Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৪

মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৪৪

সুধীরকুমার শর্মা
মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৪৪

।। শুকনাকান্ড ।। 

নিরাক আঙিনা

সাধনের কী যে হয়েছে ! 
 
বিকেল হতেই গঙ্গার ঘাটে এসে বসে, যেদিন ছুটি মেলে। রমাও সঙ্গ দেয় অবকাশ পেলে। ছেলে ব্যস্ত, তার সময় কই ! 
 
তবে একবার গোপাল বাবা মাকে পুরীতে নিয়ে গিয়েছিল। তখন তিনজন একসঙ্গে বেরিয়েছে—সমুদ্রসৈকত, জগন্নাথদেবের মন্দির, সিদ্ধবকুল, গুন্ডিচাভবন, সোনার গৌরাঙ্গ। 
 
সেদিন পথে চলতে চলতে সাধন ভেবেছিল, খুড়িমাকে নিয়ে সেও তো সপরিবারে আসতে পারতো। কিন্তু কী করতে পারতো সাধন। ভাত নুনের খোঁজেই যে জেরবার। 
 
খুড়িমা যেন অপরাধ না নেন, এখন প্রার্থনা করে সাধন। 
 
সেদিন খুশির হাওয়ার মধ্যেই গোপাল তার কাজে নতুনের সন্ধান করে বেড়াচ্ছিলো। ভুবনেশ্বর কটক ঘুরে এলো, জোগাড় করেছে নতুন যোগাযোগ, মাল পাঠাবে, এখানকার সুন্দর ডিজাইনের পোশাকও কিনবে। লক্ষ্যটা আলাদা, মনোহারী কটকি নকশাগুলো নমুনা হিসাবে নিয়ে যাওয়া, তারপর ওর নিজের কারিগরদের দিয়ে অবিকল ওড়িশা প্যাটার্নের পোশাক বানিয়ে নেবে। তাঁতিদের ঘরে কটকি ডিজাইনের থান তৈরি করিয়ে নেবে। শান্তিপুর, নবদ্বীপ, ফুলিয়ার তাঁতিঘরগুলোর সঙ্গে এমন কাজ আগে থেকেই করছে। 
 
গোপালের বুদ্ধি পাকা, সাধন স্বীকার করলো। এতটা পরিকল্পনা বয়সকালে সাধনের নিজের ছিল না। 
 
গঙ্গার তীর বিকেলের রিসর্ট। ঘাটে গুচ্ছ গুচ্ছ লোক, উপরের ঘাসজমিতেও। পা ছড়িয়ে আরাম। একটু ধুলো লাগে পোশাকে, যাওয়ার সময় উঠে একটু ঝেড়ে নিলেই হল। মুক্তোকান্দিতে কি এমনি করে লোকজন বিকেলে বিনোদনে যেত ! মনে হয় না, ভাবে সাধন আনমনে। এখানে, এই দেশে, এই নদী, গঙ্গা যার নাম, যেন এদেশের মানুষের ঠিক আপনজন নয়, বড়োজোর স্বল্পচেনা ভিনপ্রদেশের পড়শি, দেখা হয়, পরস্পরে কুশলহাসি দেয়া নেয়া, এ পর্যন্তই। দেশবাড়িতে গাঙ, বাঁওর, খাল, নালা ছিল ঘরের ‘আবিয়াতো মেয়ির’ মতো। বিনোদনী ভিড় কোনওদিনই সেখানে দেখেনি সাধন। আজ এই অলসবেলায়,মায়ের চালধোওয়া ভিজে হাতের মতো হাওয়ায় কেমন উদাসীভাব জাগে। হঠাৎই মনের গহনে আরেকটি প্রশ্নের উদয় হল— সেই দেশবাড়ির মানুষেরা যাকে দেশ বলতেন, এদেশের মানুষ তাকেই কি দেশ বলে! নাকি দেশ শব্দের মানে, দুই দেশে, আলাদা আলাদা?
 
দেশ শব্দের অর্থ তাহলে কী ? প্রশ্নটা কাকে করবে সাধন ? জবাব দেবার জন্য কেউ অপেক্ষা করলেন না যে। একজনই আছেন। সতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। কিন্তু তিনি এখন এতটা দূরের যে কাছে যাওয়ার উপায় নেই। যেতে পারলেও সাঙ্গোপাঙ্গোদের ভিড় ঠেলে প্রশ্নটি তোলা যাবে না। ওরা হাসবে, একটা বাচ্চা যার উত্তর জানে, সাধন জানে না! আশ্চর্য! 
 
বিরাজ পন্ডিতকে সাধন দেখেনি, গল্প শুনেছে— স্বর্গের দেবতাদের মতো বর্ণাবয়ব ছিল, কথা বলতে গেলেই উপবীতটিকে দুহাতে নাড়াতেন। যদি তাঁর সামনে গিয়ে সাধন দাঁড়ায়, প্রশ্নটি করে — কত্তা দাদামশাই, দেশ কারি কয় ? 
 
এবং তিনি, পন্ডিতপ্রবর শ্রীবিরাজমোহন আচার্য, জিহ্বায় ধ্বনিত হতো গম্ভীর তালবাদ্য, আকাশবাতাস মুখরিত হয়ে উঠতো, এক দীর্ঘ সংস্কৃত স্তোত্রমালা আবৃত্তি করতেন। 
 

দেশ নিয়ে কেমন টালমাটাল হয়ে যাচ্ছে সাধন, বুকে চিনচিনে কামড়। হৃৎপিন্ডে রক্তপতন হলে নাকি এরকম ব্যথা হয়। এ বেদনাকেই কি দেশের টান বলে লোকে ! ইচ্ছে করছে, একবার যদি মুক্তোকান্দিতে ঘুরে আসে

 
সাধন বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারতো না, অথচ, তার চোখের সামনে ভেসে উঠতো অখন্ডমন্ডলাকৃতি সুবৃহৎ আলোকপ্রদায়িনী এক রূপ, বেদ, বেদান্ত, মহাকাব্য, পুরান মন্থিত করা মহিমময়ী এক বিমূর্ত প্রতিমা। সাধন মুগ্ধ হয়ে সে রূপ চেয়ে চেয়ে দেখবে। 
 
যদি চন্দ্রমোহনের কাছে প্রশ্নটি তুলতো সাধন ! তিনি স্বভাবমিষ্টি হাসিটি ছড়িয়ে বলতেন —এই মাটি, পুষ্করনি, গাঙ, গাছগাছেলি, পুজেপাব্বন, যা যা একটা মানুষিরি, সকল মানুষিরি, ঘেরি রাখিছে, সব মিলোয়ে রক্তমাংসের যে দেহখান তুই দেখতি পাস, সিটাই হল দেশ।একটাও য্যান খামতি না পড়ে। 
 
খুড়িমা কি চন্দ্রমোহনের সঙ্গে একমত ছিলেন! সাধনের মনে হল, না, ছিলেন না। হেমশশীর স্নেহে যা যা বাঁধা তাকেই একটা কিছু ভাবতেন তিনি, বলতেন — সাধন, তুই, নীল, একরাম, ইয়াকুবির ছেলি, এসমাইলের বিটা বাচ্চু, আমার সন্তানসন্ততি সব, এয়া আমার দেশ। 
 
নিতাইদা ! তিনি বলতেন, দেখো সাধন, মাটি হচ্ছে একটা জড়পদার্থ। আমরা ম্যাপ এঁকে তাকে দেশ দেখাই, যেমন, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, চিন। ওটা দেশ নয়, সাধন, ওটা রাষ্ট্র, নেশন। আসল দেশ হলো মানুষ। মানুষ নেই, দেশও নেই। আফ্রিকা মহাদেশের সাহারা মরুভূমির মরুদ্যানগুলোয় যদি মানুষের অধিবসতি না থাকতো, তবে ওই বিশাল মহাদেশে অর্ধেকটাতে কোনও দেশের চিহ্ন থাকতো না। 
 
রমাকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয় ! সেও কি খুড়িমার মতো দেশের ধারণা করে? ভয় পেল সাধন, রমা খিলখিল করে হেসে উঠবে, চোখ কুঁচকে তাকাবে, তারপর বলবে — বুজজি, পাগলা হইবা। ভাব ধরতাছে। 
 
দেশ নিয়ে কেমন টালমাটাল হয়ে যাচ্ছে সাধন, বুকে চিনচিনে কামড়। হৃৎপিন্ডে রক্তপতন হলে নাকি এরকম ব্যথা হয়। এ বেদনাকেই কি দেশের টান বলে লোকে ! ইচ্ছে করছে, একবার যদি মুক্তোকান্দিতে ঘুরে আসে— সেই মাটি, মাঠ তেপান্তর, গাছপালা, খুড়েমশাইয়ের স্কুলবাড়ি, জয়েনকাকার কোঠা, হরিসভা, ভুঁইমালিনী কালিবাড়ি, সাধুইমামের মসজিদ, রূপসার জলস্রোত…।থাকবে না সাধন সেখানে আর, থাকা যাবে না। সে যে নিজদেশে পরদেশি হয়ে গেছে। শুধু একবারের জন্য যাবে। বউকে নিয়ে যাবে, ছেলেকেও। মুক্তোকান্দির মাটি তুলে সারা গায়ে মাখবে সাধন, গোপালকেও মাখাবে। ও হয়তো বাবাকে ছেলেমানুষ ভাববে, আপত্তি করবে। শুনবে না, জিদ ধরবে। দেশের মাটির রক্ত যে ওর গায়ে মিশিয়ে দেওয়া দরকার, ওর তাপ লাগবে শরীরে, মাতৃগর্ভের উষ্ণতা। রমার কপালে সিঁথিতে সে মাটি সিঁদুরের মতো লেপে দেবে। খুড়েমশাইয়ের বাড়িটা কি পোড়োভিটে হয়ে গেছে! বউছেলেকে দেখাবে, সেবাড়ির খাসনফর সাধন কোন ঘরটায় থাকতো, কোন ঘর নীলুদাদা বউদিদির, আর সেই ছোট্ট কামরাটি, চৌকিটা বোধকরি এখনও পাতা রয়েছে, পাশে কাঠের আলমারি, নীচে একটি তেপায়া জলচৌকির উপর যত্নে সাজিয়ে রাখা পিতলডাবার আলবাল, নল, কলকে, চন্দ্রমোহন হেমশশীর খাসকামরা। ঠাকুরঘর, পাকেরঘর, অগোছালো বাগান, পুকুর, তার পিছনে ইসমাইল শেখের কুটির। এবং অবশ্যই খুড়েমশাইয়ের কত্তামার হাতে পোঁতা চিরঞ্জীবী নিম্ববৃক্ষটি। কিচ্ছু বাদ দেবে না, কিচ্ছুটি। রূপসার বুক থেকে তুলে নেবে একবোতল ঘোলাজল এবং একদলা কালো কাদামাটি। ফিরে এসে ওই জল আর মাটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেবে চরগাঙপুরের বেড়ার ঘর উঠোনে। একাকার হয়ে যাবে ওদেশ এদেশ। ভাবে সাধন যাওয়াটা খুব কঠিন নয়, কিন্তু বড়ই কঠিন যে ! পাসপোর্ট লাগবে। সেটা করা যাবে, গোপালের অনেক চেনাজানা। ভিসা দরকার ওদেশের। একরামদাদাকে চিঠি লিখলে হয় না! সে কি সাধনকে চিনতে পারবে! পারবে, নিশ্চয়ই পারবে। একরামদাদা এখনও গ্রামে আছে তো ! যদি না থাকে, তবে? গোপালকে বলবে চিঠি লিখে দিতে, বলবে বাবার যে বানান শুদ্ধ হয় না। একরামদাদা কতবড়ো গুণীপন্ডিত। খুড়েমশাই তাকে তৈরি করেছেন।
 
গঙ্গার কোল ভেঙে একটা উপোসী হাওয়া এসে সাধনের বুকে লাগে, পিঠে ছোঁয়া দেয়, যেন কারও নরম হাত, হেমশশীর হাতের মতো। নিজের মা, জন্ম দিতে গিয়ে স্বর্গে গেছে, বিমাতাকে মা বলা হয়নি। বাবাও যে সাধনের কাছে বিস্মৃত। তার এই শিকড়চ্যুতিতে কোনও অনপনেয় পাপ হয় ! ভেবে চলেছে সাধন। তারপরই তার মাথাটি আপনাআপনি দুলে ওঠে, না, হয় না, হয়নি। চন্দ্রমোহন কী হেমশশীকে বাবা মা বলে ডাকা হয়নি। সম্বোধনটাই কি সব? তার অন্তর কী বলে ডেকেছে, বাহিরের সাধন জানবে কেমন করে ! দেশে যাবে সাধন। মনে মনে দেশের সংজ্ঞা খুঁজলে সাধন— দেশ এক অখন্ডতা, আবহমানতা। আকাশ যেমন। মাতা বসুমতী যেমন। হঠাৎ মনে হল সাধনের, হাওয়াটা আসছে তার কানে, মা গঙ্গার আদেশ বাজজে — যা, সাধন, দেশে যা। — সাধন ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। খেয়াল করেনি, ঘাট ফাঁকা হয়ে গেছে, চারদিকে অনেক অন্ধকার।
 
কলোনীটাকে পিচের দাগে চিরে নতুন রাস্তা। লরি, মোটরগাড়িও, কখনও কখনও যায়। বেশি চলে সাইকেল। আনঙ্গিনী বিলের পাশ দিয়ে দক্ষিণদিকে চলে গেলেই নতুন শহর। 
 
বিধান রায় নাকি স্বপ্ন দেখেছিলেন। 
 
সে শহরে তার স্বপ্নের মরণ ঘটে গেছে। কতো ছোটো, মাঝারি, কলকারখানা তৈরি হয়েছিল। সেসবের কঙ্কালসার হঠাৎ অচেনা পথিককে ভয় দেখায়। শিগগিরি সে জঙ্গল পরিষ্কার করে কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি হবে— উঠতি ধনিক সমাজের বাসভূমি। একসময়ের মজুর মহল্লাগুলিতে এখনও কিছু লোক পরিবার নিয়ে থাকে। কদিন থাকবে ! টাকার থাবায়, পুলিশের হানায়, গজিয়ে ওঠা নতুন দুবৃত্যদের চোখের লালে ঘর ছেড়ে ওদের চলে যেতে হবেই।  এও কি একরকমের দেশত্যাগ নয় ! মানুষের কি, তাহলে সত্যিই, কোনও দেশ নেই ! সেকি পাখি ? দেশছেড়ে আসার সময় এপাড়ে, ইছামতীর আঘাটায়, শালিকদের দেখেছিল সাধন, এপাড়ে ওপাড়ে উড়ে উড়ে খেলছিল ওরা। 
 
পথে আনমনা হাঁটতে হাঁটতে এইসব সাধনের মনে পড়ছিল।
 

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

ক্রমশ…
 
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ৪৩

মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৪৩


  • Tags:
❤ Support Us
ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
ঈশানবঙ্গের শক্তি পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!