- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৪
মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৪৩
।। শুকনাকান্ড ।।
অপত্যলোক
এতদিন চরগাঙপুরের সাধন রমার কুটিরে আসা যাওয়া করেছে স্নেহলতা, গোপালের সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি । তার ব্যবসাব্যস্ততার সব খবরই শুনেছে ।
সেদিন আচমকা সাক্ষাৎ হল ।
গোপাল এসে বসে পড়েছিল মা ও স্নেহলতার মাঝখানে । বেশ চুপচাপই কথা শুনছিল, মিটিমিটি হাসছিল । হঠাৎ বলে বসলো — জেঠিমা, তুমি যে এখানে আসো, মায়ের সঙ্গে গল্পসল্প করো, ভালোই লাগে । কিন্তু জ্যাঠামশাই, মনে হয়, জানেন না ।
— কেন রে ? — স্নেহলতার মুখ কি একটু শুকিয়ে গিয়েছিল ?
— তিনি, হয়তো, এটা পছন্দ করেন না । আমাদের জন্য তোমার সংসারে অশান্তি লাগবে । সেটা কি ভালো হবে, জেঠিমা ।
— তা লাগতিই পারে । — স্নেহলতা মুচকে হাসে ।
— কত বড়োমাপের মানুষ তিনি । নামকরা ডাক্তার । তার উপরে চেয়ারম্যান! লিডার বলে কথা । হয়তো এবার এম-এল-এ হবেন । মন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন ।
ছেলের প্রগলভতায় রমা লজ্জা পায়, মৃদু ভর্ৎসনা করে — এই, এমনি কইরা কথা কয় নাকি ! গুরুজনের লগে ? ছিঃ ! বড়ো হইছিস নিকি ! মাইর দিমু, কইলাম ।
— ও তো ভুল বলে নাই, দিদি ।
গোপাল মায়ের ধমক যেন উড়িয়েই দিল — দেখো, জেঠিমা, আমাদের জন্য তোমাকে আবার যেন গঞ্জনা শুনতে না হয় ! কানে এলে বাবা মা দুঃখ পাবেন । বাবার মেজাজ তো জানো না ! সবসময় টং । বিগড়ে গেলে মায়ের উপর ঝড়ঝাপটা! আমারও যে কষ্ট হবে ।
— বাপমায়ির দুঃখের ভাবনাতি কষ্ট পাস! বাবারে, আমার জন্যি কষ্ট পাবি নে ? আমিও যে তোর মায়িরই মতুন । গভ্যে তোরে ধরি নাই শুধু ।
রমা ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রসঙ্গ ঘোরাতে চায় — দিদি ! — ছেলেটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই ।
—ওরে কইতে দাও, দিদি । শোন বাপ, তোরে দুইখান কথা কই । আমার ছেলিও কি কম বড়ো মানুষ ? কতবড়ো কারবার চালাতেছে । ঠাকুরদা ঠাকুরমের নামে বেয়াপার । পোন্যির কাজ । আরেট্টা কথা । তোর জেঠা কুনও কথা কবে না । আমার মুখি খাড়োয়ে কইবের জোর তার নাই, বাপ । সে লিডের ফিডের যা খুশি হোক ।
গোপাল হাঁ করে যেন অচেনা মহিলার কথা শুনছিল । তেজিয়াল নারীচরিত্র মাকে দেখেছে । জেঠিমাকে সে নরম ভেবেছিল ।
— শুনি রাখ, আমি ওরে কিপে করি ।
গোপাল নিশ্চুপ । রমা আটকাবে, সাহস পায় না ।
— আমার ছেলি রইছে । আমার ভাসোর ঠাকুর, বড়ো জা রইছে । আমার কিসির ভয় ! একখান কথা কলি একশাড়িতি ও বাড়ি ছাড়ি চলি আসবো । আমার শাশোড়ি মায়ির থান পড়ি রইছে ইখানে । তোয়েগের চরদেশে । ভয় কুথায় ! দুবেলা দুমুঠে খাতি দিতি পারবি না ?
স্বপ্ননদীটি বাঁক নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে । মানুষের কটা স্বপ্নই বা শেষপর্যন্ত সত্যি হয়ে ওঠে ! এই যে স্বামীকে ডাঃ নীলাম্বর আচার্যে পরিনত করার জন্য যে প্রবল আত্মক্ষয়ী ক্ষরণ ঘটিয়েছিল, সযত্নে, স্পর্শ করে করে, তাকে বেসামাল অবস্থা থেকে টেনে ভরসমতার মাটিতে স্থাপন করেছিল, তখনও তো স্নেহলতা স্বপ্ন বুনছিল
গোপাল তখন স্থানু । সম্বিত ফিরতেই দুম করে সে পায়ে পড়লো, তারপর জড়িয়ে ধরলো স্নেহলতাকে ।
কথায় কথায় কথা ওঠে, ছেলের কথা ।
চন্দ্রমৌলি । বড়ো শখ করে রাখা নাম । ঠাকুরদার নামের প্রথম অংশটা নিয়ে ।
স্বপ্ন ছিল স্নেহলতার । ছেলেকে নিয়ে । আঁধার গর্ভদেশে যেমন সন্তানকে ঘিরে মাতৃকোষ, তেমনই গৌপন আবরণে ঢাকা স্বপ্নের ভ্রুণ ।
ঠাকুরদার মতো হয়ে উঠবে । সবার আপনজন । সকলের আদরের । শ্রদ্ধার ।
বিয়ের আগে স্নেহলতা শুনেছিল, আচার্য বাড়ির বউ হতে যাচ্ছে সে । সেবাড়ি পন্ডিত বাড়ি । চন্দ্রমোহনের পিতৃদেব বিরাজমোহন যশোর খুলনায় পঞ্চতীর্থ পন্ডিত বলে বিখ্যাত ছিলেন । শ্বশুরমশাইকে স্বচক্ষে দেখেছে ।
সেই বংশের প্রদীপ তার সন্তান, বয়ে নিয়ে যাবে বংশধারাকে । রক্তের মধ্যে.যে চারিত্রবীর্যকণা বয়ে চলেছিল, দেশভাগ সংকট, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশত্যাগ এইসব ঝামেলায় আচার্যশক্তিটি হারিয়ে গেছে । ছেলের বাবা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হয়েছে, নাম করেছে বটে, কিন্তু চরিত্রের সেই গার্ঢ্য তার মধ্যে নেই, উলটে হীনতা আছে । একি কোনও অভিশাপ ! নীলাম্বরের ক্ষুদ্র মনদৃষ্টি স্নেহলতাকে যন্ত্রণাবিষ্ট করে । স্বপ্ন দেখেছিল, ছেলে মাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে সেই লুপ্ত অহংকারের আভিজাত্য ।
চন্দ্রমৌলি ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে রোজ সকলের আড়ালে জলসিঞ্চন করেছে সেই স্বপ্নচারার তলের মাটিতে ।
পূরণ হল না । স্বপ্ননদীটি বাঁক নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে । মানুষের কটা স্বপ্নই বা শেষপর্যন্ত সত্যি হয়ে ওঠে ! এই যে স্বামীকে ডাঃ নীলাম্বর আচার্যে পরিনত করার জন্য যে প্রবল আত্মক্ষয়ী ক্ষরণ ঘটিয়েছিল, সযত্নে, স্পর্শ করে করে, তাকে বেসামাল অবস্থা থেকে টেনে ভরসমতার মাটিতে স্থাপন করেছিল, তখনও তো স্নেহলতা স্বপ্ন বুনছিল ।
নীলু প্রতিদান দিয়েছে সত্যি, বর্ণে বর্ণে, কিন্তু মূল্য দিয়েছে কি ? এত মিথ্যা নীলাম্বরের জীবনে !
ছেলেকে কোলছাড়া করে দিল ছেলের বাবা । মৃদু আপত্তি নীলুর আতিশয্যে মাটির তলায় চাপা পড়েছে । তারপর একদিন আবিষ্কার করেছে স্নেহলতা যে ছেলের সঙ্গে মায়ের নিযুতক্রোশের দূর রচিত হয়ে গেছে । গর্ভধারিণী ও গর্ভজ দুই ভিন্ন গ্রহের অধিবাসী, কোনও চেনা জড়ুলচিহ্নও নেই ।
রমা জিগ্যেস করে — তুমার পুলায় অখন কই থাকে ?
— সেরামপুরিতি ।
— এত লিখাপড়া করসে । বড়ো চাকুরি করবই ?
— হ্যাঁ । বেংকিতে । মেনিজার হইছে বুধায় ।
— বিয়া দিছ ?
— দেই নাই । করিছে । ওই সেরামপুরিরিই মেয়ি । নিজিই পছন্দ করিছেল । বাপমায়ির মত নিবার পরিশ্রম করে নাই । কলি তো আপত্তি করতেম না । আমার সঙ্গি সম্পক্ক নাই-ই পিরায় । বিয়ির পর বউরে নেয়ি আসিছেল । বাবারে নমস্কার করলো । আমারেও করিছে, মিথ্যা কবো না ।
— বউমা কেমন হইছে ?
— কতি পারবোনে না, দিদি । সে তো আমাগের সাথি ঘর করে নাই । অশেক্ষেত শাউড়ির সাথি চলবে কেমন করি ! সেরামপুরিতি ফেলাট কিনিছে । কথাবাত্তারা ভালো । আচের বিচের কেমন, কী করি কবো ?
— তুমি অগো এইখানে থাকতে কইলা না! ছিরামপুর কি এমুন দূর ! আমাগো কলুনির তিন চাইরজন রুজ টিরনে কইরা লিলুয়া কারখানায় যাইতাছে আইতাছে । আমাগো মাল নিয়া লুকেরা তো যায়অই । তোমার ভাসরেও গেছে ।
— ছেলির বাপ কয়েছেল । ছেলি কলো, বউমার অসোবিধে হবে । ছেলি, বউ, নাতিপুতি নেয়ি ঘর করার কপাল আমার নাই, দিদি । — স্নেহলতা কালো হয়ে ছিল ।
রমা তার কাঁধে হাত রেখেছে — দিদি ।
স্নেহলতার কন্ঠস্বর, শুকনো পাটকাঠি যেন, ভেঙে গেল— না গো, দিদি, দুখ্যু নাই । পাপ করিছেলেম আমি । তোমার দাদারে ওসকায়ি তার হাত ধরি…। পাচিত্তির করতি লাগবে না ! শাশোড়ি ঠাকরোন পথির সাধনা করিছেলেন । আমার যে সে বল নাই, দিদি । — স্নেহলতা কাঁদছে, শব্দ ভাঙা পেয়ালার কুচির মতো আওয়াজে, কাঁপাচ্ছে হেমশশীর বেড়াঘরের বাতাস । খোলা জানলা, চরগাঙপুরের গাছগুলো এইদৃশ্য দেখে অবাক হয় ।
রমা পারেনি, সময়ই অবশেষে স্নেহলতাকে বশে এনেছে । দামি শাড়ির আঁচলে চোখ মোছে, রমার কাছে একগেলাস জল চেয়ে খায়, বলে— দুখ্যু নাই, দিদি, কষ্ট নাই । তাই তো তোমার কাছে ছুটি ছুটি আসি । তোমারে দেখলি, দাদারে দেখলি, মনি বল পাই ।—থামলো স্নেহলতা,তারপর কেমন আবেশে ডুবে ভিজে গলায় আবার বলে, — আমার আরেকখান ছেলি আছে তো । সে আমার মনুবাঞ্ছা পোর্ণ করি দেবে ।
— তাই নাকি ? তার বিত্তান্ত তো কও নাই ! সে থাকে কই ?
— কেন গোপাল ।
♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦
ক্রমশ…
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ৪২
❤ Support Us








