- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- মার্চ ২৮, ২০২৬
কলকাতায় গল্পবিশ্বের আসর, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ছোটগল্প সম্মানে সমকালীন গল্পকারদের স্বীকৃতি
বাংলা ছোটোগল্পের নতুন সুর ও বহুমাত্রিকতার সন্ধানে আবারও একত্রিত হতে চলেছেন সাহিত্যকর্মীরা। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত বিশেষ কিছু গল্পকে আলোর মধ্যিখানে রেখে, শহরের সাংস্কৃতিক পরিসরে বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে আগামী ৪ এপ্রিল, শনিবার বিকেল ৫ টায় রোটারি সদন-এ আয়োজিত হচ্ছে ‘গল্পবিশ্ব’-এর উদ্যোগে ‘শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ছোটোগল্প সম্মান ২০২৫’ অনুষ্ঠান।
মূল আয়োজক সংস্থা ‘অ্যান্টোনিম কাউন্সিল অফ গ্লোবাল আর্টস অ্যান্ড লিটারেচার’ (এসিজিএএল)। বাংলা গল্পচর্চাকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এ প্রয়াস। বছর জুড়ে গল্পপাঠ, অনুবাদ ও সমকালীন ছোটোগল্পের প্রবণতা নিয়ে কাজ করে চলেছে তাঁদের শাখামঞ্চ ‘গল্পবিশ্ব’। সে ধারাবাহিক প্রয়াসেরই এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব সমকালীন গল্পকারদের স্বীকৃতি। এবছর, পুরস্কারের দাবীদার মোট ১১ গল্পকার। তালিকায় রয়েছেন এণাক্ষী রায় (ভগীরথপুরের চাঁদ), কাকলি দেবনাথ (সুধাকরের চাওয়া পাওয়া), পার্থজিৎ চন্দ (বাসা), বেবী সাউ (রাধা), মেকাইল রহমান (বলদ), মেঘমালা দে মহন্ত (এখানে হলুদ পাতা ঘুমাবে এখন), শতদল মিত্র (টগরবালার মাটিবাসনা), শমীক ঘোষ (সিঁড়ি), শুভ মৈত্র (বৃষ্টিমাসের মেয়ে), সৌমেন বসু (গোল) এবং সৌরভ হোসেন (বনজুঁই)। উল্লেখ্য, মেকাইল রহমান ও সৌরভ হোসেনের গল্পদুটি প্রকাশিত হয়েছিল আরম্ভ উৎসব-১৪৩২ সংখ্যায়।
২৫ মার্চ ছিল কথাসাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিন। তাঁর স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই আয়োজনের মূল পর্ব। আয়োজকদের বক্তব্য, ‘শুধু স্মরণ নয়, তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে সংযুক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য।’ অনুষ্ঠানের শুরুতেই থাকছে কিংবদন্তী সাহিত্যিকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও সংগীত পরিবেশন। স্বাগত ভাষণ দেবেন এসিজিএএল-এর ডিরেক্টর বিশ্বদীপ চক্রবর্তী। এরপর প্রকাশিত হবে ‘Years’ Best 2025’—এ বছরের নির্বাচিত গল্পগুলির ইংরেজি অনুবাদ সংকলন। অভিজিৎ সেনের ‘Whispering Waves’, পৃথা ব্যানার্জীর ‘Babulal Pakhi and the Tales of Our Times’ এবং শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কেন্দ্রিক বই ‘The Secret Life of Amal Gupta’–র মতো উল্লেখযোগ্য রচনা। সভামুখ্যর ভাষণ দেবেন সাহিত্যিক তপন বন্দোপাধ্যায়।
আয়োজকদের মতে, সমকালীন বাংলা ছোটোগল্পের বহুমাত্রিকতা এই নির্বাচনে স্পষ্ট। গ্রামীণ বাস্তবতা থেকে নাগরিক সংকট, ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব থেকে সামাজিক টানাপোড়েন—বিভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে এই গল্পগুলিতে। বিশেষভাবে আলোচিত মেকাইল রহমানের ‘বলদ’ এবং সৌরভ হোসেনের ‘বনজুঁই’ গল্পে উঠে এসেছে প্রান্তিক জীবনের গভীর সংকট ও মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিক। একদিকে শ্রম ও দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা, অন্যদিকে প্রেম ও পারস্পরিক নির্ভরতার মানবিক বয়ান—এই দ্বৈত সুরই সমকালীন ছোটোগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উঠে আসছে।
মেকাইল রহমানের ‘বলদ’ গল্পটি গ্রামীণ কৃষিজীবনের এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মোঙলা ও তার পরিবার— যারা দারিদ্র্য, ঋণ ও সামাজিক শোষণের চক্রে আটকে পড়ে ধীরে ধীরে মানবিক সত্তা হারাতে বসেছে। বলদের অভাবে নিজের মেয়েকে জোয়ালে জুড়ে চাষ করানোর দৃশ্য শুধু একটি পারিবারিক বিপর্যয় নয়, বরং কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষের শরীরকে শ্রমের যন্ত্রে পরিণত হওয়ার এক গভীর প্রতীক। গল্পের শেষের উপলব্ধি, মানুষ আর বলদের মধ্যে ফারাক তো কিছু নেই। সমকালীন গ্রামীণ অর্থনীতির সংকটকে তীব্রভাবে সামনে আনেন গল্পকার।
অন্যদিকে, “বনজুঁই” গল্পে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে উঠে এসেছে প্রান্তিক মানুষের প্রেম ও সহাবস্থানের কাহিনি। এখানে মদিনা ও খুদু— দুই শারীরিকভাবে অসম্পূর্ণ মানুষ একত্রে গড়ে তোলে এক পরিপূর্ণ সম্পর্কের জগৎ। একজন অন্ধ, অন্যজন পঙ্গু; কিন্তু পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্য দিয়েই তারা বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায়। বনজুঁই ফুল এ গল্পে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, যার গন্ধের মাধ্যমে অনুভূতি, স্মৃতি ও ভালোবাসা নতুন করে সংজ্ঞায়িত হয়। কঠোর সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও এই প্রেম এক নীরব প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে থাকবে গল্পপাঠ, আলোচনা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন। সব মিলিয়ে, স্মৃতি, সম্মান ও সাহিত্যচর্চার মেলবন্ধনে ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় রোটারি সদন-এর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তৈরি হতে চলেছে নিবিড় সাহিত্যচর্চার আবহ।
❤ Support Us








