- খাস-কলম
- মে ২০, ২০২২
সাংবাদিকতার মহাকবির প্রস্থান
দেশ ও মানুষের বেদিমূলে যে মহাকাব্যিক সাংবাদিকতা গাফ্ফার চৌধুরী করে গেছেন—এর প্রতিদান সেই দিনই দেওয়া হব—যেদিন বাংলাদেশ পুরোপুরি একটি আধুনিক দেশ হিসেবে মাথা তুলবে ।
গাফ্ফার ভাইকে নব্বইয়ের দশকে একদিন ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকার অফিসে জিজ্ঞাসা করি, গাফ্ফার ভাই আপনি এত সরাসরি কীভাবে লেখেন? আমরা তো লিখতে গেলে অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে লিখি। ভয় পাই নানান কিছুর। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, এটা আমার মানিক ভাইয়ের (ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া) শিক্ষা। তিনি সব সময়ই বলতেন, গাফ্ফার সাংবাদিকতায় ভয় পাবে না। আর কোনো কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে লিখবে না। মানুষ সোজাসুজি সব কথা শুনতে চায়।
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া চলে গিয়েছিলেন এই ভূখণ্ডের এক দুর্দিনে। ’৬৯ সালে। তখন দেশ পাকিস্তানি সামরিক থাবার নিচে। আর আজ তার প্রকৃত উত্তরসূরি, বাংলা সাংবাদিকতার জগতে যাঁকে মহাকবি বলা যায় সেই গাফ্ফার চৌধুরী যখন চলে গেলেন, তখন তাঁর মতে এই সময়টাও দুর্দিন। মারা যাওয়ার মাত্র এক দিন আগেই বাংলাদেশ সময় দুটোর দিকে আমাকে ফোন করেন। যদিও হাসপাতাল থেকে ফোন, তার পরেও তাঁর গলাটা ভালো শুনে মনটা ভালো লাগে। নিজে থেকেই বলি, গাফ্ফার ভাই আপনার গলা শুনে মনে হচ্ছে, আপনার শরীর অনেক ভালো। বললেন, ডাক্তাররাও হয়তো আমাকে খুব শিগ্গিরই বাড়ি যেতে দেবেন। তারপর নিজের কথা বাদ দিয়ে যথারীতি চলে যান দেশের কথায়। দেশের নানান অবস্হা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চান। একপর্যায়ে বলেন, দেশে ধর্মান্ধতা যেভাবে বাড়ছে তাতে দেশের বড় দুর্দিন দেখেই চলে যেতে হবে। সত্যি যে আধুনিক বাংলাদেশ গাফ্ফার ভাইয়েরা চেয়েছিলেন, সে বাংলাদেশ এখন অনেক দূরে সরে গেছে । তাই বলা যেতে পারে একই রকম দুর্দিন না হলেও মানিক মিয়ার মতোই, সমাজের এক বড় দুর্দিনে চলে গেলেন গাফ্ফার চৌধুরী।
গাফফার চৌধুরী -ফাইল ছবি
মারা যাওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে তিনি ইত্তেফাক ও সমকালে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কয়েকটি লেখা লেখেন। লেখাগুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল পঁচাত্তরের পরে যখন ক্যাপ্টেন সাত্তার ভাই বা অন্য কারো মাধ্যমে গাজী শাহাবুদ্দিন ভাই দুই এক কপি করে ‘বাংলার ডাক’ আনাতেন আর সেখানে বঙ্গবন্ধুর কথা গাফ্ফার ভাই যে সাহস নিয়ে লিখতেন, যে মনের বিশ্বাস থেকে লিখতেন, তেমনি মনের বিশ্বাস থেকেই তিনি এই ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লিখছেন।
গাফ্ফার ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় এরশাদ পতনের পরে তিনি ঢাকায় এলে। তার সেই স্নেহ থেকে কখনো বঞ্চিত হইনি । আর কেন যেন তিনি, আমার দেওয়া তথ্যে বিশ্বাস করতেন। যে কারণে তিনি কোনো কিছু জানতে চাইলে, কনফার্ম না হয়ে কিছুই বলতাম না।
২০০১-এর পরে বাংলাদেশের ওপর একটা দুঃসময় আসে। সে সময়ে ফোনে কথা বলাও অনেক রিস্কি ছিল। তার পরেও ঝুঁকি নিয়ে অনেক কথা বলেছি গাফ্ফার ভাইকে। যদি কোনো দিন বলতে যেতাম, গাফ্ফার ভাই, তথ্য সম্পর্কে আমি কনফার্ম—তবুও আপনি যাচাই করে নেবেন। তিনি হেসে উত্তর দিতেন যে, আমার তথ্যতে তাঁর আস্হা আছে।
গাফ্ফার চৌধুরী এরশাদ পতনের পরে ঢাকায় এসে তাঁর স্ত্রীর ছোট বোনের বাড়িতে ওঠেন। বাড়িটি ছিল হাটখোলা রোডে। তখন প্রায় প্রতিদিনই গাজী শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের গাড়ি নিয়ে গাফ্ফার ভাইকে আনতে যেতাম। এই যাওয়ার পেছনে সব থেকে বড় কারণ ছিল, গাফ্ফার চৌধুরী ঐ বার মূলত যে কারণে ঢাকা এসেছিলেন, সেটা তিনি পেয়েছেন কি না তা জানতে।
আসলে গাফ্ফার চৌধুরী লন্ডনে চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে বঙ্গবন্ধুর জীবনী লিখছিলেন। লন্ডনে যাওয়ার আগে কয়েকটি ট্রাংকে সেই পাণ্ডুলিপিগুলো ভরে তিনি তাঁর স্ত্রীর ছোট বোনের বাসায় রেখে যান। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরে তাঁরা ভয়ে সেগুলো নানান জায়গায় রাখেন। গাফ্ফার ভাই এসেছিলেন ঐগুলো উদ্ধার করতে। যেদিন তিনি গাড়িতে উঠেই বললেন, গাজী সাহেব, (গাজী শাহাবুদ্দিন, সচিত্র সন্ধানী সম্পাদক) স্বদেশ, আমি আমার সব ট্রাংক পেয়ে গেছি। সেই আলো-আঁধারিতেও যেন গাড়ির ভেতর গাফ্ফার চৌধুরীর মুখটি চিকচিক করছিল—যা এখনো আমার চোখে ভাসে। আসলে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর অন্যরকম একটা ভালোবাসা ছিল; যা ঠিক আমাদের মতো লেখকের কলমে প্রকাশ করা যায় না।
তাঁর ছোট মেয়েটি গত মাসে ক্যানসারে মারা যাওয়ার পরে তিনি খুবই নিঃসঙ্গ বোধ করতেন। একদিন ফোনে বললেন, স্বদেশ পারলে প্রতিদিনই একটু ফোন কোরো। বড় একা লাগে। প্রতিদিন না হলেও এক-দুই দিন পরপরই ফোন করতাম। তিনি বারবারই একই দুঃখ করতেন। বলতেন, স্বদেশ আমি জীবনে কারো কোনো ক্ষতি করিনি। কেন এরকম কষ্ট পেলাম? প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিল না।
কারণ, গাফ্ফার চৌধুরী তো আর শুধু একজন সাংবাদিক নন, গাফ্ফার চৌধুরী কবি, গাফ্ফার চৌধুরী গল্পকার, গীতিকার, ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক। আসলে তিনি যে লন্ডনে বাস করে গেছেন সেখানে যদি তিনি জন্মাতেন—তার যা কলমের ক্ষমতা ছিল তাতে তিনি সাংবাদিকতা করে সময় নষ্ট করতেন না। ডিকেন্সদের মতো অমর কথাসাহিত্যিক হতে পারতেন। কিন্তু এমন একটা দেশে জন্মেছিলেন তিনি, যে দেশটিতে প্রতিদিন কোনো না কোনো সমস্যা ঝাঁপিয়ে পড়ে । কখনো ধর্ম ব্যবসায়ীরা সমস্যা সৃষ্টি করে, কখনো রাজনীতিকরা সমস্যার জন্ম দেন, কখনো সামরিক শাসক এসে সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, আমলাদের রক্তচক্ষু এগুলো তো আছেই। প্রতিদিনের এত সব সমস্যার সমাধান ও প্রতিবাদের জন্যই গাফ্ফার চৌধুরী তার মহাকাব্যিক কলম নিয়ে সাংবাদিকতা করে গেছেন। তাই তাঁর অন্য সবকিছু ছাড়িয়ে সাংবাদিক পরিচয়, কলাম লেখক পরিচয়ই বড় হয়েছে। কিন্তু তাঁর ভাষা, তাঁর ভাষার বিন্যাস তাঁর সমসাময়িক সব বড় সাহিত্যিককে হার মানায়। তিনি যখন ছোটগল্প লিখতেন সে সময়ে তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো গল্প লিখতেন কেবল শওকত ওসমান। উপন্যাসও তাই।
শেষ বয়সে যদি তিনি কম কলাম লিখে, উপন্যাস ও আত্মজীবনীতে মন দিতেন তাহলে হয়তো আবু জাফর শামসুদ্দিনের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনার’ থেকেও অনেক বিস্তীর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্যানভাস নিয়ে উপন্যাস লিখে যেতে পারতেন। যা হতে পারত বাংলা সাহিত্যে সেরা সাহিত্য। তেমনি তিনি তাঁর আত্মজীবনী শেষ করে গেলে বাঙালি পেত ইতিহাসের অমূল্য দলিল। অন্তত গত চার দশকের যোগাযোগ থেকে এটুকু বলতে পারি, তিনি এসব করার সময় পাননি। অর্থের চাহিদা থেকে নয়, সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশ ও মানুষকে পরিবর্তন করে, দেশকে স্বাধীনতার মূল চেতনার পথে আনা ও আধুনিক সমাজ গড়ার স্বার্থে।
তাই তাঁর মহাপ্রয়াণ মুহূর্তে বলা যায়, দেশ ও মানুষের বেদিমূলে যে মহাকাব্যিক সাংবাদিকতা গাফ্ফার চৌধুরী করে গেছেন—এর প্রতিদান সেই দিনই দেওয়া হব—যেদিন বাংলাদেশ পুরোপুরি একটি আধুনিক দেশ হিসেবে মাথা তুলবে । যে দেশে কোনোরূপ মধ্যযুগীয় অন্ধকার থাকবে না।
এই লেখা যখন লিখছি, তখনো সিদ্ধান্ত হয়নি, গাফ্ফার চৌধুরীকে কোথায় সমাহিত করা হবে। তবে আমি জানি, বনানী গোরস্হানে তাঁর স্ত্রীর কবরের পাশে তাঁর জন্য একটা কবর কেনা আছে। তাই বিশ্বাস করি, গাফ্ফার চৌধুরীর অত্যন্ত স্নেহের এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাকি কাজটুকু করবেন। এটা কারোরই বলার প্রয়োজন নেই।
সৌজন্য : দৈনিক ইত্তেফাক ।
❤ Support Us









