- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- জুলাই ১৩, ২০২২
কাঞ্জনজঙ্ঘার প্রতিবেশি হোটেলের উন্মুক্ত ছাদে, অভিনব ‘ক্যাফে হাউস’।
ক্যাফে হাউসের উদ্বোধনের মুহূর্ত। ছবিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস আর টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের এমডি সত্যম রায়চৌধুরী, অভিনেতা সাহেব চ্যাটার্জি, মুখ্যসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদি, অনীত থাপা প্রমুখ।
অভিজাত হোটেলের মুক্ত, প্রশস্ত অঙ্গনে মুক্ত কফি হাউসের শুভারম্ভ । বাহ, বঙ্গসংস্কৃতির রূপান্তরিত আড্ডাখানা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনা-প্রসূত, নামাঙ্কিত ‘ক্যাফে হাউস’—এর উদ্বোধন হল মঙ্গলবার। অদ্ভূত রোমান্টিকতাময় আবহে। দার্জিলিংয়ের দ্য রিট্রেট হোটেলে। মঞ্চে তখন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস আর টেকনো ইন্ডিয়ার প্রাণপুরুষ সত্যম রায়চৌধুরী।
কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছানি, রিট্রেট হোটেলের ছাদের ক্যাফে হাউসকে।
তিন মাস আগের কথা, দার্জিলিং সফরে গেছেন মমতা। স্বাভাবিক ব্যস্ততার একরত্তি অবকাশে, রিট্রেট হোটেল ঘুরে ঘুরে দেখছেন। হোটেলের নান্দনিক শোভা, ছাদের ওপর থেকে অদূরে বিমূর্ত ছবির মতো ভেসে ওঠা মহামহিম কাঞ্জনজঙ্ঘার বিস্তীর্ণ আবরণের ভেতরে আর বাইরে পুঞ্জমেঘের সমারোহ দেখে মুগ্ধ রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক । মুহূর্তে জেগে উঠল তাঁর শিল্পসত্ত্বা। কবিতার কিংবা ছবি আঁকার স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণের মতো সত্যম বাবুকে সবার সামনে বললেন, হোটেলের ছাদে মুক্ত কফি হাউস গড়ে তুললে কেমন হয়! একথা শুনেই—মুখ্যমন্ত্রীর হৃদয় ছোঁওয়া পরামর্শে সত্যম উদ্দীপ্ত। কালবিলম্ব না করেই নির্মাণ শুরু । সে নির্মাণের এক স্তর থেকে আরেক স্তরকে ছুঁয়ে থাকল দখিন হাওয়ার স্পর্শ আর বাংলার কফি সংস্কৃতির বিস্তারিত ঐতিহ্য। কোনও কোনও সৃষ্টির ধর্মই এমন, প্রস্তুতির বিরামহীন আবেগ তাকে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’-এর মতো প্রকাণ্ড বেগবান করে তোলে। সত্যম রায়চৌধুরীর যে কোনও স্থাপনায় আমরা সুন্দরের এই গতিমুখ দেখতে খানিকটা অভ্যস্ত । কাজ শুরু হলেই পূর্ণতার দিকে ছুটতে থাকে তাঁর পরিকল্পিত স্বপ্ন। দার্জিলিং ক্যাফে হাউস -এর নির্মাণেও ভাবনার যাদুবাস্তবতা ছুঁয়ে থাকল টেকনো ইন্ডিয়ার প্রধান মুখকে। তাঁর আবেগিক নিষ্ঠা আর যুক্তি প্রবণতাকে ।
কলেজস্ট্রিট কফি হাউস একালে, সেকালে ।
সত্যম বহুমাত্রিকতায় ঋদ্ধ। তাঁর এই অর্জন যেমন জন্মজাত, তেমনি পরিবেশ আর প্রতিবেশের চাহিদাকে ঘিরে, তাঁর অন্যরকম হয়ে -ওঠার কাহিনিও ব্যক্তিপ্রতিভার শৌভিক আহরণের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সত্যমকে নিয়ে, তাঁর অহর্নিশ জাগৃতিকে নিয়ে, তাঁর সংস্কৃতি প্রেমের উচ্চারণকে নিয়ে, আমাদের ভাবতে হবে। ওঁর মতো স্বপ্নচারী, কর্মময় বাঙালি এই মুহূর্তে, নিঃসন্দেহে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তাঁর নির্মাণময় উদ্যমে মুগ্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে একটুকুও বাড়িয়ে বলেননি। ‘সত্যম স্কুল তৈরি করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে, অনেক বই লিখেছে, দৈনিক পত্রিকাও দেখাশোনা করে। দার্জিলিং-এ যে-কফি হাউস তৈরি করল, এটি কলকাতার কফি হাউস আর মান্না দে-কে স্মরণ করিয়ে দেবে। মান্না দের ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’- গানটিকে পর্যটকদের ফিরে পেতে হলে এখানাকার এই
‘ক্যাফে হাউসে’ও এসে বসতে হবে। স্নেবপ্রবণ মমতার মুগ্ধতার উত্তরে, বিনম্র স্বরে সত্যম বললেন, দিদি যখন-যেখানে যা কিছু করেন, সেটা ঐতিহাসিক হয়ে ওঠে। সে বোলপুরের নিকটস্থ বনবীথি আচ্ছাদিত এলাকায়, একজন মহিলা পরিচালিত চায়ের দোকান হোক বা অন্য কোথাও অন্যকিছু—সবখানেই ইতিহাস আর আড্ডার সোনাঝুরি ছুটতে থাকে, উড়তে থাকে। দার্জিলিং-এ মুখ্যমন্ত্রীর তিন মাস আগের সফরের দীপ্ত স্মৃতিমুখ খুলে দিয়ে সত্যম জানালেন —’ক্যাফে হাউস’-এর থিম সংটিও দিদির লেখা, সুর দিয়েছেন সুগায়ক আর মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন ।আহা, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে ।
প্রশ্ন উঠতে পারে, একটি ‘ক্যাফে হাউসের’ আনুষ্ঠানিক উন্মোচন নিয়ে এত কথা বলার কী আছে ? প্রাসঙ্গিক আর যুক্তিযুক্ত কারণেই আমাদের ভাবাবেগের প্রেক্ষিত বলতে হচ্ছে এখানে। বাংলার সব অঙ্গনের সংস্কৃতির সঙ্গে কফি হাউসের সংযোগের বয়স প্রায় ৮০ ছুঁই ছুঁই । বাংলা কবিতার, বাংলা গল্পের বাংলা উপন্যাসের, বঙ্গীয় চলচ্চিত্রের, বহুমুখী সঙ্গীতের, শিক্ষা, রাজনীতি আর ব্যবসার আয়োজনের সঙ্গে কফি-সংস্কৃতির যোগ আজও অবিচ্ছিন্ন। কালের বিয়োগান্তিক স্রোতের টানে শ্যামবাজারের কফি হাউস হারিয়ে গেছে। সেন্ট্রাল অ্যাভনিউ কফি হাউসের সেই ঔজ্জ্বল্য ম্রিয়মান । যাদবপুর কফি হাউসটি টিম টিম করে জ্বলছে। একমাত্র
কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসটি একক শক্তি নিয়ে লড়ছে। তার মৃত্যু অসম্ভব। কেননা প্রজন্ম আর তারুণ্য তাকে টিকিয়ে রাখবে। কফিমুখী, আড্ডামুখী প্রাণচাঞ্চল্য ভাবাবেগ আজ নবায়ন দাবি করছে। চাইছে অঙ্গনের ভিন্নতর বিস্তার আর রূপান্তরিত চেহারা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পীচিত্তের ব্যক্ত অভিপ্রায় আর সত্যমের নির্মাণে দার্জিলিং-এ কফি কেন্দ্রিক অরুণোদয়ে, প্রজন্মের আড্ডাপীঠের নতুন ঠিকানা গড়ে উঠল। ছাদের ওপর তারা কবিতা নিয়ে ভাববে। ছবি নিয়ে স্বপ্ন দেখবে । গুন গুন গুঞ্জরনে সুর বাঁধবে। চলচ্চিত্র নিয়ে তর্ক করবে। হোটেলের ছাদ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে বলবে—সুন্দর এখানে দাঁড়াও এসে, দেখা হোক, কথা হোক আলো অন্ধকারে—চির রোমান্টিক হৃদয়ের এরকম নির্দিষ্ট সাকিন আর কোথায়? বৃহৎ ভারত স্থাপত্য গড়েছে, তাজমহলে দাম্পত্য প্রেমের অনির্বাণ ছবি এঁকে রেখেছে, বহুমুখী স্থাপত্যের রচনায় অবশ্যই মহাভারতের অভিজ্ঞান অনিঃশেষ। কিন্তু বাংলার কফি হাউসের মতো অনুরূপ নির্মাণে, এমন কি অনুকরণেও সে ব্যর্থ। কলকাতা ছাড়া উপমহাদেশের আর কোন শহরে প্যারি, কায়রো বা ইস্তাম্বুলের মতো ক্যাফের আড্ডার তুফানে জেগে ওঠে বিরোচিত উচ্ছ্বাস আর সদর্থক বিদ্রোহ—যা ছড়িয়ে থাকে কবিতায়। গানে। চিত্রশিল্পে। সঙ্গীতে। গঠনমূলক রাজনীতিতে। কলকাতার কফিখানার ঐতিহ্য এবার প্রবেশ করল প্রিয় পাহাড়ে, স্মৃতির শহরে। হোটেলের ছাদে।
এই প্রবেশ প্রত্যাশিত, এই প্রবেশ স্পর্ধিত মুক্ত চিন্তার বর্ধিত উত্তরণের প্রাসঙ্গিক আর অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ। কফি হাউসের আড্ডা আর সংস্কৃতির স্মরণ-উন্মুখ চেতনাকে জাগিয়ে দিয়েছিলেন মহান কণ্ঠশিল্পী মান্না দে। তাঁর গান শুনে শেখ হাসিনার মুগ্ধতা আর স্মৃতিময়তা এতটাই ঝলসে ওঠে যে, ১৯৯৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, কলকাতা সফরে এসে বলেছিলেন, কফি হাউস দেখতে যাব। কীসের টানে এ আগ্রহ? অবশ্যই কফি সংস্কৃতি আর নাগরিক বঙ্গ সংস্কৃতির যৌথ প্রয়াস নাড়া দিয়েছিল বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। এরকম যৌথতা আর সমগোত্রীয়তা এবার অনুভব করবে শৈল শহর দার্জিলিং । বহুত্ববাদী বাংলার বহুত্বে ভরা সংস্কৃতির অন্যরকম উষ্ণতাও ছুঁয়ে থাকবে পাহাড়ি শহরের স্থায়ী বাসিন্দা আর পর্যটকদের । অভিজাত হোটেলের উন্মুক্ত ছাদে কলকাতা কফি হাউসের নবীনতম সংস্করণের এই উন্মোচন, আশা করি, খণ্ডিত চিন্তাকে দূরে পাঠিয়ে বৃহতের মুক্ত চিন্তায় নতুন প্রাণ সঞ্চারিত করবে । সে সঞ্চারে উদ্বুদ্ধবোধ করবে পাহাড়ের সংস্কৃতি চিন্তার মুক্তক ছন্দ । এ আরেক বড়ো প্রাপ্তির উদ্বোধন।
❤ Support Us











