- প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
- অক্টোবর ১৩, ২০২৫
ইজরায়েলি যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দিল হামাস। ‘যুদ্ধ শেষ’ দাবি ডোনাল্ড ট্রাম্পের
২ বছরের যুদ্ধ, মৃত্যু আর ধ্বংসের পর অবশেষে নতুন সকালের ইঙ্গিত। গাজার বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেলেন ৭জন ইজরায়েলি নাগরিক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাঁদের আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। উৎসব, উল্লাস এবং যুদ্ধের ক্লান্তি থেকে অবশেষে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল ইজরায়েলের আনাচে কানাচে। আর সেই ছবিকে পাথেয় করেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা— ‘গাজার যুদ্ধ শেষ।’ যাঁরা হামাসের হাতে বন্দিদশা কাটিয়ে ফিরে এলেন, তাঁদের নাম একে একে জানাল ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যম। গালি বারমান, জিভা বারমান, মাতান আংগ্রেস্ট, আলন ওহেল, ওমরি মিরান, ইতান মোর এবং গাই গিলবোয়া-ডালাল, এই ৭জনকে প্রাথমিক পর্যায়ে মুক্তি দিয়েছে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠনটি। অক্টোবর ৭ এর বর ২ বছর ধরে তাঁদের বন্দি করে রেখেছিল হামাস। অনেক চেষ্টার পরও সেনা অভিযানে তাঁদের মুক্ত করতে পারেনে তেল আবিভ। শেষমেশ কূটনীতিই কাজ করল।
সোমবার সকালে উত্তরের গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ওই ৭ জনকে। যদিও তাঁদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানানো হয়নি। ইজরায়েলি সেনাবাহিনীও এ মুহূর্তে তাঁদের গ্রহণ করেছে কি না, তা স্পষ্ট করে জানায়নি। কিন্তু তাতে থেমে থাকেনি নাগরিক উল্লাস। তেল আভিবের ‘হোস্টেজ স্কোয়ার’-এ হাজার হাজার মানুষ জমা হয়েছিলেন ঐতিহাসিক মুহূর্তর সাক্ষী থাকতে। সাদা-নীল পতাকা হাতে তাঁরা একসুরে বলছিলেন— ‘ওরা ফিরছে!’ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, রেড ক্রস জিম্মিদের গাজা থেকে ইজরায়েলি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে নিয়ে আসে। সেখান থেকে তাঁদের গাড়িতে করে রওনা করানো হয় দক্ষিণ ইজরায়েলের রেইম সামরিক ঘাঁটির দিকে। পরিবারের সঙ্গে তাঁদের পুনর্মিলনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও করা হয়েছে। গোটা যাত্রাপথে ছিলেন চিকিৎসক, অ্যাম্বুল্যান্স প্রস্তুত ছিল জরুরি চিকিৎসার জন্য। কারো অবস্থা গুরুতর হলে সোরোকা অথবা বারজিলাই হাসপাতালে ভর্তি করা হবে বলে জানা যাচ্ছে। বাকিদের পর্যায়ক্রমে নিয়ে যাওয়া হবে হাসপাতালে।
এই মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে আশা তৈরি হলেও, গাজা যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি সহজে মুছে যাবার নয়। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬৬ হাজার ফিলিস্তিনের নাগরিগ, বেসরকারি মতে সংখ্যাটা ৭৫ হাজার। যাঁদের মধ্যে অধিকাংশ শিশু ও মহিলা। ইজরায়েলি বোমার আঘাতে গাজা উপত্যকা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, মৃত্যু নীরবতা আর দুর্ভিক্ষের আর্তনাদ ভারি করে তুলছে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার আকাশ-বাতাস। খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফিলিস্তিনের বহু এলাকা দুর্ভিক্ষের কবলে। সে প্রেক্ষিতে এই মুক্তি একদিকে যেমন ত্রাণের আশা এনে দিল, অন্যদিকে রাজনৈতিক কৌশল ও সামরিক চাপের মিলিত ফল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। হামাসের তরফ থেকে একটি বিবৃতি জারি করে বলা হয়েছে, তারা চুক্তির শর্ত মেনে চলবে, যতক্ষণ না ইজরায়েল তা ভাঙে। তারা দাবি করেছে, এ চুক্তি তাদের জনগণের দৃঢ়তা এবং প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সংগ্রামের জয়। বন্দিদের মুক্ত করার জন্য ইজরায়েল যত সামরিক চাপই দিক শেষ পর্যন্ত তারা বাধ্য হয়েছে বিনিময়ে রাজি হতে।
বন্দি বিনিময়ের অংশ হিসেবে ইজরায়েলও মুক্তি দিতে চলেছে বহু ফিলিস্তিনি বন্দিকে। সংবাদ মাধ্যম রাওটার্স সূত্রে খবর, ২৫০ জন ফিলিস্তিনি, যাঁরা আজীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন, তাঁদের আজই মুক্তি দেওয়া হবে পশ্চিম তীর, জেরুজালেম ও কিছু বিদেশি জায়গায়। পাশাপাশি, গাজা থেকে আটক করা ১,৭১৬ জন ফিলিস্তিনি নাগরিককেও ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই নাসের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। ঐতিহাসিক মুক্তি পর্যায়ের পর ইজরায়েলি সেনাবাহিনী শুরু করেছে ‘অপারেশন রিটার্নিং হোম’। চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির জানিয়েছেন, সামরিক ও কূটনৈতিক চাপের সম্মিলিত প্রয়াসেই এই জয় সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, এ যুদ্ধ কেবল বন্দিমুক্তির লড়াই নয়, বরং গাজাকে একটি ‘অসামরিক’ ও ‘নিরাপদ’ অঞ্চলে পরিণত করাই এখন লক্ষ্য।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম এই ‘শান্তি চুক্তি’র প্রধান স্থপতি হিসাবে উঠে আসছে। তিনি ঘোষণা করেছেন, গাজা যুদ্ধ শেষ। তাঁর বক্তব্য, ‘এই মুহূর্তটা বিশেষ। সবাই একসঙ্গে উল্লাস করছে— ইহুদি, মুসলমান, আরব— এটা আগে কখনো দেখা যায়নি। এটা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সূচনা।’ সোমবারই তিনি ২ দিনের সফরে ইজরায়েল ও মিশরে আসছেন। মিশরের শারম-এল-শেখ শহরে তিনি একটি বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন, যেখানে ২০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। ওই সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধি হিসাবে থাকবেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিংহ। মূল উদ্দেশ্য, শুধু গাজা যুদ্ধ শেষ করাই নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। ঐতিহাসিক চুক্তির কৃতজ্ঞতায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সম্মান জানাতে চলেছে ইজরায়েল। রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হার্জগ ঘোষণা করেছেন, ট্রাম্পকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা প্রদান করা হবে। রাষ্ট্রপতির দফতরের তরফে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ভূমিকা শুধু এই চুক্তি নয়— ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত, ইজরায়েলের নিরাপত্তা ও বিশ্ব রাজনীতিতে শান্তির বার্তা নিয়ে তাঁর অবদানের কথা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চিরকাল মনে রাখবে। গাজা থেকে ফিরে আসা পণবন্দিরা এখনো তাঁদের অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খোলেননি। তাঁদের কাছে হয়তো আরো অনেক গল্প জমা রয়েছে। কিন্তু আপাতত গোটা ইজরায়েল আর ফিলিস্তিন অপেক্ষা করছে একটি ঘোষণা শোনার জন্য— ‘সবাই দেশে ফিরে এসেছে।’
❤ Support Us








