- দে । শ
- আগস্ট ১৩, ২০২৫
দুর্নীতির দিপ্তী ছড়িয়ে গ্রেফতার পিতা-পুত্র । রাজ্যের অধীনস্থ সংস্থায় নাম অভিযুক্ত শাসক দলের নেতার নাম
ভুয়ো থানা খোলার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন বিভাস অধিকারী। সেই বিভাস, যাঁর নাম জড়িয়েছিল নিয়োগ দুর্নীতি মামলায়। বিভাসের ছেলে অর্ঘ্য অধিকারীকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জাল থানার কর্মকাণ্ড কলকাতা শহরেও ছড়িয়ে পড়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে। এবার সেই ‘ওসি’ বিভাসকে নিয়ে সামনে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যাচ্ছে, রাজ্য সরকার পোষিত সংস্থার ডিরেক্টর ছিলেন এই বিভাস। নয়ডা পুলিশের হাতে এসেছে এই নথি।
নয়ডা পুলিশ সূত্রে খবর, ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ওয়্যারহাউস কর্পোরেশন’-এর নন অফিশিয়াল ডিরেক্টর হিসেবে নাম রয়েছে প্রাক্তন তৃণমূল নেতা বিভাস অধিকারীর। সরকারি এই সংস্থার ওয়েবসাইটে ঢুকলে বোর্ড অব ডিরেক্টরসের তালিকায় ওয়েবসাইটে রয়েছে বিভাসের নাম। সেই তালিকায় ৯ জন আমলা রয়েছেন, তার মধ্যেই অন্যতম এই ভুয়ো থানার ‘ওসি’ বিভাস অধিকারী। সূত্রের খবর, বেশ কয়েক বছর ধরেই এই পদ রয়েছে বিভাসের।
শুধু ওয়েবসাইটে নাম থাকাই নয়, চলতি বছরের ৫ মার্চ ওই কর্পোরেশনের বার্ষিক সভার মিনিটসের সরকারি নথিতেও উল্লেখ রয়েছে তার নাম। এই পদের অপব্যবহার করেই গাড়িতে নীল বাতি ব্যবহার করতেন বিভাস ! এই অভিযোগও রয়েছে বিভাসের বিরুদ্ধে।
ভুয়ো থানা-কাণ্ডে ধৃত বিভাসকে জেরা করে নয়ডা পুলিশ জানতে পেরেছে, এ রাজ্যেই এই থানা খোলার পরিকল্পনা ছিল বিভাসের। কিন্তু যে ট্রাস্টের নামে ভুয়ো থানা খোলা হয়েছে, সেই ট্রাস্টের অনুমতি রাজ্য থেকে বিভাস পায়নি। এক এজেন্ট তখন বিভাসকে বলেন নয়ডায় গেলে এই নামে থানা খোলার ব্যবস্থা করে দেওয়া সম্ভব। পুলিশ সূত্র জানাচ্ছে, তার পরই বিভাস তার ছেলেকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে উত্তরপ্রদেশে পাড়ি দেয়।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর এই রাজ্যে বিভাসের নামে চালু থাকা একটি এনজিও-র তথ্য সংগ্রহ করেছে নয়ডা পুলিশ। তদন্তের সূত্রে বাংলায় আসতে পারে নয়ডা পুলিশ।
কে এই বিভাস ?
বিভাস অধিকারী এক সময় ছিল অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ। তারপর তৃণমূল ছেড়ে তৈরি করেছিল নতুন দল। তবে বিভাসের নাম জড়িয়েছিল বাংলার নিয়োগ দুর্নীতি মামলায়। পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও মানিক ভট্টাচার্যের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত এই বিভাস অধিকারী ছিল নিয়োগ কেলেঙ্কারির মিডলম্যান। এবার বিভাস অধিকারী ধরা পড়ল নয়ডায় ভুয়ো থানা খুলে প্রতারণার চক্রে।
ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ অ্যান্ড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন’ নাম দিয়ে নয়ডার সেক্টর ৭০ এলাকার বিএস-১৩৬ নম্বর ঠিকানায় পেল্লাই সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে ছিল বিভাস। স্থানীয় বাসিন্দারা জানতেন এটি একটি নামজাদা তদন্তকারী সংস্থার অফিস। কিন্তু তার আড়ালে বিভাস ও তার সঙ্গীরা প্রতারণার ছক চালাত, তার কোনও ধারণাই ছিল না কারও মনে। গত রবিবার এই ঠিকানা থেকেই নয়ডা পুলিশ গ্রেফতার করে ৬ জনকে। যার মধ্যে অন্যতম পশ্চিমবঙ্গে নিয়োগ কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত বীরভূমের বাসিন্দা ও প্রাক্তন তৃণমূল নেতা বিভাস অধিকারী। নয়ডায় ভুয়ো তদন্তকারী সংস্থা তৈরি করে প্রতারণার বড়সড় ফাঁদ পেতে বসেছিল বিভাস।
নয়ডা পুলিশ সূত্রে খবর, গত ৪ জুন সেক্টর ৭০ এলাকার এই বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ অ্যান্ড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন’ বোর্ড লাগিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল মাত্র ১০ দিন আগেই। থানার মতো রং ও লোগো ব্যবহার করা হয়েছিল এই সাইন বোর্ডে। ফলে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই সেটিকে তদন্তকারী সংস্থার অফিস ভেবে ফেলে। উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রক, আয়ুষ মন্ত্রক এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকের জাল সার্টিফিকেট রাখা হত এই অফিসে। শুধু তাই নয়, ভুয়ো সংস্থাটি নাকি ইন্টারপোল, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন দ্বারা স্বীকৃত বলেও দাবি করত।
তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, কয়েকদিন আগেই কাজ শুরু করায় খুব বেশিদূর প্রতারণার জাল বিস্তার করতে পারেনি বিভাস ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। www.intlpcrib.in ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভুয়ো পরিচয়পত্র এবং নথি দেখিয়ে তোলাবাজির কারবার চলত বিভাস ও তার দল। ধৃতরা দাবি করে, ব্রিটেনে তাদের অফিসের শাখা রয়েছে।
ওই ভুয়ো অফিস থেকে উদ্ধার হয়েছে মোবাইল ফোন, তিনটি পৃথক ব্যাঙ্কের চেকবই, ১৬টি রাবার স্ট্যাম্প, একটি স্ট্যাম্প প্যাড, বিভিন্ন আইডি কার্ড, ভিজিটিং কার্ড, বিভিন্ন শংসাপত্র, লেটারহেড, একাধিক ATM কার্ড এবং ৪২ হাজার ৩০০ টাকা নগদ।
ধৃতদের তালিকায় বিভাস অধিকারী ছাড়াও রয়েছে তার ছেলে অর্ঘ্য, বাবুলচন্দ্র মণ্ডল, পিন্টু পাল, শ্যামাপদ মাল, আশিস কুমার। এরা প্রত্যেকেই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা।
প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় যুব তৃণমূলের প্রাক্তন নেতা কুন্তল ঘোষ গ্রেফতার হওয়ার পরই এই বিভাস অধিকারীর নাম উঠে এসেছিল। সেই সূত্র ধরেই চলে তল্লাশি অভিযান। এক সময় বেসরকারি বিএড এবং ডিএলএড কলেজ সংগঠনের সভাপতি ছিল বিভাস। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এবং তৃণমূল বিধায়ক তথা প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের অপসারিত সভাপতি মানিক ভট্টাচার্যের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা ছিল। আবার অনুব্রত মণ্ডলেরও খুব কাছের লোক বলে পরিচিত ছিল এলাকায়। তবে গোরু পাচার মামলায় অনুব্রত মন্ডল গ্রেফতার হওয়ার পর দলত্যাগ করে এই বিভাস। তারপর ‘অল ইন্ডিয়া আর্য মহাসভা’ নামে একটি নতুন দল তৈরি করেছিল।
মাঝে কয়েকটা বছর উধাও ছিল বিভাস। গোয়েন্দারা মনে করছেন, নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে ভাটা পড়ে যাওয়ায় নতুন কোনও প্রতারণার ছক কষছিল সে। আইন পাশ করা পুত্র অর্ঘ্যকে নিয়ে বাংলা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলি উত্তরপ্রদেশে। সেখানে পসার সাজিয়ে বসতে না বসতেই গ্রেফতার পশ্চিমবঙ্গের বিভাস।
❤ Support Us






