- বি। দে । শ
- জুন ২৩, ২০২৬
হিজবুল্লাহ প্রশ্নে ওয়াশিংটনে লেবানন–ইজরায়েলের বৈঠক। সেনা প্রত্যাহারের দাবিতে চাপ বাড়াচ্ছে বেইরুট
পশ্চিম এশিয়ায় আপাত যুদ্ধবিরতির আবহ। কিন্তু শান্তির আড়ালেই জমছে নতুন কূটনৈতিক সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সমঝোতা চুক্তির ছায়ায় মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে শুরু হচ্ছে লেবানন ও ইজরায়েলের মধ্যে পঞ্চম দফার সরাসরি আলোচনা। একদিকে, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবি নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে চলেছে বেইরুট, অন্যদিকে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার প্রশ্নে অনড় তেল আভিভ। ফলে বৈঠক শুরুর আগেই শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে জল্পনা।
গত মার্চ মাসে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর রকেট হামলার পর নতুন করে জ্বলে ওঠে লেবানন-ইজরায়েল সংঘাত। তারপর থেকে ইজরায়েলের বিমান ও স্থল অভিযানে লেবাননে চার হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দাবি। এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া চার দফার আলোচনাও যুদ্ধ থামাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার পর সমস্ত ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার বিষয়ে একমত হলে কিছুটা শান্তি ফিরেছে।
সে সমঝোতাই এখন লেবাননের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের কাছে নতুন উদ্বেগের কারণ। প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন-সহ দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, লেবাননের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করার অধিকার বেইরুটের, তেহরানের নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় লেবাননকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেছে ইরান। ফলে কূটনৈতিক পরিসরে লেবাননের ভূমিকা অনেকটাই খর্ব হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। লেবাননের এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আমেরিকা–ইরান চুক্তি কার্যত তাদের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে। তাঁর দাবি, ‘আমাদের ও ইজরায়েলের মধ্যে আস্থার সংকট এতটাই গভীর যে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়া কঠিন। আমরা তাদের দাবি মানতে পারছি না, আর তারা আমাদের দাবিগুলিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।’
তবু আলোচনার টেবিলে একটি স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়েই যাচ্ছে লেবানন— দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা আদায় করা। বেইরুটের মতে, যুদ্ধবিরতি অর্থবহ হতে পারে তখনই, যখন বিদেশি সেনা তাদের ভূখণ্ড ছাড়বে। কিন্তু ইজরায়েলের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ থেকে সেনা সরানো হবে না। সোমবার এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘দক্ষিণ লেবাননে আমাদের বাহিনীর পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। যে কোনো উদীয়মান বা প্রত্যক্ষ হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তারা বাধ্য। উত্তর ইজরায়েলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা ওই অঞ্চল ছাড়ব না।’ এর কিছু ক্ষণ পরেই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাট্জ, সেনাপ্রধান এয়াল জামিরের যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, দক্ষিণ লেবাননে ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ ধ্বংস ও নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখার অভিযান চলবে।
ইজরায়েলের কাছে অবশ্য ওয়াশিংটনের আলোচনার মূল উদ্দেশ্য একটাই— হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা। সরকারের মুখপাত্র ডেভিড মেনসার বৈঠকের আগে বলেছেন, ‘লেবাননের সঙ্গে স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথে একমাত্র বাধা হিজবুল্লাহ। তাই তাদের অস্ত্রহীন, সংগঠন হিসেবে নিষ্ক্রিয় করতেই হবে।’ কিন্তু এ প্রশ্নেই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে লেবানন সরকার। ২০২৫ সাল থেকে ধাপে ধাপে হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি কমানোর চেষ্টা করলেও সরাসরি সংঘাতে যেতে চাইছে না বেইরুট। কারণ, তাতে ফের গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। অন্য দিকে হিজবুল্লাহ স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না। বরং ইজরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা থেকে সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এমত জটিল অবস্থায় অনেকেরই প্রশ্ন, ওয়াশিংটনের বৈঠক আদৌ কোনো ফল দেবে কি? বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে আপাত শান্তি ফিরে এলেও বাস্তবে কোনো পক্ষই নিজেদের অবস্থান বদলায়নি। যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতিকে সাময়িক ভাবে স্থিতিশীল করেছে ঠিকই, কিন্তু আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন এখনো দেখা যায়নি। অন্যদিকে, নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারকের লেবানন-সংক্রান্ত ধারা। ১৪ দফার ওই নথিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, লেবানন-সহ সমস্ত ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখা হবে এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। সে সূত্রেই সুইৎজারল্যান্ডে ইউএস–ইরান বৈঠকে লেবাননকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ ‘ডি-এস্কেলেশন সেল’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও লেবাননের প্রতিনিধিরা থাকবেন। সহযোগী হিসেবে থাকবে কাতার ও পাকিস্তান।
এ ব্যবস্থাকে ঘিরেই অস্বস্তিতে ইজরায়েল। তেল আভিভের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে লেবাননে সামরিক অভিযান চালাতে গেলে ওয়াশিংটনের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। অন্য দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী। নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘সমস্যার সমাধান হবে। আমি সমস্যার সমাধান করি। খুব দ্রুত সমাধান করি, এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না।’ ওয়াশিংটনে ইজরায়েল-লেবাননের বৈঠক মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং পেন্টাগনে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনায় দু–দেশের রাষ্ট্রদূতদের পাশাপাশি উপস্থিত থাকবেন মার্কিন কূটনৈতিক ও সামরিক কর্তারা। ওয়াশিংটনের দাবি, তাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র যুদ্ধবিরতি নয়, বরং ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তা চুক্তির পথ তৈরি করা। তবে পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, কাগজে-কলমে সমঝোতা আর বাস্তবের শান্তির মধ্যে দূরত্ব অনেক।
❤ Support Us







