- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- মার্চ ৩১, ২০২৬
‘মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কার’-সম্মানিত তরুণ কবি অবিন রায়চৌধুরী
বসন্তের মৃদু হাওয়ায়, স্মৃতি-সত্তাকে আঁকড়ে ধরে বিষাদ আর আনন্দের পরত মেখে কবিতার সুরে ভেসে উঠল নন্দন চত্বর। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অবনীন্দ্র সভাগৃহে আয়োজিত হলো কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত-র জন্মদিন উপলক্ষে এক স্মরণানুষ্ঠান ও পুরস্কার প্রদান পর্ব। ‘ভাষানগর’ পত্রিকার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন শহরের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, কবি, আবৃত্তিকার ও সংস্কৃতিজগতের বহু পরিচিত মুখ। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন কবি ভাস্কর লেট ও অনুক্তা ঘোষাল, দের সাবলীল উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে বেঁধে রাখে এক সুশৃঙ্খল ছন্দে।
অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ‘মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কার’। সম্মানিত হলেন তরুণ কবি অবিন রায়চৌধুরী, তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘বিবর্ণ সাইকেল’–এর জন্য। পুরস্কার তুলে দেন কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এবং কবি সুবোধ সরকার। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বক্তারা মল্লিকা সেনগুপ্তর কবিতার রাজনৈতিক উচ্চারণ, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর লেখার অনমনীয় স্বরকে স্মরণ করেন।
মরমি কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন শিল্পী অদিতি গুপ্ত। এরপর একে একে মঞ্চে ওঠেন আবৃত্তিকাররা—ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমিত্র মিত্র, প্রগতি ঠাকুর, সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়—যাঁদের কণ্ঠে ফিরে আসে মল্লিকার কবিতার প্রতিবাদী ভাষা ও অন্তর্লীন আবেগ। সন্ধ্যার দ্বিতীয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয় একটি আলোচনা চক্র—‘মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী হবে?’। আলোচনায় অংশ নেন সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপান্বিতা সরকার, শুচিস্মিতা দাস এবং কবি মৌমিতা। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে মল্লিকার কবিতার নারীবাদী অবস্থান, সমকালীন রাজনীতি ও নারী-অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিকতা।
মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কবি শিবাশিস মুখোপাধ্যায়–সহ আরও বহু বিশিষ্ট সাহিত্যিক। কবিতা পাঠ করেন সৈয়দ হাসমত জালাল, যশোধরা রায়চৌধুরী, বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, হিন্দোল ভট্টাচার্য, অরিত্র সান্যাল, অভিমন্যু মাহাতো, বিভাস রায়চৌধুরী, শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়, বিকাশ দাস, অর্পিতা কুন্ডু, ঈশিতা ভাদুড়ী, ধীমান ব্রহ্মচারী এবং দিব্যেন্দু ঘোষ প্রমুখ। পাশাপাশি ‘শ্রবণার কবিতার বাড়ি’ এবং কলকাতার ‘যিশু ও সাম্য’-র দল সমবেত আবৃত্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। অবনীন্দ্র সভাগৃহে উপচে পড়ে ভিড়। নবীন কবি থেকে প্রবীণ সাহিত্যপ্রেমী, সবাই ফিরে প্রবল আকাঙ্ক্ষায় ফিরে পেতে চাইছিলেন মল্লিকার কণ্ঠস্বর। সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে অনুষ্ঠানের নানা মুহূর্ত, কেউ ভাগ করে নেন পুরস্কার গ্রহণের ছবি, কেউ বা আবৃত্তির অংশ।
আশির দশকের বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র, দৃপ্ত ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। যাঁকে এড়িয়ে সমকালীন কবিতার মানচিত্র আঁকা প্রায় অসম্ভব। তাঁর লেখালিখির মর্মে সুস্পষ্ট প্রতিবাদী চেতনা, নারীর আত্মপরিচয়, ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ এবং সমাজ-রাজনীতির অন্তর্লীন বৈষম্য একসূত্রে গাঁথা। মল্লিকা সেনগুপ্ত-র সাহিত্যজীবন শুরু ‘চল্লিশ চাঁদের আয়ু’ কাব্যগ্রন্থ দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ‘ছেলেকে হিস্ট্রি পড়াতে গিয়ে’, ‘ও জানেমন, জীবনানন্দ বনলতা সেন লিখছি’, ‘কথা মানবী’, ‘আমি সিন্ধুর মেয়ে’, ‘অর্ধেক পৃথিবী’, —সহ একাধিক কাব্যগ্রন্থে তিনি নারী-অভিজ্ঞতা, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত সত্তাকে মিলিয়ে নির্মাণ করেছেন এক অনন্য ভাষা।
পুরাণ ও ইতিহাসকে তিনি ভেঙে দেখেছেন নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে; সীতার, দ্রৌপদীর, কিংবা অচেনা অসংখ্য নারীর অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় ফিরে এসেছে স্পষ্ট লিঙ্গসমতা, মানবিক ন্যায় এবং প্রান্তিক কণ্ঠের স্বীকৃতির দাবি নিয়ে। তাঁর প্রবন্ধ ও গদ্যরচনাতেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সমাজ-রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ, যেখানে লিঙ্গবৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে তিনি নির্ভয়ে প্রশ্ন তোলেন। অধ্যাপিকা হিসেবে যুক্তিবাদী মনন এবং নাগরিক সচেতনতা তাঁর লেখায় রূপ নিয়েছে এক সংহত আদর্শবোধে, যার কেন্দ্রে রয়েছে সমতা ও মানবিক ন্যায়ের দাবি। আবার একই সঙ্গে সম্ভাবনারও এক উজ্জ্বল রেখাচিত্র। ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপিকা হিসেবে তাঁর যুক্তিবোধ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ রূপ নিয়েছিল তীক্ষ্ণ সমাজসচেতন ভাষ্যে। ২০১১ সালে অকালপ্রয়াত হন মল্লিকা, তবুও তাঁর লেখনি যে আজও সমান প্রাসঙ্গিক তারই ঝলক এদিন মর্মে মর্মে অনুভব করলেন অগুনতি মুগ্ধ শ্রোতা।
❤ Support Us








