- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুন ২৩, ২০২৬
হরমুজে নৌ পরিবহন বাড়লেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে লাগবে সময়, প্রণালী নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার বার্তা তেহরানের
পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যুদ্ধের ধোঁয়া পুরোপুরি না কাটলেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ ‘স্ট্রেট অব হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালী। ইরান ও আমেরিকার সাম্প্রতিক ‘শাণিত’ আলোচনার পর বহুল আলোচিত প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কিছুটা বেড়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফেরেনি। সামুদ্রিক ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ২৪ ঘণ্টায় অন্তত দু-ডজন বাণিজ্যিক জাহাজ এই সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করেছে। সংঘাতের সময়কার সর্বনিম্ন স্তরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হলেও যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১০টি জাহাজ ওই পথ ব্যবহার করত। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে স্বস্তির ইঙ্গিত মিললেও পূর্ণ স্বাভাবিকতা এখনো অনেক দূরের পথ। ইরান প্রশাসনের দাবি, হরমুজ আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরবে না। ভবিষ্যতে এই কৌশলগত জলপথের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হবে।
আমেরিকা-ইজরায়েল বনাম ইরানের প্রায় চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হয়েছিল জ্বালানি সঙ্কটের আশঙ্কা। বিশ্ব বাণিজ্যের উপর পড়েছিল অনিশ্চয়তার ছায়া। ‘শান্তি’ আলোচনার পর এশিয়ার ‘প্রাণ ভোমরা’য় ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন, জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘মেরিনট্রাফিক ডেটা’-র তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, রবিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত দু-ডজন বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে। তার মধ্যে কিছু জাহাজ পারস্য উপসাগর থেকে, আবার কিছু জাহাজ ওমান উপসাগরের দিক থেকে হরমুজ পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছে। সিএনএন প্রকাশিত মানচিত্রে দেখা গিয়েছে, ওমান ও ইরানের মাঝের সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে। যুদ্ধকালীন কার্যত স্তব্ধ অবস্থার তুলনায় এ অবশ্যই স্বস্তিদায়ক ছবি।
তবে পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক থেকে অনেক দূরে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১১০টি জাহাজ এই প্রণালী ব্যবহার করত। সে জায়গায় বর্তমানে মাত্র ১২-১৪টি জাহাজের যাতায়াত শুরু হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলের একাংশের মতে, সংকটের সবচেয়ে খারাপ সময় হয়তো কেটে গিয়েছে, কিন্তু স্বাভাবিকতা এখনো অনেক দূর। হরমুজের গুরুত্ব শুধু পশ্চিম এশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। উপসাগরীয় দেশগুলির তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছতে এই প্রণালীর উপরই নির্ভরশীল। ফলে, এ অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, জাহাজ পরিবহণ ব্যয়, বীমা খরচ, সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ কার্যত সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। নিরাপত্তাজনিত কারণে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ ওই পথ ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ইরান কয়েকটি নির্দিষ্ট মিত্র দেশ ছাড়া প্রায় সমস্ত দেশের জাহাজ চলাচলের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের বন্দরগুলিতে তেলবাহী জাহাজের প্রবেশ ও প্রস্থান রুখতে নৌ অবরোধ শুরু করে আমেরিকা। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলির উদ্বেগও বাড়তে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে সুইৎজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আমেরিকা-ইরান ‘শান্তি আলোচনা’ আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই বৈঠকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ফলাফল হল স্ট্রেট অব হরমুজকে ঘিরে একটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা বা ‘হটলাইন’ চালুর সিদ্ধান্ত। ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান ও দেশের পার্লামেন্ট স্পিকার মহম্মদ বাঘের ঘালিবাফ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে আমেরিকা-সহ অন্য কোনো দেশের জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করার সময়ে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হলে ওই হটলাইনের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ করা যাবে।
তবে শান্তি আলোচনার ইতিবাচক বার্তার পাশাপাশি ঘালিবাফের আর একটি মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ‘হরমুজ প্রণালী আর কখনো যুদ্ধের আগের অবস্থায় আর ফিরবে না। সকলের সেটা জানা উচিত।’ শুধু তা-ই নয়, তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন ও নৌ-চলাচল সংক্রান্ত বিধি মেনে চলা হবে ঠিকই, কিন্তু প্রণালীর প্রশাসনিক দায়িত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকাই হবে প্রধান। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় হরমুজকে ঘিরে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলেছে, সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইরান নিজের অবস্থান আরও শক্ত করতে চাইছে।
যদিও আমেরিকার তরফে প্রকাশিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম শর্তে ভিন্ন একটি কাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য ইরান সক্রিয় ভূমিকা নেবে। কোনো বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে অতিরিক্ত শুল্ক বা বিশেষ কর আদায় করা হবে না। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ জলপথের নিরাপত্তা ও পরিচালন ব্যবস্থা কী ভাবে চলবে, তা নির্ধারণ করতে ওমান এবং পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক সমঝোতায় পৌঁছনোর কথাও বলা হয়েছে। কারণ, হরমুজের এক দিকে যেমন রয়েছে ইরান, অন্য দিকে রয়েছে ওমান। ফলে এই কৌশলগত জলপথের নিরাপত্তা ও প্রশাসন নিয়ে একতরফা সিদ্ধান্তের বদলে বহুপাক্ষিক বোঝাপড়ার উপরই জোর দিতে চাইছে ওয়াশিংটন।
আলোচনার পর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন সাময়িক ভাবে ইরানের তেল রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ৬০ দিনের জন্য বিশেষ ছাড়পত্র জারি করেছে, যার ফলে আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক স্বাভাবিক ভাবে তেল বিক্রি করতে পারবে। একই সঙ্গে ইরানের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্রায় ১,২০০ কোটি ডলারের সম্পদের উপর তাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। যদিও অর্থ ব্যবহারের উপর নির্দিষ্ট নজরদারি ব্যবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছে আমেরিকা।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দু-দেশের অবস্থান এখনো এক নয়। মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার বিষয়ে ইরান সম্মতি জানিয়েছে। কিন্তু তেহরান সে দাবি নস্যাৎ করে জানিয়েছে, কোনো নতুন পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি তারা দেয়নি। ফলে এই ইস্যুটি ভবিষ্যৎ আলোচনার সবচেয়ে জটিল বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এ দিকে, হরমুজে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে ভারতও। ব্রিকসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বলেছেন, হরমুজ খুলে যাওয়ার ফলে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। সার, রাসায়নিক-সহ একাধিক শিল্পক্ষেত্রে সরবরাহের সঙ্কট কমবে। তবে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মতে, আপাতত যে স্বস্তির ছবি দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে নতুন বাস্তবতা। জাহাজ চলাচল বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু প্রাক্-যুদ্ধ অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে না হরমুজ। বরং প্রণালীকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আর সে সমীকরণের কেন্দ্রে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করার বার্তাই এখন স্পষ্ট ভাবে দিতে চাইছে তেহরান।
❤ Support Us







