- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ১, ২০২৬
জুলাই থেকে পশ্চিমবঙ্গে ফের স্মার্ট মিটার বসানোর ঘোষণা কেন্দ্রের । বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির আশঙ্কায় উদ্বেগ গ্রাহকদের
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই ফের স্মার্ট মিটার বসানোর উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কয়েক মাস আগেই লোকসভায় কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী মনোহর লাল খট্টর জানিয়েছিলেন, স্মার্ট মিটার বসানো বাধ্যতামূলক নয়। কাউকে জোর করে এই ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করা হবে না। কিন্তু সম্প্রতি কলকাতা সফরে এসে, সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে তিনি ঘোষণা করেছেন আগামী জুলাই মাস থেকেই রাজ্যে বৃহৎ পরিসরে স্মার্ট মিটার স্থাপনের কাজ শুরু হবে। ধাপে ধাপে রাজ্যের প্রায় ২ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহককে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ঘোষণার পরেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে কেন্দ্রের অবস্থান। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সংগঠনগুলি অভিযোগ তুলেছে, এক দিকে বাধ্যতামূলক নয় বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে রাজ্যজুড়ে স্মার্ট মিটার প্রকল্প চালুর ঘোষণা করা হচ্ছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে বলেই মনে করছে তারা। শনিবার কলকাতায় বিদ্যুৎ ও নগরোন্নয়ন সংক্রান্ত এক পর্যালোচনা বৈঠকে যোগ দেন মনোহর লাল খট্টর। বৈঠক শেষে তিনি জানান, প্রথম পর্যায়ে সরকারি দফতর, সরকারি আবাসন, টেলিকম টাওয়ার এবং বৃহৎ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে স্মার্ট মিটার বসানো হবে। পরবর্তী ধাপে সাধারণ গৃহস্থ গ্রাহকদের কাছেও এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২ কোটি স্মার্ট মিটার বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, প্রতিটি স্মার্ট মিটারের জন্য ৯০০ টাকা করে ভর্তুকি দেবে কেন্দ্র। তবে মিটার স্থাপনের খরচের একটি অংশ গ্রাহকদের বহন করতে হতে পারে। সরকারি সূত্রের দাবি, মাসে আনুমানিক ১০০ টাকা করে সেই খরচ মেটানো যাবে। এখানেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। অল বেঙ্গল ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন (অ্যাবেকা)-র সাধারণ সম্পাদক সুব্রত বিশ্বাস প্রশ্ন তুলেছেন, ‘লোকসভায় বলা হয়েছিল স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক নয়। তা হলে এখন কেন নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে এ প্রকল্প চালুর কথা বলা হচ্ছে? রাজ্যের নতুন সরকার এখনো সম্পূর্ণ ভাবে প্রশাসনিক কাজ শুরু করার আগেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এসে এমন ঘোষণা করে গেলেন কেন?’ অ্যাবেকার দাবি, স্মার্ট মিটার প্রকল্পের সঙ্গে বিদ্যুতের মাশুল বৃদ্ধির পরিকল্পনাও যুক্ত রয়েছে। মনোহর লাল খট্টর নিজেই জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে ‘সংস্কার’ এবং সংশোধিত মাশুল কাঠামো তৈরির কাজ চলছে। গ্রাহক সংগঠনগুলির আশঙ্কা, এর ফলে আগামী দিনে বিদ্যুতের বিল আরও বাড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী দু-মাসের মধ্যে বিদ্যুতের একটি সংশোধিত মাশুল কাঠামো বা ট্যারিফ প্ল্যান তৈরি হবে। তাঁর বক্তব্য, গত ৩১ মার্চের মধ্যে রাজ্যের বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছে নতুন মাশুল পরিকল্পনা জমা দেওয়ার কথা ছিল। তা হয়নি। এখন আগামী এক মাসের মধ্যে সে পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে। তার পর আরও এক মাসের মধ্যে নতুন মাশুল কার্যকর হতে পারে। ফলে জুলাইয়ের শেষ নাগাদ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সামনে নতুন আর্থিক বোঝা আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিতর্কের আর এক কেন্দ্রবিন্দু ‘প্রিপেড’ ব্যবস্থা। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, স্মার্ট মিটারের ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা প্রিপেড অথবা পোস্টপেড— দু-টি বিকল্পের মধ্যে যে কোনো একটি বেছে নিতে পারবেন। কিন্তু আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত প্রিপেড ব্যবস্থাকেই কার্যত প্রধান ব্যবস্থা হিসেবে চালু করার চেষ্টা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের মতো আগাম টাকা ভরে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে বাধ্য হলে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে।
স্মার্ট মিটার নিয়ে রাজ্যে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। গত বছর হুগলি, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা-সহ একাধিক জেলায় পরীক্ষামূলক ভাবে স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছিল। তার পরেই বহু গ্রাহক অভিযোগ করেন, তাঁদের বিদ্যুতের বিল অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গিয়েছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভও শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে রাজ্য বিদ্যুৎ দফতর গৃহস্থ বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বিদ্যুৎ দফতরের কর্তাদের বক্তব্য, অধিকাংশ অভিযোগেরই বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তাঁদের দাবি, স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে রিয়্যাল-টাইমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। মিটার রিডিং নিতে কর্মীদের বাড়ি বাড়ি যেতে হয় না। ফলে বিল তৈরির ক্ষেত্রে মানবিক ভুলের সম্ভাবনাও কমে। বিদ্যুৎ চুরি, বকেয়া আদায় এবং বিতরণজনিত ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি কার্যকর বলে দাবি সরকারের।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুৎ পরিবহণ ও বণ্টনজনিত ক্ষতির হার প্রায় ১২ শতাংশ। সে ক্ষতি কমানো এবং বকেয়া আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করতেই স্মার্ট মিটার প্রকল্পে জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সূত্রে আরও দাবি, ভর্তুকি ও বকেয়া বাবদ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা দ্রুত উদ্ধার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ দিকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে তরজা শুরু হয়েছে। বিজেপি নির্বাচনের আগে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিরোধীদের প্রশ্ন, ওই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ঘোষণা না থাকলেও স্মার্ট মিটার ও সম্ভাব্য মাশুল সংশোধনের মতো পদক্ষেপ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কেন? সব মিলিয়ে, প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ না কি গ্রাহকদের উপর নতুন আর্থিক চাপ— স্মার্ট মিটার নিয়ে সেই পুরনো বিতর্কই আবার সামনে চলে এসেছে। জুলাই মাসে প্রকল্পের কাজ বাস্তবে শুরু হলে এবং নতুন মাশুল কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত এলে বিতর্ক যে আরও তীব্র হবে, তা এখন থেকেই স্পষ্ট।
❤ Support Us









