Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • মে ১৯, ২০২৬

১৯ এর ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতিতে কলকাতায় স্মরণসভা ও নাট্যোৎসব

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
১৯ এর ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতিতে কলকাতায় স্মরণসভা ও নাট্যোৎসব

১৯ মে। আপামর বাঙালি স্মৃতিতে উচ্চারণ আর নৈঃশব্দ্যের জড়িয়ে থাকার দিন। রক্তমাখা বর্ণমালার ইতিহাসে বর্তমানকে জাগ্রত করবার দিন। বরাক উপত্যকার দদ্ধ-তপ্ত বাতাস, অলিখিত সীমানা ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ে প্রান্ত-প্রান্তরে। ভাষা-আন্দোলনের রক্তাক্ত আখর জানান দেয় বাঙালি সত্তার বহুমাত্রিক উচ্চারণ। কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিসরে ১৯ মে-র অনুরণন বাজছে। রবীন্দ্রসদন চত্বর থেকে তপন থিয়েটার— শহরের নানা প্রান্তে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, ভাষা, স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নকে সামনে রেখে আয়োজিত হচ্ছে একাধিক অনুষ্ঠান।

১৯৬১ সালের সেই দিনে শিলচর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষাকে সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনরত নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলি চালায় তৎকালীন অসম প্রশাসন। নিহত হন এগারো জন ভাষাসংগ্রামী। পরবর্তী সময়ে প্রবল আন্দোলনের মুখে বরাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয় অসম সরকার। স্বাধীনোত্তর ভারতের ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই বরাক আন্দোলন। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর ভারতের ভাষা-আগ্রাসনের সামনে দাঁড়িয়ে  তরুণ প্রজন্মের একাংশ বরাকের ভাষা আন্দোলনকে ‘ভাষার অধিকারের লড়াই’ হিসেবেই দেখছেন। স্মৃতিকে সামনে রেখে, নিরন্তর লড়াইয়ে সামিল হয়ে কলকাতায় আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার। বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন,  কলকাতা অধ্যায়ের উদ্যোগে মঙ্গলবার, বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদ সভাঘর (এগারো নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে) এফ.ডি ব্লক সল্টলেকে বিকেল সাড়ে ৫ টায় শব্দমুখর  এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শিরোনামেই স্পষ্ট আবেগ— ‘শোনো তাকে এই একাদশ শহিদরা ভাই’। আয়োজকদের বক্তব্য, ভাষার অধিকারের লড়াই কেবল ইতিহাস নয়, বর্তমান সময়েও তা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রাসঙ্গিক। সে কারণেই স্মরণসভার সঙ্গে সঙ্গে থাকছে কবিতা, গল্পপাঠ, সংগীত এবং প্রজন্মান্তরের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন কবি কাজলকান্তি গুহ, প্রাবন্ধিক সৌমিত্র লাহিড়ী, প্রকাশক ও সম্পাদক দেবব্রত কুণ্ডু, লেখক-গায়ক রঞ্জিত বিশ্বাস, কবি তীর্থঙ্কর দাশ-সহ একাধিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব অংশ নেবেন। তালিকায় রয়েছেন উদয়ন ভট্টাচার্য, রথীন কর, মনোতোষ চক্রবর্তী, খগেশ্বর দাস, সিদ্ধার্থ সেন, সুপ্রসন্ন রঞ্জন সাহা, দেবাশিস চন্দ, নীলিমা গঙ্গোপাধ্যায়, শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি শঙ্কর সাহা, গৌরহরিতম সেন, তপনের দাস, শমিলা ভট্টাচার্য, অলক বীরা, কল্পলোকী চক্রবর্তী, পুষ্প অধিকারী, অনন্যা হেমব্রম, মৌমিতা পাল, শুভদীপ সেনশর্মা, মানসী নন্দী, পৌলমী কর এবং সুজাতা চৌধুরী।

অন্যদিকে, তপন থিয়েটারে শুরু হয়েছে ‘বরাক বাংলা নাট্য উৎসব’। ১৮ থেকে ২০ মে পর্যন্ত ৩ দিনের এই উৎসব ঘিরে নাট্যপ্রেমীদের মধ্যে উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। একই সঙ্গে কলকাতার তপন থিয়েটারে শুরু হয়েছে তিন দিনের ‘বরাক বাংলা নাট্য উৎসব’। বাংলা ভাষা ও নাট্যচর্চার সম্পর্ককে নতুন করে ভাবার জায়গা হিসেবেই এই উৎসবকে দেখছেন নাট্যকর্মীদের একাংশ। উৎসবের প্রথম দিনেই ‘ভাষার অধিকার: অধিকারের ভাষা’ ঘিরে হয়েছে আলোচনা সভা। বক্তা বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব তীর্থঙ্কর চন্দ। নাট্যকার ও নির্দেশক ড. গৌরব দাসের সঞ্চালনায় এই আলোচনায় উঠে এসেছে ভাষা, রাষ্ট্র এবং সাংস্কৃতিক নাগরিকত্বের সম্পর্ক। আয়োজকদের দাবি, ভাষার প্রশ্ন আসলে মানুষের অধিকারের, অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন, সে প্রেক্ষিতেই এই আলোচনা যেমন প্রাসঙ্গিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দিনের সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হয়েছে রেষ থিয়েটার, পুরুলিয়ার প্রযোজনা ‘ত্রিকাল পাষা’। নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় ইন্দ্রনীল দে।

দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ভাষা শহিদ দিবসের সন্ধ্যায় আজকের প্রযোজনা থিয়েটার, শিলচরের নিবেদন ‘নৌকাডুবি’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই নাটকের চিত্রনাট্য রূপ দিয়েছেন শুভঙ্কর মৌর্য। নাট্যরূপ বিপ্লব দাসের, নির্দেশনায় সায়ন বিশ্বাস। আর শেষ দিন, অর্থাৎ ২০ মে ‘অনীক’-এর প্রযোজনার ‘আগুন জুড়ে ভোর’— নাটক ও নির্দেশনায় ড. গৌরব দাস। কলকাতার নাট্য ও সংস্কৃতি মহলের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শহরে নানা নাট্যোৎসব ও ভাষাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচি বেড়েছে। জাতীয় নাট্য বিদ্যালয়ের ‘ভারত রঙ্গ মহোৎসব’ থেকে শুরু করে রাজ্যের জাতীয় নাট্যোৎসব— বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক মঞ্চচর্চার প্রবণতা স্পষ্ট। নাট্য-আয়োজকদের বক্তব্য, বাংলা ভাষার ইতিহাসকে কেবল ২১ ফেব্রুয়ারি বা ঢাকার ভাষা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরাক উপত্যকার ১৯ মে-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ আন্দোলন দেখিয়েছিল, স্বাধীন দেশেও ভাষার অধিকারের জন্য মানুষকে রক্ত দিতে হতে পারে। মহানগরের সমাকালিন পরিসরে এই মুহূর্তে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসই ফিরে আসছে কবিতার পঙ্‌ক্তিতে, নাটকের সংলাপে, গানের সুরে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!