- এই মুহূর্তে দে । শ
- মার্চ ১২, ২০২৬
গ্যাসের অভাবে সংকটে রাজ্যের মিড-ডে মিল ও অঙ্গনওয়ারীর রান্না। কমছে কাঠ-কয়লার জোগান
প্রতীকী চিত্র
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের থাবা বাংলার স্কুল ও অঙ্গনওয়ারীর হেঁশেলে। নদীয়া, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা, হুগলি, বর্ধমান, মেদিনীপুর, কলকাতা থেকে জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, মালদা, মুর্শিদাবাদ আঁচ লেগেছে সর্বত্র। মার্চের শুরু থেকেই রান্নার গ্যাসের সরবরাহ কমতে শুরু করার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছিল। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই মিড ডে মিল, ও শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন কর্তৃপক্ষরা ।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরের কৃষ্ণচন্দ্রপুর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক চন্দন মাইতি জানান, মঙ্গলবার গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাঠের উনুন ব্যবহার করেছেন। ১৫০০ পড়ুয়ার খাবার কাঠের তাপে রান্না করা হয়েছে। তবে কাঠের জোগান পর্যাপ্ত নয়, তাই আগামী দিনগুলো কীভাবে চালানো যাবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নদিয়ার বড়জাগুলি গোপাল অ্যাকাডেমির ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক রাজকুমার হাজরা জানান, ‘আজকের মতো যা রান্না হয়েছে, তাতে সিলিন্ডার শেষ হয়ে গেছে। আগামীকাল কী হবে, আমরা জানি না। মিড ডে মিল তো বন্ধ হতে দিতে পারি না।’ জেলার অনেক স্কুলেই শিক্ষকদের চা-জলখাবারের জন্য রাখা ছোটো সিলিন্ডার দিয়ে অল্প কিছু খাবার দেওয়া হয়েছে। তবে তার পরের দিন কী হবে, তা নিয়ে সংশয় এবং উদ্বেগ চরমে। হুগলির ‘পিএম পোষণ’ প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শিক্ষা দফতরকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, জেলার স্কুলগুলিতে রান্নার গ্যাসের অভাব ইতিমধ্যেই গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করছে। অবিলম্বে হস্তক্ষেপ না হলে পড়ুয়াদের মিড ডে মিলের পরিষেবা ব্যাহত হবে।
একই পরিস্থিতি উত্তরবঙ্গেও। গ্যাস বুকিং না হওয়ায় খড়িবাড়ির হাইস্কুলে মিড-ডে মিল বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা ৩দিন ধরে সিলিন্ডার বুকিং করেও তা না হওয়ায়, চাপ আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ। জানা গিয়েছে, কোনওক্রমে একটি সিলিন্ডার জোগাড় করে চলছে রান্না। খড়িবাড়ি হাইস্কুলে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৬৫০জন শিক্ষার্থী রয়েছে। দৈনিক ৪০০ শিক্ষার্থীদের জন্য মিড ডে মিলের রান্না হয়। কিন্তু তিনদিন ধরে এলপিজি সিলিন্ডার বুকিং করেও পাওয়া যায় নি। গৌরবঙ্গের স্কুলগুলোতেও যুদ্ধের আঁচ, পড়ুয়াদের মধ্যাহ্নভোজনের দিকে নজর দিয়েছে।
কলকাতার স্কুলগুলিতে রান্না হয় না; কমিউনিটি কিচেনে প্রস্তুত করে সরবরাহ করা হয়। রান্নার দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও কোষাধ্যক্ষ ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায় জানান, কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার প্রায় ৭০টি স্কুলের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৪টি সিলিন্ডারের প্রয়োজন। বুধবার হাতে এসেছে মাত্র ২টি সিলিন্ডার। ফলে স্কুলগুলিতে শুধু সেদ্ধ ডিম দেওয়া হয়েছে। শহরতলি ও গ্রামাঞ্চলের বহু স্কুলে ইতিমধ্যেই কাঠ বা কয়লার উনুন ব্যবহার শুরু হয়েছে। হুগলি, বাঁকুড়া, নদীয়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার স্কুলগুলোতে একই চিত্র। সেখানেও মিড ডে মিলের রান্না কাঠের তাপে করা হচ্ছে। কলকাতার রানি রাসমণি হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষক মহসিন ইমাম জানিয়েছেন, ‘বুধবার অনেক পড়ুয়াকে শুধু ডিম দেওয়া হয়েছে। আমরা শিক্ষা দফতরকে বিষয়টি জানিয়েছি।’
শুধু স্কুল নয়, জেলায় জেলায় অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলোতেও জ্বালানির সংকট তৈরি হয়েছে। গ্যাস সংকটে কাঠের জোগান সীমিত। সরকারিভাবে সরবরাহিত উনুন ছোট ও নিম্নমানের। ফলে শিশুরা একসাথে খাবার খেতে পারছে না। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা দ্রুত এলপিজি সংযোগের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন। গ্যাস সংকট শুধু স্কুলেই নয়। আরামবাগের ২ টি মা ক্যান্টিন বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৮০০–৯০০ মানুষ এখান থেকে খাবার পান। গ্যাস না পাওয়ায় পরিষেবা স্থগিত রাখা হয়েছে। দীঘার জগন্নাথ মন্দির ও ইসকনেও ভাত, ডাল ও সবজি বিতরণ সীমিত করা হয়েছে। আগে যেখানে ৩ হাজার মানুষ খেত, এখন তা কমে সাড়ে ৭শো। মিষ্টির দোকানগুলোও গ্যাস সংকটের কবলে। এক সময় যেখানে মিষ্টি ৫–১০ টাকায় বিক্রি হত, এখন ৩০–৪০ টাকা পৌঁছতে চলেছে। এলপিজি বুকিং ও সরবরাহেও সমস্যা প্রকট। অনলাইন বুকিং সার্ভার ক্র্যাশ করেছে। গ্রাহকরা ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, কেউ ২ ঘন্টা, কেউ ৩ ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দামও আগের থেকে দ্বিগুণ, যা সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
মিড ডে মিল নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু জানিয়েছেন, ‘গ্যাসের সঙ্কটে মিড ডে মিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে প্রভাব পড়তে পারে। এটি সরাসরি শিশুর পুষ্টির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা যথাসম্ভব পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চালিয়ে যাব।’ নবান্নে বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, ‘মিড ডে মিল কিছুতেই বন্ধ হবে না। সমস্ত জেলার মিড ডে মিল বিভাগের আধিকারিকরা সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। সরকারের সঙ্গেও আলোচনা চলছে, বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ তবে স্কুলের শিক্ষকরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের খাবারের জন্য শেষ রক্ষা অবলম্বন হিসাবে কাঠের চুলোয় রান্না চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। তবে কাঠের জোগান সীমিত, ফলে নিয়মিত গ্যাস না মিললে মিড ডে মিলের খাবার দেওয়া কার্যত অসম্ভব।
❤ Support Us







