- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৫
হিরণবালা । পর্ব ২২
ঘোঁতনের প্রশ্ন শুনে হিরণের মনে হয় দিন যত যাচ্ছে ততই কি বাচ্চাদের বুদ্ধি বেড়ে যাচ্ছে ? নাকি বিশ্বাসের যে-সহজ পৃথিবীতে আগে নিশ্চিন্তে, অতি সহজেই প্রবেশ করত শিশুরা,সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ? তাই ঘোঁতনের এই অবিশ্বাস ? তাই ও মেনেই নিতে পারছে না যে, মানুষ কখনো ফুল হয়ে যেতে পারে ?...তারপর
৩৯
খয়েরি খামটা যখন এসেছিল তখন হিরণ বাড়িতে ছিল। পোস্টম্যান শ্যামলালবাবু হিরণের খুবই ঘনিষ্ঠ। মাঝে মাঝেই হাসপাতালে যান সপরিবারে। ছোটোখাটো কিছু হলেও হাসপাতালে যাওয়া কিছু কিছু মানুষের প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শ্যামলালবাবু তেমনই একজন মানুষ। হাসিমুখে খামটা হিরণের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, সত্যর নামে চিঠি। বেলিয়াতোড় স্কুল থেকে এসেছে। দেখুন কোনো ভালো খবর আছে কি না।
এ-বাড়িতে চিঠি আসে শুধু হিরণের নামেই। এই প্রথম অন্য কারও নামে চিঠি এল। সে চিঠিও এসেছে স্কুল থেকে, সত্যর নামে। তাই বোধহয় অমন কথা বলেছিলেন শ্যামলালবাবু। কিন্তু তখনও হিরণ বুঝতে পারেনি খামের মধ্যে কী আছে। খাম খুলে ও তো অবাক! চাকরি পেয়ে গেছে সত্য। স্কুলের চাকরি। বেলিয়াতোড়ের স্কুলে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে ও। মাঝে বেশ কিছুদিন সত্য ছিল না। বলেছিল বেলিয়াতোড়ে বন্ধু গোরাচাঁদের বাড়িতে যাচ্ছে। কিন্তু একেবারেই জানায়নি যে, বেলিয়াতোড় স্কুলে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে ও। সত্য একটু চাপা ধরনের। গোবিন্দর মতো নয়। রাজনীতি নিয়ে অনর্গল কথা বলে যায় কিন্তু নিজের সব কথা খুলে কখনোই হিরণকে বলে না। তাই মনে হয় এই ইন্টারভিউয়ের কথাটা ও বলেনি। খামটা খুলে হিরণ যে কেবল অবাকই হয়েছিল তাই নয়, আনন্দে ওর চোখে জল চলে এসেছিল ! এই স্বপ্নই তো এতদিন ধরে ও দেখেছে। একটা চাকরি পাবে সত্য, ওর আর আর্থিক কষ্ট থাকবে না ! গীতার প্রয়োজন হলেই গীতাকে ও টাকা দিতে পারবে। ওর নিজের চাকরি পাওয়ার চেয়েও এবার ওর আরও বেশি আনন্দ হচ্ছিল। চিঠিটা যখন আসে, ঘরে তখন কেউই ছিল না। গোবিন্দ চলে গেছিল কলেজে। ঘোঁতন কী একটা কারণে খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সত্য ‘একটু আসতাসি মা’ বলে কোথাও একটা গিয়েছিল। যথারীতি বলে যায়নি কোথায় গেছে।
কিন্তু এত বড়ো একটা খবর হিরণ কিছুতেই চেপে রাখতে পারছিল না। কাউকে একটা জানানো দরকার ছিল এই খবর। আসলে আনন্দের খবর যতক্ষণ পর্যন্ত না কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই আনন্দটা বোঝা যায় না। ঘুমন্ত ঘোঁতনকে ঘুম থেকে তুলে কোলে নিয়ে হিরণ তাই সোজা গিয়ে পৌঁছেছিল হাসপাতালে।
বেলা প্রায় সাড়ে বারোটা বাজছিল তখন। ওপিডি শেষ করে চুপচাপ বসে একটা বই পড়ছিলেন ডাক্তার শিট। ওঁর হাতেই খামটা ধরিয়ে দিয়ে হিরণ বলেছিল, দ্যাহেন, দ্যাহেন, কী হইসে।
ডাক্তার শিট গম্ভীর মুখে চিঠিটা পড়ে, গম্ভীর মুখেই বলেছিলেন, দিস ইজ গ্রেট। আপনাকে অনেক অভিনন্দন সিস্টার। সত্যকেও অভিনন্দন। আপনার লড়াই এবার স্বীকৃতি পাচ্ছে।
ডাক্তার শিটের এই কথাগুলো শুনে হাউহাউ করে কেঁদেই ফেলেছিল হিরণ। ঘোঁতন অবাক হয়ে ওকে দেখছিল। বুঝতে পারছিল না দিদিমা কাঁদছে কেন। ডাক্তার শিট কিন্তু হিরণকে কাঁদতে দিয়েছিলেন। বুঝেছিলেন এই অশ্রু আনন্দাশ্রু। অমূল্য।
ঘরে ফিরে এসে হিরণ দেখেছিল বন্ধ দরজার সামনে সত্য দাঁড়িয়ে। হিরণ কিছু বলার আগেই ঘোঁতন চিৎকার করে উঠেছিল, বড়োমামা, তুমি চাকরি পেয়েছ !
ঘোঁতনের কথা ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না সত্য। হিরণকে জিজ্ঞেস করেছিল, কী কইসে ঘোঁতনা? তোমার হাতে ঐ চিঠিখান কীসের?
হিরণের ঠোঁট কাঁপছিল। কাঁপাকাঁপা ঠোঁটেই ও বলেছিল, ঠিক কইসে ঘোঁতন। তুই যে বেলিয়াতোড় স্কুলে ইন্টারভিউ দিছস, আমারে কইস নাই তো!
সত্য হিরণের কথার জবাব না দিয়ে ওর হাত থেকে চিঠিখানা প্রায় কেড়েই নিয়ে, পড়ে, দুম করে একটা প্রণাম করেছিলে হিরণকে। তারপর বলেছিল, কই নাই কারণ চাকরিখান না হইলে তুমি দুঃখ পাইতা। তুমি খুশি হইস তো মা?
হিরণ এ কথার কোনো উত্তর দেয়নি। বহু বহুদিন পর সেই ছেলেবেলার মতো বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিল সত্যকে।
এসব ঘটনা প্রায় একমাস আগের। বেলিয়াতোড় চেনা জায়গা। যে-স্কুলে সত্য পড়েছে, সেই স্কুলেই চাকরিও হল। এর মধ্যে সত্য একবার গিয়ে ঘুরে এসেছে বেলিয়াতোড় থেকে।
বলছে নিজের স্কুলে চাকরি হওয়া যেমন সুবিধের, তেমনই অসুবিধেরও। ওর মাস্টারমশাইরা প্রায় সকলেই হয়ে যাচ্ছে ওর সহকর্মী। সত্যর কথা ঠিক। শিক্ষকরা সহকর্মী হলে যেমন কিছু সুবিধে থাকে, তেমনই অসুবিধেও থাকে। সত্যর সঙ্গেই চাকরি পেয়েছে গোরাচাঁদও। ওর বিষয় দর্শন।
গোরাচাঁদ সত্যকে বলেছে স্কুলে জয়েন করে প্রথম কিছুদিন ওদের বাড়িতেই থেকে যেতে। কিন্তু সত্য সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। অন্য কারোর বাড়িতে থাকার মানুষ সত্য নয়। ও ঠিক করেছে স্কুলের হোস্টেলেই থাকবে। স্কুলের হোস্টেলে যেমন ছাত্ররা থাকে তেমন কয়েকজন মাস্টারমশাইও থাকেন। মেসবাড়ির মতোই তাঁরা একসঙ্গে রান্না করে খান। সেখানেই সত্য খাবে।
সত্য চাকরি পাওয়ায় হিরণের আত্মীয়-স্বজনরা সকলেই খুব খুশি। শুধু দাদা খুশি কি না হিরণ বুঝতে পারছে না। চাকরির চিঠিটা যেদিন এসেছিল, সেদিনই হিরণ সত্যকে বলেছিল ওর চাকরি পাওয়ার কথাটা দাদাকে চিঠি লিখে জানাতে। সত্য জানিয়েওছিল। কিন্তু দাদা সেই চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি। যে-দাদা না থাকলে সত্যর পড়াশোনা হতই না, সেই দাদাই সত্যর এত বড় সাফল্যে এরকম নিশ্চুপ হয়ে যাবে, সে কথা হিরণ ভাবতেই পারেনি। ও ঠিক করল ও নিজেই দাদাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটা চিঠি লিখবে।
৪০
হিরণ এসেছে বেলেঘাটায়। নির্মলার কাছে। ঘোঁতনের অন্নপ্রাশনে নির্মলাকে একপ্রকার যেতেই দেয়নি হিরণ। সেই তখন থেকেই এক তীব্র অপরাধবোধ কাজ করছিল হিরণের মনে। মাঝে চিঠিপত্রে কিছু কথা হয়েছে নির্মলার সঙ্গে। কিন্তু দেখা আর হয়নি। এখন হিরণের জীবনে কিছুটা স্থিতি এসেছে। সত্য চলে গেছে বেলিয়াতোড়ে। দু-সপ্তাহ অন্তর রামসাগরে ফেরে। ঘোঁতনও খানিকটা বড়ো হয়েছে এখন। কুট্টিও। গীতারাও মোটামুটি চালিয়েই নিচ্ছে জীবন। তাই হিরণ একটা ছুটি পেয়ে ঠিক করে বেলেঘাটায় গিয়ে এক সপ্তাহ কাটিয়ে আসবে নির্মলার কাছে। ওর সঙ্গে এসেছে গোবিন্দ আর ঘোঁতন। কিছুদিন পরেই গোবিন্দর গ্রাজুয়েশনের পড়া শেষ হবে। সত্যর মতো গোবিন্দও একটা চাকরি পেলে হিরণের নিশ্চিন্তি।
বেলেঘাটায় যেখানে থাকে নির্মলা, সেটা আসলে একটা বস্তি। প্রচণ্ড নোংরা আর ঘিঞ্জি। একাধিক পরিবারের বাস এই বস্তিতে। সবাই উদ্বাস্তু। নির্মলার বাড়ি আসলে বাড়ি নয়। পলিথিন দিয়ে ঘেরা একটা আস্তানা। বাথরুম নেই। বস্তির কয়েকটা বাথরুম আছে সবার জন্য। সেই বাথরুমগুলোই ব্যবহার করতে হয়। সকাল থেকেই সেখানে লাইন পড়ে। ঝগড়াঝাঁটি হয় বিস্তর। এখানে খাওয়ার জল পাওয়া হল আর এক সমস্যা। এত বড়ো বস্তিতে মাত্র দুটো কল। জল নেওয়া নিয়েও মানুষে মানুষে মারপিট লেগে যায়। অনেকটা সেই লাবণ্যদের কুপার্স ক্যাম্পের মতো। প্রথমে লাবণ্যর ক্যাম্পের জীবন আর এখন নির্মলার এই বেলেঘাটার বস্তির বাড়ি দেখে হিরণের মনে হয় ও খুব ভাগ্যবান। এতখানি কষ্ট ওকে অন্তত করতে হয়নি। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো নির্মলাকে নিতে হচ্ছে একজন জড়বুদ্ধিসম্পন্ন সন্তানের দায়িত্ব।
সকাল সকাল উঠেই রান্না বসায় নির্মলা। আজও সে রকমই রান্না বসিয়েছে। ওকে সবজি কেটে সাহায্য করছে হিরণ। সবজিকে অবশ্য নির্মলা বলে তরকারি। গীতা, গোবিন্দ, সত্যও তাইই বলে। ও দেশে সবজিকে তরকারি বলাই ছিল চল। কাঁচা হলেও তরকারি, রান্না করা হলেও তরকারি। এ-দেশেই দুয়ের মধ্যে তফাৎ আছে। কাঁচা হলে তার নাম সবজি। না হলে তখন সে হয়ে গেল তরকারি। এসবই ভাবতে ভাবতে কচ কচ করে লাউ কাটছে হিরণ।
কড়াইয়ে খুন্তি নাড়তে নাড়তেই নির্মলা বলে, এত কাম করো ক্যান? মাইয়ার বাড়ি আইস, দুটা দিন বিশ্রাম লইয়া যাও।
হিরণ বলে, এই তো তুই কামে চইলা গেলেই পুরো বিশ্রাম নিমু।
এ কথা বলল বটে হিরণ কিন্তু ও জানে বিশ্রাম হবে না। পল্টুর দেখাশোনা করতে হবে।
পল্টুর একটা কথাও ও স্পষ্ট করে বুঝতে পারে না। বিড়বিড় করে নানা কিছু বলে যায় পল্টু। হাত-পা ছুড়তে থাকে। তার মধ্যে মাত্র একটা দুটো শব্দই কেবল বুঝতে পারে হিরণ। ওর কথা না বুঝতে পারলে পল্টু প্রচণ্ড রেগে যায়। মেঝেতে দুমদুম করে হাত ঠুকতে থাকে। এই সময়গুলোতে ঘোঁতন ওকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। ঘোঁতন একবার হিরণকে জিজ্ঞেসও করেছে, দিদিমা, পল্টুদা কি পাগল?
হিরণ বলেছে যে, পল্টু পাগল নয়। ওর বুদ্ধি একটু কম। পৃথিবীতে সব মানুষ সমান বুদ্ধি নিয়ে জন্মায় না। রেগে না গেলে কিন্তু পল্টু খুব ভালো মানুষ। ঘোঁতনের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বিড়বিড় করে কত কিছু বলতে থাকে। সেসব কথার অবশ্য একটা বর্ণও বোঝা যায় না। তাও তো এখন হিরণরা আছে বলে সারাদিন পল্টুর দেখাশোনা করতে পারে ও। অন্য সময় নির্মলা পল্টুকে রেখে যায় পাশের বাড়ির এক মহিলার ভরসায়। তিনি প্রায় হিরণেরই বয়সি। তাঁর ছেলের নাম শংকরপ্রসাদ। ছেলেটি বিয়ে করেনি। নির্মলার সঙ্গে একই মার্বেল ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। হিরণ এই দু-দিনেই বুঝেছে ওই ছেলেটি নির্মলার লোকাল গার্জেন। সত্যিই ছেলেটি নির্মলার জন্য করেও অনেক। ওর মাই সারাদিন পল্টুর দেখাশোনা করে। খাইয়ে দেয়। ধরে ধরে বাথরুমেও নিয়ে যায়। সত্যি বলতে কি, শংকরপ্রসাদ আর ওর মা না থাকলে, নির্মলার একার পক্ষে পল্টুকে বড়ো করা অসম্ভব হত।
গোবিন্দ ছোটোবেলায় নির্মলাকে প্রায় দেখেইনি বললেই চলে। অত ছোটো বয়সের স্মৃতি কি কারও মনে থাকে! বেলেঘাটায় আসায় সবচেয়ে বড়ো লাভ হল এটাই যে, নির্মলার সঙ্গে গোবিন্দর চমৎকার একটা বোঝাপড়া তৈরি হল। গতকাল সন্ধেবেলাতেই নির্মলা কাজ থেকে ফেরার পরে দুই ভাই-বোনে গল্প করছিল। গোবিন্দ নির্মলাকে বলছিল, তর আবার একখান বিয়া করন লাগে।
শুনে শুধু অল্প হেসেছে নির্মলা। কিচ্ছু বলেনি।
এমনিতে বাঙাল ভাষায় একেবারেই কথা বলে না গোবিন্দ। হয় বাঁকড়ি ভাষা বলে, না হলে কলকাতার বাংলা। এবারই হিরণ দেখছে বেশি বেশি করে বাঙাল ভাষায় কথা বলছে গোবিন্দ। হয়তো ও মনে করেছে এই ভাষায় কথা বললে তাড়াতাড়ি নির্মলার সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব হয়ে যাবে।
দেখতে দেখতেই সাতটা দিন কেটে গেল। যাবার সময় ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে একটা থালা বের করল নির্মলা। সেই থালাটা ঘোঁতনের হাতে দিয়ে বলল, লও এইখান। তোমার অন্নপ্রাশনের উপহার।
থালাটা দেখেই চিনতে পারল হিরণ। এই থালাটা নির্মলাকে কিনে দিয়েছিল ওর নিজের মা। এই থালাটাতেই নির্মলা ভাত খেত। নির্মলাকে ভাত বেড়ে দিত হিরণ। মানুষটা বিয়ের পরেই ওকে বলেছিল এই থালাতেই যেন প্রতিদিন নির্মলাকে হিরণ খেতে দেয়। সেই থালা কত অনায়াসেই নির্মলা দিয়ে দিল ঘোঁতনকে!
নির্মলার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বস্তির সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে এই প্রথম হিরণের মনে হল, মনোরঞ্জনদের বাড়িতে নির্মলার বিষয়টা জানানো দরকার। যা সত্য তাকে জোর করে চেপে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। সত্য ঠিক একদিন নিজে নিজেই প্রকাশ পেয়ে যায়।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ২১
❤ Support Us








