Advertisement
  • ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
  • এপ্রিল ২৬, ২০২৬

স্থানিক সময়সঙ্কটের অনিবার্য দলিল

বহমান স্রোতের মতোই এখানে এসে মিশেছে শহর ও জঙ্গল, মার্ক্স ও বনবিবি, বিপ্লব ও লোককথা, কামনা ও ক্ষুধা, ঈশ্বর ও মানুষের জটিল নিঃসঙ্গতা। এ মোহনাতেই তো জন্ম হয় ‘পাখি’দের

অমিত সরকার
স্থানিক সময়সঙ্কটের অনিবার্য দলিল

চিত্রকর্ম : সোমনাথ হোড়

কোনো সার্থক সাহিত্যকে সাধারণত আমরা সমসাময়িকতার ভাষাদলিল হিসেবে চিহ্নিত করতেই অভ্যস্ত।  তার সঙ্গে অনিবার্যভাবেই জড়িয়ে থাকে পাঠক হিসেবে আমাদের অন্তর্লীন বয়স্ক অভিজ্ঞতা। অবশ্য সেক্ষেত্রে পাঠকের নিজস্ব দীক্ষা ও ঋক অনুযায়ী কিছু কূটাভাস মেঘাচ্ছন্ন থেকে গেলেঅবচেতনে ভেসে আসতেই পারে একের পর এক অমূলতরু দৃশ্যকল্প যেগুলো হয়তো রচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়। চেতনার মধ্যে ধ্বনিত হতে পারে অপরিচিত অতিচেতনার কন্ঠস্বর। কিন্তু যিনি অনায়াসে একটি সাহিত্যকর্ম পড়ছেনতাঁর চেতন অংশে সেগুলিকে একটা গ্রন্থিতে আবিষ্কার বা প্রতিস্থাপন করাই পাঠক হিসেবে তাঁর পঠনশৈলীর নিজস্বতা। অবশ্যই তখন লেখক অনুপস্থিত। তাই কোনো বইবিশেষত আখ্যাননির্ভর গদ্য পড়তে গেলে বিনির্মাণের জানলাগুলো সম্পূর্ণ খোলা রেখে এগুনোই লেখক ও পাঠকউভয়ের পক্ষেই বাঞ্ছনীয়। এই কথাগুলি আমার মনে এলো শাশ্বত বোসের পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে’ গল্পগ্রন্থটি পড়তে পড়তে।

লেখার ডিসকোর্স বেশ খানিকটা অন্যরকম। সময় সারণীতে দাঁড়িয়ে এটিকে শুধুমাত্র গল্পগ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। এতে আখ্যান বা ন্যারেটিভের ওপরে মেঘের মতো ছেয়ে আছে লেখকের ভিন্ন ভিন্ন স্তরীয় বা লেয়ারড সাব-অল্টার্ন যাপনের অভিজ্ঞতা। যার সঙ্গে আমার অন্তত সরাসরি কোনও অভিজ্ঞতা-যোগ নেই বা কখনো ছিলো না। অন্যভাবে দেখলেএটি কোনো একটি একক ঘরানার বই নয়বরং এটি চিহ্নিত করছে প্রান্তিক জীবনের ঘটনাপরিসর বা ভাষ্যকেযেখানে ন্যারেটিভকবিতাস্মৃতি ও সমাজদর্শন মিলেমিশে নির্মাণ করেছে বহুস্বরীয় আখ্যান। বইটির নামের মধ্যেই যে রূপকধর্মী ইশারা অর্থাৎ মোহনা’, নিশ্চিতভাবেই তা কেবল নদী ও সমুদ্রের ভৌগোলিক মিলনবিন্দু নয়বরং জীবনের বহু বিপরীত প্রবাহের সংঘাত ও সহাবস্থানের প্রতীক। বহমান স্রোতের মতোই এখানে এসে মিশেছে শহর ও জঙ্গলমার্ক্স ও বনবিবিবিপ্লব ও লোককথাকামনা ও ক্ষুধাঈশ্বর ও মানুষের জটিল নিঃসঙ্গতা। এ মোহনাতেই তো জন্ম হয় পাখিদের— শাশ্বতের লেখায় যারা স্বাধীনতারপ্রশ্নেরপ্রতিবাদেরকখনো বা নিঃশব্দ বিলুপ্তির প্রতীক।  


পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে’ আরামদায়ক পাঠ নয়। শহুরে নাগরিককে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় সে। আমাদের শহরআমাদের রাজনীতিআমাদের সভ্যতা ঠিক কাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে ? প্রশ্ন জাগে। বুকের ভেতরের নিশ্চিন্ততার সমাজরাজনীতি আর নিজের অবস্থানের ওপর সুপ্ত ডিটোনেটরের বোতামটি নিজেই টিপে দেওয়া


শাশ্বতর লেখার প্রধান শক্তি তাঁর ভাষা। যে ভাষা শহুরে শিক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তিপ্রবণ এলিট পাঠকের সঙ্গে মূলনিবাসী জীবনেরতাঁদের লোকবিশ্বাসধর্মীয় আচার ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অনন্যগভীর সংলাপ তৈরি করেছে। সে সংলাপ বিশ্বাসযোগ্য এবং অবশ্যই পরিসর নির্ভর। এবং শাশ্বতর লেখার প্রধান দুর্বলতাও তাঁর ভাষা। যে ভাষা গদ্যের মরুভূমিকে সহজেই কবিতার বৃষ্টিতে সিঞ্চিত করে, ভাবনায় লজিকাল ক্র্যাক তৈরি করেসে ভাষায় সার্থক আর নিরপেক্ষ রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নির্মাণ সম্ভব নয়। একজন আধুনিকমনস্ক পাঠক হিসেবে আমি গভীর বিশ্বাস করিযে গদ্যে বা ন্যারেটিভে কোনো না কোনো ভাবে রাজনৈতিক অ্যাসিমিলেশন  নেইসে রচনার পক্ষে সার্থক হওয়া খুব শক্ত। যাই হোককিছু কিছু সিদ্ধান্তের ভার সচেতন ভাবেই কালের ওপরে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।    

লেখকের বাক্যগঠনের সিনট্যাক্স অনেক সময় দীর্ঘস্তরীয় ও প্রলম্বিতকিন্তু সেটিকে কেবল তাঁর আলংকারিক দূর্বলতা বলতে আমার দ্বিধা হয়। বরং আমার মনে হয়েছেএই দীর্ঘসূত্রিতা লেখকের সচেতন ভাবনা থেকে নির্মিততাঁর অভিপ্রেত দর্শনেরই অংশ। পাঠককে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দেবেন নাবরং অনুরোধ করবেন ভাবনার অশরীরী চার্বাকে হাঁটতেমৃত্যুর আগেওএমনকি মৃত্যুর পরেও। তাই তাঁর আখ্যানবাক্যেরাও হাঁটেচলেথামেআবার ঘুরে দাঁড়ায়— ঠিক প্রান্তিক মানুষের জীবনের মতো। ফলেএকথা নিশ্চিত এই দীর্ঘসূত্রিতা লেখকের আলস্যনির্মিত নয়, এটি তাঁর শিল্পবোধের সচেতন স্টাইলাইজেশন। 


হিমজ্যোৎস্নায় বনবিবি’ বা নষ্টভূমি  ও ঈশ্বরী বনজ্যোৎস্না’-য় লোকবিশ্বাস ও বাস্তবতার সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। দেবী এখানে ধর্মীয় চিহ্ন ননবরং সচেতন জীবনে টিকে থাকার প্রতীক । হয়ে ওঠেন প্রান্তিকতার আশ্রয়ভরসাআর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।


কাহিনীতে বারবার ফিরে আসে প্রান্তিক মানুষ মূলনিবাসী নারীশ্রমজীবী পুরুষশহরের অনুচ্চারিত নিঃসঙ্গতারাজনৈতিক হিংসাধর্ম ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। আসে জামবনির মাওবাদ থেকে সুন্দরবনের খাল-বিল সমৃদ্ধ সমুদ্র উপকূলের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট। বিপুল ও জটিল পরিসরগুলিতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে কোথাও আমার রোমান্টিক অথবা ভয়ারিস্টিক লাগেনিআবার নিষ্ঠুর বাস্তবতা বর্ণনায় কোথাও সংবেদনশীলতাও হারাননি গল্পকার। প্রেমশরীরখিদেযৌনতা, হিংস্রতাসবই এসেছে নির্মোহ অথচ গভীর সহানুভূতির বাতাস নিয়ে।  

বইয়ের প্রথম গল্প বিপ্লব একটি পাখির নাম। গল্পে বিপ্লব কোনো রোমান্টিক স্লোগান নয়, স্মৃতি,  ক্ষুধা ও শ্রেণীচেতনার সহবাসে গড়ে ওঠা এক বিষণ্ণ উপলব্ধি। অ্যাবস্ট্রাক্ট অথচ মানবিক স্বপ্ন। এখানে বিপ্লব দুহাতে ছিঁড়তে চায় বৈদিক জ্যোৎস্নার শূন্যতাকে, আবার পাখিজন্মে সেই মলত্যাগ করে যায় শহুরে আলোর ওপরে— এই দ্বৈততা বা ডুয়ালিটিই লেখকের সাহসচেতনা ও মননের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রকল্পনা। একইভাবে হিমজ্যোৎস্নায় বনবিবি’ বা নষ্টভূমি  ও ঈশ্বরী বনজ্যোৎস্না’-য় লোকবিশ্বাস ও বাস্তবতার সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। দেবী এখানে ধর্মীয় চিহ্ন ননবরং সচেতন জীবনে টিকে থাকার প্রতীক হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন প্রান্তিকতার আশ্রয়ভরসাআর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। চিরাচরিত ক্ষমতার হাতিয়ার থেকে ধর্ম রূপান্তরিত হয় ভয় আর বিশ্বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের একান্ত প্রার্থনায়।  

একথা স্বীকার করতেই হবে, আখ্যানের রুক্ষ জমিনে শাশ্বতের গদ্যভাষা প্রায়ই কবিতার সীমান্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে। অতিক্রম করেছে কাঁটাতার। কখনো তা পাঠকপ্রিয় হয়েছেআবার কখনো মনে হয়েছে অপ্রয়োজনীয় লিরিক্যাল। তবে আকাঁড়া’ প্রকৃতির পরিসরেবিশেষ করে জঙ্গলরাতচাঁদআগুননদী— এ ধরণের অনুষঙ্গে তাঁর ভাষা মুখরতার পরিবর্তে তৈরি করেছে গভীর নৈঃশব্দ্য। যে নৈঃশব্দ্যের ভেতরে কান পাতলে মরমি পাঠক অবশ্যই শুনতে পাবেন প্রান্তিক মানুষের আত্মজৈবনিক উচ্চারণযা মূলধারার ইতিহাসে সাধারণত অনুপস্থিত।  

পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে’ আরামদায়ক পাঠ নয়। শহুরে নাগরিককে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় সে। আমাদের শহরআমাদের রাজনীতিআমাদের সভ্যতা ঠিক কাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে ? প্রশ্ন জাগে। বুকের ভেতরের নিশ্চিন্ততার সমাজরাজনীতি আর নিজের অবস্থানের ওপর সুপ্ত ডিটোনেটরের বোতামটি নিজেই টিপে দেওয়া। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এমন গুরুত্বপূর্ণ উচ্চারণ সচারচর দেখা মেলে না। শাশ্বতর গল্পভূবনে প্রান্তিকতা নিঃশব্দ নয়, উলঙ্গ দিগন্তের সামনে সভ্যতার দিকবদলের অনিবার্য হাওয়ামোরগ। একজন কবি এখনো যে ভাষা খুঁজে পেতে পারেন, পাঠককে সরাসরি দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন বিনোদনের বদলে নিজস্ব বিবেকের মুখোমুখি।

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

 

 

 

 

 

 

পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে
শাশ্বত বোস অনিমিখ প্রকাশন, ৪০০ টাকা


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!