- দে । শ
- জুলাই ১৮, ২০২৬
উচ্চশিক্ষায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ চায় মোদি সরকার ! রিপোর্টে উদ্বেগ সংসদীয় কমিটির। ‘ভিবিএসএ বিল’ ঘিরে নয়া বিতর্ক
দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় স্বাধীনতার পর সম্ভবত সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চলেছে কেন্দ্র সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন (এআইসিটিই) এবং ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন (এনসিটিই)-র মতো দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে বিলুপ্ত করে একটি একক সর্বভারতীয় নিয়ন্ত্রক কমিশন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান (ভিবিএসএ) বিল, ২০২৫’-এ।
কেন্দ্রের যুক্তি, এ পদক্ষেপ উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের জটিলতা কমাবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে দ্রুত করবে এবং ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি–২০২০’-র লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। কিন্তু বিলটি নিয়ে সংসদীয় যৌথ কমিটির (জেপিসি) খসড়া রিপোর্ট সামনে আসতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, কেন্দ্রের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ কম নয়। বরং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, রাজ্যগুলির ভূমিকা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বায়ত্তশাসন সংকুচিত হওয়ার প্রশ্নে একাধিক সতর্কবার্তা দিয়েছে কমিটি।
বর্ষাকালীন অধিবেশনেই বিলটি পাশ করানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে কেন্দ্র। তার আগেই ‘জেপিসি’র খসড়া রিপোর্টে উঠে এসেছে একাধিক সংশোধনের সুপারিশ। বিশেষ করে সে সব ধারাকে ঘিরেই আপত্তি জানানো হয়েছে, যেগুলি লাগু হলে, কেন্দ্রকে নীতিগত মতবিরোধ উপেক্ষা করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উপর সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ দেবে। বর্তমানে দেশের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে ইউজিসি, অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন (এআইসিটিই) এবং ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন (এনসিটিই)। ভিবিএসএ বিলে তিন সংস্থাকে একীভূত করে একটি সর্বভারতীয় কমিশন ও তার অধীনে তিনটি পৃথক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, এতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সহজ ও সমন্বিত হবে। কিন্তু ‘জেপিসি’র আশঙ্কা, সমস্ত ক্ষমতা একটি মাত্র সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত হলে, তা ভবিষ্যতে আমলাতান্ত্রিক কিংবা মতাদর্শগত আধিপত্যের পথ খুলে দিতে পারে।
খসড়া রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে গেলে বর্তমানে ইউজিসি কাঠামোর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির যে স্বায়ত্তশাসন রয়েছে, তা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’ তবে, সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে বিলের ‘ধারা ৪৭’ ঘিরে। প্রস্তাবিত এ ধারায় রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কমিশন বা তার অধীনস্থ কাউন্সিলগুলিকে ‘সুপারসিড’ বা কার্যত ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা পাবে। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই বিধানকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ‘গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে চিহ্নিত করেছেন। সংসদীয় কমিটির মতে, এমন ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সংজ্ঞা ও কঠোর শর্ত থাকা জরুরি। কমিটি সুপারিশ করেছে, ‘দায়িত্ব পালনে অক্ষম’ বা ‘ক্রমাগত গাফিলতি’— এ ধরনের শব্দবন্ধের নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য ব্যাখ্যা আইনের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হোক। পাশাপাশি স্পষ্ট করে জানানো হোক, শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই এ ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে, সেটিও সীমিত সময়ের জন্য। সংসদীয় কমিটির মতে, কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সরাসরি ভেঙে দেওয়ার আগে অন্য সব বিকল্প ব্যবস্থা প্রয়োগ করা আবশ্যক। অর্থাৎ এটিকে হতে হবে ‘শেষ অস্ত্র’, প্রথম পদক্ষেপ নয়।
বিতর্কের আরও একটি বড়ো দিক ‘ধারা ৪৫’। প্রস্তাবিত এ ধারায় কেন্দ্রকে নীতিগত বিষয়ে কমিশনকে বাধ্যতামূলক নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ‘জেপিসি’ বলেছে, ক্ষমতার প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা থাকা প্রয়োজন। কেন্দ্র যাতে সীমাহীনভাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট ধারার ভাষা আরও সীমিত করার পরামর্শও দিয়েছে কমিটি। রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ‘জেপিসি’ সুপারিশ করেছে, কমিশনের অধীন তিনটি কাউন্সিলের প্রত্যেকটিতে রাজ্য সরকারের মনোনীত সদস্যের সংখ্যা বাড়িয়ে তিন জন করা হোক। কমিটির মতে, উচ্চশিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে রাজ্যগুলির বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
এনডিএ-র অন্যতম শরিক টিডিপি-শাসিত অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার বিলের একাধিক ধারা নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। তাদের প্রধান উদ্বেগ ছিল রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়া। সে আপত্তির প্রেক্ষিতেই শিক্ষা মন্ত্রক কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনে সম্মত হয়েছে। বিশেষ করে ‘ধারা ১১(৪)’ নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের আপত্তি ছিল তীব্র। ওই ধারায় প্রস্তাব করা হয়েছিল, ‘রেগুলেটরি কাউন্সিল’ সরাসরি কোনো কলেজকে ডিগ্রি প্রদানের অনুমতি দিতে পারবে, এমনকি সেটি যদি কোনো রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তও হয়। অন্ধ্র সরকারের দাবি, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সম্মতি বাধ্যতামূলক করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক সংশোধিত প্রস্তাবে জানিয়েছে, যে সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত রাজ্য সরকারের অর্থে পরিচালিত, তাদের ক্ষেত্রে ডিগ্রি প্রদানের অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (এনওসি) নিতে হবে। তবে ‘জেপিসি’ আরও এক ধাপ এগিয়ে সুপারিশ করেছে, শুধু অর্থপুষ্ট প্রতিষ্ঠান নয়, রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত কলেজগুলির ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্তের আগে রাজ্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। মেঘালয়ের এনপিপি নেতৃত্বাধীন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও গ্রহণ করেছে কেন্দ্র। বিলের ‘ধারা ১২’–তে সংশোধন এনে রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী নতুন কলেজ, অফ-ক্যাম্পাস কেন্দ্র বা একাধিক ক্যাম্পাস স্থাপনের স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
কমিটির আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সংবিধানের ক্ষমতার ভারসাম্যকে ঘিরে। বিরোধী সদস্যদের অভিযোগ, বিলের ‘ধারা ৪’–এ ‘নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ গঠনের কথা উল্লেখ করে কেন্দ্র কার্যত সংবিধানের নিয়মের সীমা অতিক্রম করছে। ওই সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী সংসদের ভূমিকা মূলত উচ্চশিক্ষার মান নির্ধারণ ও সমন্বয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ‘জেপিসি’ এ যুক্তিকেই গুরুত্ব দিয়েছে। কমিটি সুপারিশ করেছে, বিলের উদ্দেশ্য নির্ধারণকারী ধারাগুলি থেকে ‘রেগুলেশন’ বা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত উল্লেখ বাদ দেওয়া হোক এবং নতুন কাঠামোর ভূমিকা স্পষ্টভাবে ‘মান সমন্বয় ও মান নির্ধারণ’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হোক। কমিটির সদস্য, কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিংয়ের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা বা বিলুপ্তিকরণের মতো বিষয়গুলি সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যের এখতিয়ারভুক্ত। ফলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অতিরিক্ত বিস্তার ভবিষ্যতে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের কারণ হতে পারে।
এখন নজর ২০ জুলাইয়ের ‘জেপিসি’ বৈঠকের দিকে। সেখানে খসড়া রিপোর্ট চূড়ান্ত হলে কেন্দ্র কতটা সংশোধন মেনে নেয়, তা স্পষ্ট হবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, নতুন শিক্ষা নীতির আলোকে উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে চাইলেও, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই এ বিলের সামনে সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
❤ Support Us








