Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ২৬, ২০২৫

আট বছর আগের একদিন

মিথিলেশ ভট্টাচার্য
আট বছর আগের একদিন

 
শহর শিলচরে আজীবন আমর্ম সংলগ্ন থেকেও যিনি আকাশের বার্তা নিয়ে এসেছেন বারবার এবং জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নিমগ্ন থেকে জলের মতো ঘুরেঘুরে একা কথা বলে গেছেন নিজস্ব অনুভবে
— সেই আশ্চর্য গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য এই দীপাবলীর মধ্যরাতে পাড়ি দিয়েছেন অনন্তে। ১৯৪৬ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ এর ২০ অক্টোবর : এই তাঁর জীবনের কক্ষপথ। ১৯৭৩ সালের ২ জুলাই যখন তারুণ্যের দীপ্তি নিয়ে তপোধীর ভট্টাচার্যের সঙ্গে যুগ্মভাবে শিলচর থেকে ‘শতক্রতু’ সাহিত্যপত্র সম্পাদনা শুরু করলেন, উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা সাহিত্যচর্চায় নতুন দিগন্ত উদ্ভাসিত হলো। এর ছ–বছর আগে, ১৯৬৭ সালে, ‘দৈনিক প্রান্তজ্যোতি’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় মিথিলেশের ‘এখন সাগর’ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই থেকে ছোটগল্পের নিজস্ব ভাষায় জীবনযাপনের তাৎপর্য নিরন্তর খনন করেছেন তিনি। কথার ভেতরের কথা খুঁজেছেন তিনি। ১৯৮৪–এর নভেম্বর অবধি প্রকাশিত হয়েছে ‘শতক্রুতু’। দীর্ঘবিরতির পরে নবপর্যায়ে ‘শতক্রতু’ যখন প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ থেকে, অব্যাহত রয়েছে মিথিলেশ ও তপোধীরের যুগলবন্দি। এছাড়া একক উদ্যমে ‘পরম্পরা’ সম্পাদনা করেছেন মিথিলেশ। আগাগোড়া লেখাজীবন যাপন করা ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহী হননি তিনি। আত্মমগ্ন, প্রচারবিমুখ মানুষটি ক্রমশ হয়ে উঠেছেন ছায়াতরু। দেশভাগ জনিত মহাবিপর্যয়ের রেশ কাটতে না কাটতে বাঙালির ভুবন জুড়ে অবক্ষয়ী আধুনিকতাবাদের বিকার যখন ছড়িয়ে পড়ছিল, আত্মবিনাশক আবর্তগুলো উপেক্ষা করে অবিচল ছিলেন মিথিলেশ। তাঁর ‘কক্ষপথ’ ‘চৈত্রপবনে’ ‘স্বপ্ন পুরাণ’ ‘দেশভাগের গল্প’ ‘প্রান্তজনের কথা’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘পঁচিশটি গল্প’ সংকলনে ছড়িয়ে রয়েছে শিল্পসংবিদের নিদর্শন। মনেপ্রাণে অপ্রাতিষ্ঠানিক এই গল্পকার চিরবিদায়ের অভিব্যক্তিতেও তার অভ্রান্ত প্রমাণ রেখে গেলেন। আত্মজীবনী ‘ভাঙা পথের রাঙা ধুলোয়’-এর বার্তা অনুরণিত হলো তাঁর বিধুর প্রয়াণেও।


দূর সম্পর্কের আত্মীয়, প্রকৃতিপ্রেমিক জটিলেশ্বর দত্তের সমাধি পদদলিত করে, যুবতী মোহিনীর বেড়াজাল ছিন্ন করে, মৃগাঙ্ক ফিরে এল একদা পরিত্যক্ত এই লোকালয়ে। দিনক্ষণ সময়ের নির্ভুল হিসেব– আটবছর। আটবছর আগের একদিন এখানে, তোমাদের কোলাহল মুখর এই জগতে মৃগাঙ্ক নামে কোনও যুবক ছিল, মনে পড়ে ? বিড় বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করে মৃগাঙ্ক।
 
স্বপনই তাকে আবিষ্কার করেছিল দেখামাত্র, বলেছিল, আয় আয়, এতদিন কোথায় ছিলি তুই ? পাখির নীড়ের মতো নিটোল স্বপ্নিল চোখ নয় স্বপনের, ফ্যাকাশে নিষ্প্রভ। তার গোটা অবয়ব জুড়ে ধু-ধু করছিল এক বোবা শূন্যতা। তবু স্বপন তাকে গল্প শোনাতে চেয়েছিল– স্মৃতির গল্প। সে জানে স্বপন কোনোদিন এই গল্পের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে না। সে অস্ফুটে স্বপনের উদ্দেশে বলেছিল, আমি গল্প শুনতে ভয় পাই, আমি ফেড আপ, আমি দমবন্ধ হয়ে মারা যাব। শুধু স্বপনের চোখে মুখে কাতরতা। মৃগাঙ্কর দুখানা হাত জলে-ডোবা মানুষের মতো আঁকড়ে ধরে আর্তনাদ করেছিল, আয়-না আয় এতদিন পরে দেখা, এমন করিস না।
 

দাড়িতে একটু পর পর হাত বোলায় সে। অনাদর কিম্বা অবহেলা কিংবা অভ্যাস। হাঁটতে হাঁটতে কখনো বা শরীর টলে যায়। তবু এই হাঁটাচলায় এক তাজা স্বাদ। কোথায় কার উদ্দেশে এই অবিরাম হাঁটা এখন আর জানতে চায় না মৃগাঙ্ক। একদিন এই প্রশ্ন তার মগজে শিকড় নামিয়েছিল। হোয়াট ইজ দ্য আলটিমেট গোল ? সদুত্তর পায়নি সে

 
তিরিশ বছরের একটানা অভ্যাস বাঁ হাত দিয়ে সূর্য আড়াল করা, তা-ই করল মৃগাঙ্ক। এখন পৌনে চারটে। হেমন্তের এই উজ্জ্বল বিকেল একটু পরই দপ করে নিভে যাবে। তবু পশ্চিমে হেলে-যাওয়া সূর্যের কী প্রবল তেজ। মৃগাঙ্ককে মৃগাঙ্ক বলে কেউ চিনতে পারল না। সকল পথিকই তার চোখে-মুখে, অবয়বে তাকাল ঘোর অপরিচিতের মতো। না চিনুক তাকে, চেনার চেষ্টা না করুক । …দুঃখ নেই, ক্ষতি নেই। এই শহরের পুরোনো ইট কাঠ চুন সুরকি ধুলো বালি ঘাস পাথর গাছপালা অবলা জীব তাকে বিলক্ষণ চিনে নেবে। তুমি মৃগাঙ্ক না, ফিসফিস শব্দে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করবে, তুমি এখানেই ত ছিলে ? তাকে ভুলেছে শুধু অই মানুষগুলো, যারা হেঁটে যাচ্ছে বাড়ি নামক শীতল এক আশ্রয়ের দিকে, স্কুল প্রয়োজনের দিকে, লোভের দিকে। স্বল্পস্থায়ী সুখের দিকে। শুধু অবলা বস্তুগুলোর কাছেই এখন সে পরিচিত। ওরাই টিকটিকির মতো অবিরল শব্দের ঢেউ তুলে যে-কোনো মুহূর্তে বলে দিতে পারে ঠিক ঠিক ঠিক, সত্যি সত্যি সত্যি, তুমি মৃগাঙ্ক তুমি মৃগাঙ্ক তুমি মৃগাঙ্ক…।
 
চোখের দুকোল জুড়ে দগদগে ঘায়ের মতো কালি, জুলফি প্রায় সাদা, মাথায় দীর্ঘ চুলের বোঝা ছন্নছাড়া, দুগালে কাঁচাপাকা দাড়ির স্রোত, মলিন বেশবাস– এই মৃগাঙ্ক। দাড়িতে একটু পর পর হাত বোলায় সে। অনাদর কিম্বা অবহেলা কিংবা অভ্যাস। হাঁটতে হাঁটতে কখনো বা শরীর টলে যায়। তবু এই হাঁটাচলায় কী যেন এক তাজা স্বাদ। কোথায় কার উদ্দেশে এই অবিরাম হাঁটা-চলা এখন আর জানতে চায় না মৃগাঙ্ক। একদিন এই প্রশ্ন তার মগজে শিকড় নামিয়েছিল। হোয়াট ইজ দ্য আলটিমেট গোল ? সদুত্তর পায়নি সে। পায়নি সেই উদাস ছেলেটিও। ছেলেটির চেহারা আলুথালু, চোখের বাদামি মণিতে অস্থির এক জিজ্ঞাসা। প্রশ্নটি দুজনের সামনে তুলে ধরেছিল গগনস্পর্শী নিরেট পাষাণ দেয়াল। দেয়াল জুড়ে দুজনে অনেকদিন মাথা খুঁড়েছে। কিন্তু পায়নি তারা কেউ।
 
তোমরা কেউ জানো না। তোমরা কেউ মৃগাঙ্কর খবর রাখোনি। তোমরা বলো মৃগাঙ্ক এসকেপিস্ট। কেউ বলো ব্যর্থ প্রেমের জ্বালা জুড়োতে সে পালিয়েছিল শহর ছেড়ে। মৃগাঙ্কর ব্যাপারে তোমাদের বিবরণ: একদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আমরা দেখতে পেলাম মৃগাঙ্ক নেই। ঘরে নেই, রাস্তায় নেই, চায়ের স্টলে নেই, খেলার মাঠে নেই, পার্কে নেই, সিনেমায় নেই, অফিসে নেই, বাজারে নেই, কোথাও নেই। আমরা অনেকক্ষণ অনেক বেলা অব্দি মৃগাঙ্কের জন্য অপেক্ষা করলাম কিন্তু সে ফিরল না। আমরা তার ঘরে ঢুকে আঁতিপাতি করে সব কিছু খুঁজলাম, নাহ্ সে নেই। আমরা একখানা চিঠি কিংবা চিরকুট খুঁজলাম, তাও পেলাম না। আমরা অনেক জল্পনা কল্পনা করলাম, কিন্তু সে ফিরল না। জ্বলজ্যান্ত একটা লোক যে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল, আশ্চর্য ! মৃগাঙ্কর কোনো প্রেমিকা ছিল কিনা তার হদিশ করতে গিয়েও আমরা ব্যর্থ হলাম। মৃগাঙ্কর মালিক বলল সে কিছু জানে না। আমরাও মৃগাঙ্কর বিষয়ে কিছু জানতে পারলাম না।
 

দৈত্যটা শুধু মানুষ খায় বাড়ি বসেই কিম্বা লোকলজ্জার ভয়ে কচিকাঁচা বউটাকে কামড়ে খেতে পারছে না। একমুঠো সুন্দরী দলিত মথিত নিষ্পেষিত হয়ে নিথর পড়ে থাকত শয্যায়। দৈত্যের প্রবল হটোপুটির শব্দে কতরাতে ঘুম ভেঙে গেছে মৃগাঙ্কর। প্রবল আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় জেগে থেকেছে সে অন্ধকার বিছানায়

 
তোমরা কেউ জানো না। রাতের বিশাল নক্ষত্র খচিত আকাশই মৃগাঙ্ককে একদিন ঘর-ছাড়া করল। রাতের উপুড়-করা কৃষ্ণনীল আকাশে এত এত রুপালি তারা, ঠা ঠা করে হাসত মৃগাঙ্কর দিকে তাকিয়ে, বলত, মৃগাঙ্ক ডিফিট উইল বি ইয়োরস। মৃগাঙ্ক ভয় পেত। শির শির করে কেঁপে উঠত তার শরীর। ভয় পেয়ে সে কখনো হাতে ধরা বাঘের কপিশ চোখের মতো জ্বলন্ত টর্চ চালিয়ে দিত আকাশে। ঠিক যেভাবে আঁধার ঘরে আলো ফেলে ফেলে নিজের ভয় ভাঙানোর চেষ্টা করত সে। কিন্তু ভয় যেত না। দ্বিগুণিত চাপে তাকে আক্রমণ করত মহাশূন্যের বিচ্ছুরিত অলৌকিক আলো। এত সব তোমরা কেউ জানো না।

 
দু•ই

 
অনেক পরাজয় আছে মৃগাঙ্কর। বুকের ভিতর কখনো কির কির করে ওঠে সেইসব পরাজয়। যদিও মৃগাঙ্কর মনে হয় এইসব কি সত্যিকার পরাজয়। সে সঠিক বুঝতে পারে না। সেই লোকটাকে মনে পড়ে। দৈত্যের মতো বিশাল একটা লোক। সেই একমুঠো সুন্দরী যুবতী বউকেও মনে পড়ে। দৈত্যের ধর্মসাক্ষী করে বিয়ে করা বউ। রাঙা টুকটুকে একমুঠো সুন্দরী যুবতী। এত নরম এত সুন্দর বউকে দৈত্য অনায়াসে লাথি মারত। অহরহ ঠ্যাঙাত। লঘু দোষে বউকে গুরুদণ্ড দিত। আর যখন কামতাড়িত দৈত্য মদমত্ত পশুর মতো বউকে আক্রমণ করত, উফ্ এমন নিষ্পেষণ কখনো চোখে দেখেনি মৃগাঙ্ক। তখনকার চেহারা দেখলে মনে হত দৈত্যটা শুধু মানুষ খায় বাড়ি বসেই কিম্বা লোকলজ্জার ভয়ে কচিকাঁচা বউটাকে কামড়ে খেতে পারছে না। একমুঠো সুন্দরী দলিত মথিত নিষ্পেষিত হয়ে নিথর পড়ে থাকত শয্যায়। দৈত্যের প্রবল হটোপুটির শব্দে কতরাতে ঘুম ভেঙে গেছে মৃগাঙ্কর। প্রবল আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় জেগে থেকেছে সে অন্ধকার বিছানায়। পরদিন ভোরে, দৈত্যের নিঃসাড় ঘুমের সুযোগে, একা জানালায় রাঙা বউয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে মৃগাঙ্কর, দুচার মিনিট চোখাচোখিতে হয়েছে নিম্নরূপ নিঃশব্দ বাক্যালাপ:

 
মৃগাঙ্ক:  তুমি প্রতিবাদ করতে পারো না ?
যুবতী বউ: কিসের ?
মৃগাঙ্ক: অত্যাচারের।
যুবতী বউ: মেরে ফেলবে তাহলে।
মৃগাঙ্ক: তুমি ব্যথা পাও না, দুঃখ হয় না, মরে যেতে ইচ্ছা করে না ?
যুবতী বউ: পাই, ইচ্ছে করে।
মৃগাঙ্ক: তাহলে ?
যুবতী বউ: কী ?
মৃগাঙ্ক: তুমি প্রতিবাদ করো।
যুবতী বউ: তুমি আমাকে নিয়ে পালাবে ?
মৃগাঙ্ক: কোথায় ?
যুবতী বউ: তোমার যেখানে ইচ্ছে, যেদিকে দুচোখ যায়।
মৃগাঙ্ক: ‘…।’
যুবতী বউ: তোমার মতো সুন্দর উদার পুরুষকে নিয়ে নতুন করে ঘর বাঁধব আমি !
মৃগাঙ্ক: ‘…।’

 
এই নিভল হেমন্তবেলার আলো। সৌদামিনীকে মনে পড়ে। সৌদামিনী কেমন আছো ? চরাচর জুড়ে আবছা অন্ধকার। কুয়াশা। কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া জিরাফের মতো গলা বাড়িয়েছে আকাশে। সৌদামিনীকে মনে পড়ে যায়। সৌদামিনী অসাধারণ মেয়ে না। অতি সাধারণ মেয়ে। তার রূপ নেই। তবু সে রূপসী। স্তনে পাছায় সমৃদ্ধ সৌদামিনী রূপসী। আর তাতেই অনেক পুরুষ, ক্ষণিকের জন্যে মৃগাঙ্কও, মাছির মতো আটকে গেছিল। সৌদামিনী মৃগাঙ্ককে সরাসরি বলেছিল, বলতে পেরেছিল, আমি তোমার ছেঁড়া ন্যাকড়া হয়ে থাকতে চাই না, আমি চাই সংসার, চাই স্বীকৃতি ! মৃগাঙ্ক উত্তর দিতে পারেনি। চুপি চুপি সরে পড়েছিল। সৌদামিনীর কি সংসার হয়েছে, পেয়েছে স্বীকৃতি ? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মৃগাঙ্কের জন্য এক অসহ্য জ্বালা, জয় কিম্বা পরাজয়।
 
এখনো, দীর্ঘ আটবছর পরও, মৃগাঙ্কর সব কিছু মনে পড়ে। সব কথা, হাসি গান কান্না ব্যর্থতা যৌন লিন্সার হতাশা গ্লানি জ্বালা, সব কিছু মনে পড়ে। মনে আছে। তোমাদের মনে নেই। তোমাদের মনে পড়ে না। তোমরা বেভুল। পায়ে পায়ে তোমাদের বিভ্রম। শুধু মৃগাঙ্কর শক্তি ছিল না মহাশূন্যের বিচ্ছুরিত আলোকে স্নান করে দেবার, নিষ্প্রভ করে দেবার।

 
তি•ন

 
আকাশের পশ্চিম কোনে দিনেদিনে নীল চাদরে ঢাকা চাঁদখানা পাংশুল মুখ বাড়িয়েছে পৃথিবীর দিকে। আভাহীন সেই মুখমণ্ডলে রাগবিরাগের চিহ্নমাত্র নেই। শুধু নাড়ীর তীব্র বন্ধন ছিন্ন করার ক্ষমতা নেই বলেই পৃথিবীর আকাশে চাঁদ চাঁদ হয়ে উঠে আসে। মৃগাঙ্ক নাড়ীর বন্ধন অস্বীকার করতে চেয়েছিল। চলে গিয়েছিল প্রকৃতিপ্রেমিক জটিলেশ্বরের আশ্রয়ে। জটিলেশ্বর তাকে বলেছিল, বুঝলে মৃগাঙ্ক অই যে সজলঘন প্রকৃতি, তার মধ্যে লীন হবার ধ্যান করো, দেখবে চিত্তে কোনো অসুখ নেই। আর জটিলেশ্বর নিজে লীন হতে গিয়ে ধরা পড়েছিল এক তন্বী যুবতীর অমোঘ বন্ধনে।
 

চিঠিটা সঙ্গে ঘুরছে মৃগাঙ্কর। শূন্য ঝোলার শরীরে অন্ধকারে মুখ রেখে পড়ে আছে চিঠিটা। হয়তো মৃগাঙ্কর ব্যর্থতার কথা অহরহ ঝোলাকে শোনাচ্ছে ওই ভয়ঙ্কর চিঠি।

 
মৃগাঙ্কর সঙ্গে ঘোরে একখানা অতি পুরাতন চিঠি। তীব্র রোষে জ্বলে উঠেও চিঠিখানা কুটি কুটি করে ছিঁড়তে পারেনি মৃগাঙ্ক, কিম্বা পারেনি জ্বালিয়ে দিতে। ধূসর বিবর্ণ চিঠিখানা অনেকদিন ধরেই তার সঙ্গে ঘুরছে। মৃগাঙ্কের অনেক সময় ভ্রম হয়, মনে পড়ে চিঠিখানা যেন বা জন্মের আগে থেকেই তার সঙ্গে আছে। কখনো তার সামনে এগিয়ে যাচ্ছে আবার কখনো বা ইচ্ছে করেই তার আড়াল হয়ে যাচ্ছে। চিঠিখানাকে সে কিছুই করতে পারে না। তার উপর দুরন্ত এক প্রভাব বিস্তার করেছে চিঠিখানা।

 
” মৃগাঙ্ক আমি চাহিয়াছিলাম তুমি দশজনের একজন হও। মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াও। বংশের মুখ উজ্জ্বল করো। তোমার ওপর আমার অনেক আশা, অনেক ভরসা। কিন্তু তুমি একি সর্বনাশ করিয়াছ। মূর্খের মতো নিজের জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলিতে গেলে কেন ? আমার কোনো আশাই পুরণ হইল না।”

 
চিঠিখানা কুটিকুটি করে ছিঁড়তে গিয়ে কিম্বা দাউ দাউ আগুনে আহুতি দিতে গিয়ে বুকের ভিতর যেন তীর এক কাঁটা বিঁধে যায়। একজন ব্যর্থ, পরাস্ত মানুষের নিষ্প্রভ চেহারা, স্নান চোখমুখ স্মৃতিপথে থেকে থেকে ভেসে ওঠে। মানুষটা একদা মৃগাঙ্ককে জন্ম দিয়েছিল। ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক ডেকে এনেছিল পৃথিবীতে। নিজের জীবনের সকল ব্যর্থতা ঢাকতে চেয়েছিল মৃগাঙ্ককে সামনে খাড়া করে, উন্নত মৃগাঙ্কর আড়ালে দাঁড়িয়ে।
 
উফ্ মৃগাঙ্ক, তুমি কোনো কিছুই হতে পারলে না।
 
সেই ব্যর্থ মানুষের উদ্দেশে মৃগাঙ্ক অস্ফুটে বিড় বিড় করে তুমি কেন বারবার তবু স্বপ্ন দেখো, রক্তঝরা হৃদয় নিয়ে কল্পনার নিঃসঙ্গ প্রভাতে একা জেগে রও। আমি স্বপ্ন দেখতে চাইনি কোনোদিন। তবু তুমি আমার রক্তে নিপুন হাতে স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছিলে। উফ্ অমোঘ স্বপ্নের চাকা।
 
চিঠিটা সঙ্গে ঘুরছে মৃগাঙ্কর। শূন্য ঝোলার শরীরে অন্ধকারে মুখ রেখে পড়ে আছে চিঠিটা। হয়তো মৃগাঙ্কর ব্যর্থতার কথা অহরহ ঝোলাকে শোনাচ্ছে ওই ভয়ঙ্কর চিঠি।
 
নির্জন নদীপারে অস্পষ্ট কুয়াশায় চারজন লোক এসে দাঁড়ায়। ওকজনের হাতে ধরা ধোঁয়াটে লণ্ঠন। তাদের কাঁধে অনেক দূর থেকে বাহিত হয়ে এসেছে একটি শব। শবদেহকে কাঁধ থেকে নামিয়ে নদীপারে রাখে তারা। এরপর নীরবে চিতা সাজায়। অদূরে দাঁড়িয়ে মৃগাঙ্ক অপলক চোখে দেখে যার চিতা সাজানো। একসময় দুজন লোক শবদেহের আচ্ছাদন খুলে ধরে। মৃগাঙ্ক চমকে ওঠে ঘোর বিস্ময়ে। কী দেখল সে। এ যে তারই মৃতদেহ। আকাশের দিকে মুখ করে টান টান হয়ে নিথর শুয়ে আছে সে। চোখের কোনায় টলমল করছে দুফোঁটা বড়ো বড়ো অশ্রুবিন্দু। এই ছবি সে ছেলেবেলা থেকেই ঘুরে ঘুরে দেখে আসছে। চিতায় শায়িত তার শবদেহ। একজন অস্পষ্ট চেহারার লোক মৃতদেহ প্রদক্ষিণ শেষ করে তার মুখে আগুন দিচ্ছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে তার দেহ। আগুনের তাণ্ডবে দূর অনেকদূর হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী মানুষ গাছপালা…।
 
মৃগাঙ্ক চুপি চুপি এসে চিতায় শায়িত মৃতদেহের কাছে দাঁড়ায়। আকাশের দিকে মুখ রেখে টান টান শুয়ে আছে মৃতদেহ। চোখের কোনায় টলমল করছে অশ্রুবিন্দু। মৃগাঙ্ক হাত বাড়ায়, কেঁপে যায় তার হাত, সে অস্ফুটে বিড় বিড় করে দুঃখ নেই। তোকে আরেকটা জন্ম দেব।
 
স্বপ্নহীন স্মৃতিহীন এক নিটোল জীবন। দুঃখ নেই মৃগাঙ্ক।
 

♦–♦♦–♦♦–♦♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!