- বি। দে । শ
- ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬
২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ‘অমর একুশে’ বইমেলা, স্টল ভাড়া মকুবের সিদ্ধান্ত
দীর্ঘ টানাপোড়েন, রমজানের আবহ, প্রকাশকদের আপত্তি, রাজনৈতিক পালাবদলের রেশ— সব জল্পনা আর আলোচনার পর অবশেষে কাটল অনিশ্চয়তার মেঘ। পাঁচ দিন পিছিয়ে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের ‘অমর একুশে বইমেলা। চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। নতুন সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অংশগ্রহণকারী সব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল ভাড়া সম্পূর্ণ মকুব করা হবে। প্রকাশনা জগতে যা নিঃসন্দেহে বিরাট স্বস্তির বার্তা।
বুধবার সন্ধ্যায়, ঢাকার বাংলা একাডেমির শহীদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেই এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। আগে ঘোষণা ছিল, ২০ ফেব্রুয়ারি থেকেই বইমেলা শুরু হবে। কিন্তু পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে প্রকাশকদের একাংশের আপত্তি ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে। তাঁদের বক্তব্য ছিল, রোজার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় অংশগ্রহণ ও বাণিজ্যিক প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হবে। কেউ কেউ ঈদের পর মেলা আয়োজনের দাবি তোলেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটেই সন্ধ্যার বৈঠক ঘিরে ছিল কৌতূহল ও প্রত্যাশা। সভায় সভাপতিত্ব করেন নবনির্বাচিত সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান এবং বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। সদ্য দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রীদেরর এটিই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, ফলে সিদ্ধান্তের দিকে নজর ছিল সবার।
বৈঠকের শুরুতে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম আসন্ন বইমেলা নিয়ে সার্বিক প্রস্তুতির হালনাগাদ বিবরণ তুলে ধরেন। অবকাঠামোগত কাজ, স্টল বিন্যাস, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির প্রাথমিক রূপরেখা; সবই উঠে আসে দীর্ঘ আলোচনায়। এরপর প্রকাশক প্রতিনিধিরা তাঁদের আর্থিক চাপ, সময়সংকট ও সময়কাল ঘিরে বাস্তব সমস্যার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। আলোচনা পর্ব শেষে সংস্কৃতিমন্ত্রী ঘোষণা করেন, এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টলভাড়া পুরোপুরি মকুব করা হবে। একই সঙ্গে জানানো হয়, মেলার সূচনা হবে ২৫ ফেব্রুয়ারি, চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর সভাকক্ষে উপস্থিত অনেকের মুখেই স্বস্তির ছাপ ছিল স্পষ্ট।
সংস্কৃতিমন্ত্রী ঘোষণা করেন, যেসব প্রকাশক এখনও স্টল বরাদ্দ নেননি, তাঁদের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টার মধ্যে আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সেদিনই সন্ধ্যা ৬টায় লটারির মাধ্যমে স্টল বরাদ্দ সম্পন্ন হবে। ফলে প্রস্তুতির জন্য হাতে মিলবে সামান্য হলেও বাড়তি সময়। জানা যাচ্ছে, এ বার স্টল বরাদ্দের তালিকায় রয়েছে ২৯৯টি প্রকাশনীর নাম। এর মধ্যে ১৫০ বেশি সংস্থাই তুলনামূলক অপরিচিত। ৭০টিরও বেশি প্রকাশক গত বছর মেলায় ছিলেন না, কেউ কেউ আবার এই প্রথমবার মেলায় অংশ নিচ্ছেন। বড়ো প্রকাশকদের একাংশের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ঢাকার বইপাড়ায়। এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমি-র বক্তব্য স্পষ্ট, সরকার ও প্রকাশকদের সিদ্ধান্তেই মেলা, একাডেমি কেবল আয়োজক সংস্থা। মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের বলেছেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে বড়ো প্রকাশকেরা এলে মেলার সৌন্দর্য বাড়বে।’
অন্য দিকে, রোজা ও ঈদের বাজারকে সামনে রেখে আর্থিক অনিশ্চয়তার যুক্তি তুলেছে ‘প্রকাশক ঐক্য’ নামে সদ্য গঠিত এক অস্থায়ী সংগঠন। তাদের দাবি, এ সময়ে মেলা হলে বিনিয়োগের অর্থ তোলা কঠিন হবে। ৩২১ জন প্রকাশককে নিয়ে গঠিত এই সংগঠন ঈদের পরে মেলা আয়োজনের আবেদন জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। যদিও আয়োজকরা নিজেদের অবস্থান অনড়। মেলামাঠের প্রস্তুতিও এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান—দুই প্রাঙ্গণ মিলিয়ে স্টল নির্মাণের কাজ প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি এসে কাজের চাপ বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এবারের ঐতিহ্যবাহী মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও বাংলা সাহিত্যের নবীন-প্রবীণ সৃষ্টির সম্মিলনে ‘অমর একুশে বইমেলা’ বাঙালির সংস্কৃতি চেতনা ও আত্মপরিচয়ের সবাক উচ্চারণ। বাংলাদেশে গোটা ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে লেখক-পাঠক-প্রকাশক, সংস্কৃতিপ্রবণ মানুষের মিলনমেলা যেন হয়ে ওঠে ভাবনার উৎসব। নতুন বইয়ের গন্ধে, আলোচনায়, যুক্তি-তক্কে-নির্মাণ-বির্নিমা
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে, ৮০–র দশক থেকে বইমেলা আর কেবল বাংলা একাডেমির সীমানায় আটকে থাকেনি; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তার ছড়িয়েছে। এখন একুশ মানেই, বইমেলা; মাসভর লিটল ম্যাগাজিন চত্বর, কবিতা পাঠ, আলোচনা, স্মারক বক্তৃতা, আর নতুন বইয়ের উন্মোচন। দেশের খ্যাতনামা লেখকদের নতুন গ্রন্থ প্রকাশ, আর তরুণ কবি-গল্পকারদের আত্মপ্রকাশ—সব মিলিয়ে মেলা হয়ে ওঠে সাহিত্য-সম্ভারের অঘোষিত মানদণ্ড। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আল মামুদ, শামসুর রাহমান, হাসান আজিজুল হকের মতো বিশিষ্টজনদের বই প্রকাশকে ঘিরে এক সময় যে বিপুল ভিড় জমত, তা এখনো আলোচনায় ফিরে আসে। সাম্প্রতিক কালে তরুণ লেখকদের বইও প্রথম সপ্তাহেই ‘বেস্টসেলার’ তকমা পায়— সামাজিক মাধ্যমের প্রচারে তার গতি আরও ত্বরান্বিত।
একুশে বইমেলা নিছক বইবাজার নয়; মতপ্রকাশের মুক্ত মঞ্চও। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে লেখক-প্রকাশকদের নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। মতভেদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অঙ্গ, কিন্তু ভয়ের আবহ কখনো কাম্য নয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে বই প্রত্যাহার, লেখক-প্রকাশকের বিরুদ্ধে মামলা, এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৫ সালে ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়–এর ওপর নৃশংস হামলা বইমেলার নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। এরপর নিরাপত্তা বলয় জোরদার হয়, প্রবেশপথে কড়াকড়ি বাড়ে। তা সত্ত্বেও গত বছর একাধিক স্টলে হামলা চলেছে, আক্রান্ত হয়েছেন প্রকাশক থেকে লেখক-কবিরা।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়, এ এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন, যেখানে গঙ্গা–পদ্মার দুই তীরের ভাষা ও সাহিত্য এসে হাত মেলায়। পশ্চিমবঙ্গের লেখক, কবি, শিল্পীদের পদচারণায় বহুবার মুখর হয়েছে মেলার প্রাঙ্গণ; স্মৃতি, আবেগ ও মতভেদের রঙে রঙিন হয়েছে তার ইতিহাস।ঢাকার বইমেলা যখন ধীরে ধীরে বিস্তার পাচ্ছে, তখনই শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশক ও লেখকদের আনাগোনা। কলকাতার বড়ো প্রকাশনা সংস্থা থেকে লিটল ম্যাগাজিন—সবাই চেয়েছে একুশের মাটিতে উপস্থিত থাকতে। বাংলাদেশে পাঠক-আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘ঢাকায় বইমেলায় দাঁড়িয়ে মনে হয় ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে স্পর্শ করছি।’ তাঁর ‘সেই সময়’ বা ‘প্রথম আলো’, আজও দুই বাংলার পাঠকপ্রিয়। একইভাবে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়–এর কিশোর উপন্যাস কিংবা মনস্তাত্ত্বিক কথাসাহিত্য ঢাকার তরুণ পাঠকদের আকর্ষণ করেছে বহুবার। কবি শামসুর রাহমান প্রায়ই বলতেন, বইমেলা হল ‘বাঙালির মননের বারোমাস্যা’— যেখানে কবিতা কেবল বইয়ের পাতায় নয়, উচ্চারণেও বেঁচে থাকে। বইমেলা কেবল লেখক-পাঠকদেরও নয়; শিল্পীরও। প্রচ্ছদশিল্পে দুই বাংলার আদানপ্রদান দীর্ঘদিনের। কাইয়ুম চৌধুরী–র নকশা করা প্রচ্ছদ যেমন বাংলাদেশের বইকে আলাদা স্বাক্ষর দিয়েছে, তেমনই পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী গণেশ পাইন–এর কাজ ঢাকার শিল্পমহলে আলোচিত হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে প্রায়ই দেখা গেছে সীমান্তপারের তরুণ শিল্পীদের যৌথ প্রদর্শনী— পোস্টার, অলংকরণ, গ্রাফিক আর্টে ভাষা আন্দোলনের রূপায়ণ।
এখন দুই বাংলার সাহিত্য প্রেমিদের প্রত্যাশা, সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে নির্ধারিত দিনেই উৎসবের আবহে খুলবে বইমেলার দ্বার, আর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ আবারও ভরে উঠবে পাঠক-লেখক-প্রকাশকদের মিলনমেলায়। তবে শুধু আবেগ নয়, বাস্তব প্রস্তুতিও সমান জরুরি।
নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ, চিকিৎসা পরিকাঠামো, শৌচাগার, প্রবেশ-প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ, সব ক্ষেত্রেই কঠোর নজরদারি চাই। পাশাপাশি স্টল বরাদ্দ, বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক, বই পরিবহনের লজিস্টিক— সব কিছু সময়মতো সম্পন্ন না হলে বিপাকে পড়বেন প্রকাশকেরাই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাগজের দাম ঊর্ধ্বমুখী, মুদ্রণ ব্যয় বেড়েছে, বাজারে মন্দার ছায়া। তবু নির্ধারিত সময়েই মেলা হলে অনেকের মতে, বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
❤ Support Us








