে কিংবা সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মে যেসব অর্জন, যেসব জয় পরাজয় আমাকে ছুঁয়ে আছে, তাতে নিয়মের রাজত্বকে যথাসম্ভব গুরুত্ব দিয়েছি, ধারাবাহিকতার উত্তরণকে কখনো থামতে দিইনি। আবার নিয়মপালনের নামে চিন্তা ও কাজের মধ্যে শৃঙ্খলকে উড়িয়ে দিয়ে নিঃশব্দে ঝুঁকি নিয়েছি । এনিয়ে বড়াই কিংবা আত্মগৌরবের বিলকুল সুযোগ নেই। ভেবেছি আপন মনে, সিদ্ধান্ত নিয়েছি শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শ আর সহযোগিতার বহু হাত সঙ্গে নিয়ে।ভাবিনি আমি যা ভাবছি, যা করছি, সেখানে আমার চিন্তা, আমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা, এরকম ভাবলে হয়তো আধিপত্যবাদ অথবা ব্যক্তি চিন্তার স্বৈরাচার আমাকে গ্রাস করত এবং পথভ্রষ্ট করে তুলত ।

আলিগড়ে স্যার সৈয়দ আহমেদ, বেনারসে পন্ডিত মালব্য মোহন, দিল্লিতে হাকিম আজমল খান যে মহৎ আদর্শ রচনা করেছিলেন, তার পুণনির্মাণ অসমে কি সম্ভব ? আমরা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা আর ঐতিহ্যের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করবার অপ্রাণ চেষ্টা করছি। আমাদের প্রতিটি শিক্ষানিকেতন আর তাদের ক্যাম্পাস এব্যাপারে নিরন্তর উৎসাহী
যে জমিতে মানবচর্চা, বিদ্যাচর্চা, আমিত্বহীনের আত্মচর্চা শুরু করেছিলাম, সে দুর্বল, অনাবাদী অথচ সম্ভবনাময় ক্ষেত্রভূমি একদম আমাকে বরদাস্ত করত না, জোট বেঁধে শোরগোল তুলত, বাইরের টাকা নিয়ে এআরেক ধান্দাবাজ ফায়দা লুটতে এসেছে। আমার সৌভাগ্য, সম্ভবত স্থির লক্ষ্য, ধারাবাহিকতা আর নিষ্ঠাযোগ দেখে কেউ কখনো সন্দেহের আঙুল তোলেননি, সম্ভব হলে সাহায্য করেছেন, না হলে বিস্মিত নয়নে কাজকর্ম দেখে গেছেন, তাঁদের বিস্ময়ে ভরসা ছিল, প্রশ্রয় ছিল, প্রতিশ্রুতি ছিল, না বলা বাণী ছড়িয়ে সমাজ বলার চেষ্টা করেছে, আমাদের ক্ষমতা সীমিত, অনগ্রসরতা দুর্বোধ্য আর দুর্ভেদ্য তুমি আমাদের নীতি আর প্রীতির নতুন অবলম্বন, এগিয়ে চলো, সঙ্গে আছি, সঙ্গে থাকব; এই যে শহুরে মধ্যবিত্ত আর গ্রামীণ প্রান্তিকের প্রেমময় যে অনুচ্চারিত সমর্থন সর্বদা পেয়েছি, যা এখনো ঋদ্ধ, অনুপ্রাণিত করছে আমাকে, মুক্ত শিক্ষাঙ্গনের ইমারতের ভিত্ গড়বার ক্ষেত্রভূমি দিয়ে । তার নিঃস্বর ঋণ শোধ করার শক্তি আমার কোথায় ? একমাত্র অসীমের সদর্থক ইঙ্গিতই সহায়ক । মহাপ্রকৃতির ইচ্ছে আমি পূর্ণ করতে চাই, মর্মে এবং কর্মে ।
আলিগড়ে স্যার সৈয়দ আহমেদ, বেনারসে পন্ডিত মালব্য মোহন, দিল্লিতে হাকিম আজমল খান যে মহৎ আদর্শ রচনা করেছিলেন, তার পুণনির্মাণ অসমে কি সম্ভব ? আমরা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা আর ঐতিহ্যের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করবার অপ্রাণ চেষ্টা করছি। আমাদের প্রতিটি শিক্ষানিকেতন আর তাদের ক্যাম্পাস এব্যাপারে নিরন্তর উৎসাহী । আমরা মনে করি, যে কোনো জনগোষ্ঠীর রুচি আর শিক্ষাসূচির ভিত্ হয়ে উঠুক তার ঐতিহ্য; আর নবায়িত স্রোত হোক ভবিষ্যত। প্রাচ্য আর আধাপ্রাচ্যের কিছুসংখ্যক শিক্ষা ক্যাম্পাস ও সিলেবাস দেখার যেটুকু সুযোগ পেয়েছি, তাতে মনে হয়েছে, অতীতের সঙ্গে বসবাস নয়, অতীতকে স্পর্শ করে তার কল্যানবোধ আর সাধনার ওপর ভর করে তারাও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে, ধারাবাহিকতাকে অপরিহার্য শর্ত বলে একে বিবেচনা করছে।আমি শিক্ষাঙ্গনের যৎসামান্য কারিগর, আমাদের অতীতের যা কিছু সঞ্চয়, সে অমূল্যকে এড়িয়ে নয়, সঙ্গে নিয়েই নির্বিশেষের ধারাবাহিকতাকে, তার অভিপ্রায়ের নির্মাণকে বিশেষায়িত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আশা করি, অনন্ত মঙ্গলবোধ আর দৃশ্যমান সদিচ্ছা অবিরত সঙ্গ দেবে, সাহস জোগাবে, নির্মাণের গতিকে স্তব্ধ হতে দেবে না, বলবে এগোয়, এগোতে থাকো,ধারাবাহিক বিস্তূতিকে ছড়িয়ে দাও আরো আরো দূরে, জড়িয়ে ধরো সমাজের সব অংশকে।এখন বুঝতে পারি,আমার অবচেতনে এরকম চিত্রার্পিত এক নির্দেশ ছিল যে, সমাজ, সমাজে বিরাজমান শ্রেণীভেদ বৈষম্য, কুসংস্কার আর প্রথাগত অন্ধকারকে উৎখাত করার দায়িত্ব নিতে হবে, অসংগঠিত জড়োসড়ো জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে, মাথা তুলবার আত্মশক্তিকে উন্মোচিত করতে হবে। আত্মসর্বস্ব রাজনীতি এই নির্দেশিকা দেয়নি।দিয়েছে দারিদ্রক্লিষ্ট পরিবেশ আর চড়াই-উৎরাই পারিপার্শ্বিক। স্কুলে, কলেজ-জীবনে, উৎপীড়িত, বিমর্ষ কৃষক আর শ্রমিকের মুখ দেখতে হত, সে মুখ উদীয়মান বয়সেও ধাওয়া করতে থাকে। পালাতে শিখিনি। নিজের অজান্তে রুখে দাঁড়াবার শিক্ষা কোত্থেকে পেয়েছি, বলতে পারব না, ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এর উজ্জ্বল খেতাব নিয়ে চাকরির মোহে আচ্ছন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল, এতে নিশ্চিত নিরাপত্তা, গাড়ি-বাড়ি, তথাকথিত সামাজিক সম্মানের অভাব হত না, এসব জেনেও আমি বিলকুল আজনবি রাস্তা বেছে নিলাম। ডিসটেন্স এডুকেশনের পাঠক্রম চালু করে সুযোগ আর অসহায় বিদ্যার্থীদের পাশে দাঁড়ালাম। ডিসটেন্স এডুকেশন কোর্স গত শতাব্দীর আশির দশকে সহজলভ্য ছিল না, এ ব্যাপারে অভিভাবক, শিক্ষক আর ছাত্রদের ধ্যানধারণা পরিষ্কার নয়, অসমের বাইরের বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় কোর্সটি চালু করে তাদের আয় আর পঠন পাঠনেপরিধি বাড়িয়ে তুলেছে, অসমের শিক্ষা বিভাগ এ ব্যপারে তখনো উদাসীন, গুয়াহাটি আর ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার কর্তৃপক্ষ সেকেলে ব্যবস্থা নিয়ে পড়ে আছে, অথচ ছাত্রছাত্রীদের চাপ বাড়ছে, নতুন নতুন বিষয় তাদের আকূষ্ট করছে, বিত্তবানদের সন্তান সন্ততি বাইরে চলে যাচ্ছে, হতাশা আর একধরণের শূণ্যতার ভেতরে বাইরে অদ্ভূত ফাঁক আর অস্পষ্ট দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।এরকম পরিস্থিতিতে সম্পদশূণ্য বিশ্বাস নিয়ে ছাত্রকূলের শূণ্যতা দূর করতে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের আকারহীন পরিকাঠামো নিয়ে দূরশিক্ষার স্বেচ্ছাসেবা শুরু করল এনইএফ। গোড়ার দিকে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি। আমল দেয়া না শিক্ষা বিভাগ, সংশয় আর সন্দেহে আচ্ছন্ন বিদ্যার্থী আর অভিভাবকেরা, অর্থের বিপুল অভাব।জনাকয়েক শিক্ষক আর অবৈতনিক হিতাকাঙ্খীরাই ভরসা। খরচ যোগাতে গিয়ে অনুভব করি, এক্ষেত্রে দরদী হাতের বড্ড আকাল, নিঃসঙ্গ আমি, একলব্য আমি দেশবিদেশের কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার কনসালটেন্সি শুরু করলাম।আয় বাড়ল ক্রমশ, শূন্যের ওপর ভাসমান তরী, স্বপ্নের উড়োজাহাজ সাকারের চেহারা নিয়ে ধীরে ধীরে উড়তে লাগল, বিরতিহীন চেষ্টা আর পরিশ্রম অভয় জাগাল, পথ আমাদের নির্ভুল। গন্তব্য নির্দিষ্ট ।
আমার এই অল্পকথার কাহিনী আমাকে শিক্ষা দিয়েছে, দুর্দিনেও সুদিনের স্বপ্ন দেখতে হয়। হতাশাকে প্রশ্রয় দিতে নেই, ধৈর্য, তিতিক্ষা, অবিরল প্রচেষ্টা আর পর্যবেক্ষনের ওপর ভর করে খোলা দৃষ্টি নিয়ে সম্মুখে পা ফেলা অত্যন্ত জরুরি, তার চেয়েও বেশি দরকার চিন্তা ও কাজের বাস্তবানুগ সমন্বয় এবং ধারাবাহিকতার সুরক্ষা। যে চেষ্টায় ধারাবাহিকের উপস্থিতি নেই, মাঝপথে থেমে যায় সেটা, কারক আর কর্মের মধ্যে অবিশ্বাস আর সংশয়ের প্রবেশ মানেই স্বপ্নময়তার সর্বনাশ। লাগাতার প্রক্রিয়াকে জাগিয়ে রেখেই আমরা দূরশিক্ষা কর্মসূচিকে ঘিরে এতদূর হেঁটে এসেছি। আরো আরো হাঁটতে হবে । জাগতে হবে । অন্যকেও জাগাতেও হবে । আমার গৃহে ঝাড়বাতির ঝলক আর পাশের বাড়িতে ঘুটঘুটে অন্ধকার এই বৈপ্যরিত্য মানতে পারি না । আমার চারিত ধর্মের শিক্ষা, নিজের খাবার আগে চারপাশের খবর নিয়ে দেখ, কে কে নিরন্ন, কোন ঘর আলোহীন। কোন কোন শিশু খিদের জ্বালায় কাঁদছে। মানবধর্মের এ নির্দেশকে গুরুত্ব দিই, দিতে পারি বলেই, জল আসে চোখে।
ক্রমশ…
♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦
লেখক: উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম বেসরকারি কলেজ গোষ্ঠী এন.ই.এফ-এর চেয়ারম্যান। গুয়াহাটির বাসিন্দা
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ১৮
❤ Support Us







