- এই মুহূর্তে কে | রি | য়া | র-ক্যা | ম্পা | স
- নভেম্বর ২২, ২০২৫
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তি-নির্ভর উদ্ভাবনই ভবিষ্যৎ ! শিক্ষানীতিতে ভরসা রেখেই কলকাতায় আইসিসি-র ইনোভেশন কনক্লেভে বার্তা বিশেষজ্ঞদের
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তর আজ দৈনিক বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে রোবোটিক্স, নতুন নতুন উদ্ভাবনের ঢেউ গড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। পিছিয়ে থাকতে চায় না ভারতও। দেশে উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রযুক্তি-ইকোসিস্টেমের আরো বিস্তারই এখন সময়ের দাবি। ভবিষ্যতের শিক্ষার রূপরেখা টানতে সরকারি আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়-প্রধান, শিল্পজগতের বিশেষজ্ঞ ও উদ্ভাবন-দূতরা এক মঞ্চে। ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি)-র উদ্যোগে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল ইনোভেশন কনক্লেভ। প্রযুক্তি, দক্ষতা ও শিক্ষার নতুন দিগন্ত কোথায়, সে নিয়েই চলল দিনভর আলোচনা। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আইসিসি ন্যাশনাল এক্সপার্ট কমিটি অন হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং-এর চেয়ারম্যান সত্যম রায়চৌধুরী, রাজ্যের স্কুল ও উচ্চশিক্ষা দফতরের প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি বিনোদ কুমার, অটল ইনোভেশন মিশনের মিশন ডিরেক্টর দীপক বাগলা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য ও প্রফেসর অনুপম বসুসহ শিক্ষাজগতের একাধিক বিশিষ্ট প্রতিনিধি।
আলোচনার শুরুতেই রাজ্যের স্কুল ও উচ্চশিক্ষা দফতরের প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি বিনোদ কুমার স্মরণ করালেন, গত এক দশকের অভূতপূর্ব বিনিয়োগের দৃষ্টান্ত। তিনি বললেন, ২০১১ সালে স্কুল শিক্ষার বাজেট ছিল ৮২৯ কোটি টাকা। বর্তমান সরকারের সময়ে তা বেড়ে ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার কোটিরও বেশি। একে শুধু বাজেট বৃদ্ধি নয়, শিক্ষায় কাঠামোগত রূপান্তরের ভিত্তিপ্রস্তর বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি। জানালেন, বিপুল এই অর্থেই তৈরি হয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণের নতুন মডেল এবং প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ্যপদ্ধতি। জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্যও ‘রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় নীতি ২০২৩’-এ ২০৩৫ সালের জন্য এক স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে— পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের উদ্ভাবন-ইকোসিস্টেমের অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সত্যম রায়চৌধুরী বললেন, ‘প্রযুক্তি আর উদ্ভাবন এখন একসঙ্গে দৌড়চ্ছে। ছাত্র-শিক্ষককে সেই গতির সঙ্গে তাল রাখতে হবে।’ তাঁর মতে, গ্রামাঞ্চলের পড়ুয়ারাই বাংলার ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের বড়ো অংশ; তাই উদ্ভাবনশিক্ষা শুধু শহর নয়, গ্রামেও পৌঁছে দিতে হবে। গ্রামেও ল্যাব, প্রকল্পভিত্তিক শেখা, প্রযুক্তিগত পরীক্ষানিরীক্ষার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ‘এখন এমন একটা সময়, যখন ছাত্রছাত্রীদের ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, মহাকাশ বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্সের মতো বিষয়ে ছোটবেলাতেই পরিচয় থাকা দরকার। কারণ দেশ যদি ডিপ টেক, স্পেস টেক বা এআই–এ বিশ্বমান বজায় রাখতে চায়, তবে ভাবনার পরিবর্তন শুরু করতে হবে শিশুপাঠ।
কনক্লেভে উপস্থিত শিক্ষাজগতের আর এক পরিচিত নাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানান, রাজ্য ইতিমধ্যেই প্রযুক্তিনির্ভর নতুন পাঠ্যক্রম তৈরিতে বড়ো পদক্ষেপ নিয়েছে। তাঁর মতে, উচ্চশিক্ষার উন্নতির স্বার্থেই নয়, বরং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানকে মাথায় রেখে নবম ও দশম শ্রেণির সিলেবাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স এবং সাইবার সিকিউরিটি যুক্ত করা হয়েছে। প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার এটি সঠিক সময় এবং সঠিক পদ্ধতি। পাশাপাশি তিনি জানান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয়েছে উদ্ভাবন-ইনকিউবেশন সেল, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের গবেষণা, নতুন ভাবনা এবং স্টার্ট-আপ আইডিয়ার উপর কাজ করতে পারছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অধ্যাপক ও গবেষক— দুই স্তরেই উদ্ভাবনী চর্চার পরিবেশ গড়ে উঠছে। আলোচনার মাঝেই উঠে আসে অটল ইনোভেশন মিশনের সাফল্যের গল্প। মিশনের পরিচালক দীপক বাগলা জানান, ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে ২৫ লক্ষ ৯৫ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী যোগ দিয়েছেন। শুধুমাত্র বৃহস্পতিবারই প্রায় ৩ হাজার পড়ুয়া তাদের নামে নথিভুক্ত করেছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, উদ্ভাবনকে স্কুল-স্তরে নিয়ে যাওয়া ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। তিনি দাবি করেছেন, আরো দশ হাজার স্কুলে নতুন ল্যাব চালু হয়েছে এবং পঞ্চাশ হাজার স্কুলে খুব শিগগিরই তা সম্প্রসারিত হবে। লক্ষ্য ২০৪৭ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যে ভারতকে বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ভাবননির্ভর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
উদ্ভাবন প্রসঙ্গে প্রফেসর অনুপম বসুর বক্তব্য ছিল খানিক আলাদা ঢঙে। তিনি বলেন, উদ্ভাবন কেবল প্রথাগত শিক্ষার ফল নয়। অনেকেই পাঠ্যবইয়ের বাইরে থেকেও অসামান্য আবিষ্কার-ক্ষমতার অধিকারী। তাই প্রতিভা খুঁজে পেতে গ্রাম–শহর নির্বিশেষে নজরদারি জরুরি। তাঁর মতে, শিক্ষাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা এবং শৈল্পিক গুণ— এই তিনের সমন্বয়েই তৈরি হয় নতুন প্রজন্ম। শিক্ষা সচিব বিনোদ কুমার এ দিন আররো একটি বিষয়ে নতুন দিশা দেন। তিনি জানান, রাজ্য এমন এক এআই–নির্ভর মূল্যায়ন–ব্যবস্থা তৈরি করছে, যা প্রতিটি ছাত্রের মেধা, দুর্বলতা, আগ্রহ ও সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে তাদের জন্য ব্যক্তিনির্ভর শিক্ষার পথ নির্দেশ করবে। তাঁর মতে, সবাই সমান প্রতিভাসম্পন্ন নয়। তাই এক পাঠ্যপদ্ধতি সবার জন্য কার্যকর হয় না। ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে ব্যক্তিগত বা ‘পার্সোনালাইজড লার্নিং’-এর ওপর ভিত্তি করে।
❤ Support Us






