- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মার্চ ১৮, ২০২৬
প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হতেই উত্তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি ! তৃণমূল-বিজেপি-বাম — তিন শিবিরেই ‘বিদ্রোহ’
বাংলায় ভোটের দামামা বেজে গিয়েছে। ১৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন-২০২৬-এর দুই দফার দিনক্ষণ। তার পর থেকেই একে একে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলি। ১৬ মার্চ প্রথম দফার তালিকা ঘোষণা করে বামফ্রন্ট ও বিজেপি। ১৭ মার্চ জোড়াফুল শিবিরের পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা সামনে আনেন মমতা ব্যানার্জি ও অভিষেক ব্যানার্জি। পুরনোদের পাশাপাশি তালিকায় এবার গুরুত্ব পেয়েছে ছাত্রনেতা ও নতুন মুখরা। আর তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই যে ছবি সামনে আসছে, তাতে ভোটের আগে তীব্র অস্বস্তিতে ফেলেছে তিনটি শিবিরের নেতৃত্বদের। পাহাড় থেকে সমতল; রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিক্ষোভ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, দলত্যাগ, এমনকি ভাঙচুর— সব মিলিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভোটমুখী রাজনৈতিক আবহ।
২৯১ জনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে তৃণমূল। তার মধ্যে ৭৪ জন বর্তমান বিধায়ক প্রার্থী তালিকায় জায়গা পাননি। বাদ পড়া বিধায়কদের মধ্যে রয়েছেন তপন দাশগুপ্ত, জোৎস্না মান্ডি, তাজমুল হোসেন, অসিত মজুমদার, মাণিক ভট্টাচার্য, জীবনকৃষ্ণ সাহা, পরেশ পাল, স্বর্ণকমল সাহা, বিকাশ রায়চৌধুরী এবং বিবেক গুপ্তের মতো একাধিক পরিচিত নাম। বসিরহাট মহকুমার ৮ বিধানসভার ৬ টিতেই নতুন মুখ। মিনাখা ও স্বরূপনগর বিধানসভায় প্রার্থী অপরিবর্তিত। মহকুমার মধ্যে বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার স্বরূপনগর কেন্দ্রে বিনা মণ্ডল এবং বসিরহাটের সাংগঠনিক জেলার অন্তর্গত একমাত্র মিনাখাঁ কেন্দ্রে ঊষারানি মণ্ডল ছাড়া ৬ টি বিধানসভা কেন্দ্রে এবার নতুন মুখ। বাদুড়িয়া বিধানসভায় কাজি আবদুল রহিম দিলুকে এবার দল টিকিট দেয়নি। তাঁর জায়গায় প্রার্থী হয়েছেন বুরহানুল মুকাদ্দিম লিটন।
বসিরহাটের রাজনীতিতে বাদল লিটনের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। লিটনও বসিরহাট কলেজের ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা নেতা। বর্তমানে তিনি উত্তর ২৪ পরগনার জেলা পরিষদের শিক্ষি কর্মাধ্যক্ষ এবং তৃণমূলের বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার সভাপতি। বসিরহাট দক্ষিণে ডাঃ সপ্তর্ষি ব্যানার্জির জায়গায় প্রার্থী হয়েছেন সুরজিৎ মিত্র বাদল। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকেই বাদল মমতার ব্যানার্জির সঙ্গে রয়েছেন। একসময় বসিরহাট তথা জেলা ছাত্র নেতা হিসেবে বাদলের পরিচিতি। সংগঠক হিসেবে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলেছেন। এই প্রথম নির্বাচনে লড়বেন বাদল। হিঙ্গলগঞ্জে এবার দেবেশ মন্ডলের জায়গায় প্রার্থী হয়েছেন আনন্দ সরকার। হাসনাবাদ পঞ্চায়েতের দীর্ঘদিনের প্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন আনন্দ সরকার। নতুন মুখ সন্দেশখালিত বিধানসভা কেন্দ্রে ঝর্ণা সর্দার। এই প্রথম কোন মহিলাকে সন্দেশখালি বিধানসভা তৃণমূল প্রার্থী করল।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই প্রথম ধাক্কা আসে উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙা থেকে। টানা ৩ বারের বিধায়ক রফিকূল ইসলামকে এবার টিকিট না দেওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁর অনুগামীরা। আমডাঙা-কাকিনাড়া রোড অবরোধ করে বিক্ষোভে সামিল হন তাঁরা। ওই কেন্দ্রে এবার প্রার্থী করা হয়েছে পিরজাদা কাসেম সিদ্দিকিকে। একই রকম অভিমানী সুর শোনা গিয়েছে হুগলির চুঁচুড়ায়। টানা ৩ বারের বিধায়ক অসিত মজুমদারকে বাদ দিয়ে প্রার্থী করা হয়েছে তরুণ তুর্কী দেবাংশু ভট্টাচার্যকে। প্রকাশ্যে দলকে ধন্যবাদ জানালেও অসিতের কথায় স্পষ্ট হতাশা— ‘দল আগে’ বললেও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এমনকি নিজের পুরনো পেশায় ফেরার কথাও শোনান। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ। ক্যানিং পূর্বে বিদায়ী বিধায়ক শওকত মোল্লা কে সরিয়ে ভাঙড়ে পাঠানো হয়েছে, আর ক্যানিং পূর্বে প্রার্থী করা হয়েছে বাহারুল ইসলামকে। দলের এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে জীবনতলা এলাকায় রাস্তায় নেমে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখান শওকতের অনুগামীরা। রাতভর অবরোধ চলে। রাজনৈতিক মহলের মতে, ভাঙড়ে নওশাদ সিদ্দিকির প্রভাব কাটাতেই এই কৌশল নিয়েছে তৃণমূল।
ব্রাত্য তালিকায় নাম রয়েছে ফারাক্কার বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলামের। তারপরই কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন তিনি। প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হতেই তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য, ‘আমায় বলির পাঁঠা করা হলো।’ এর পরেই মনিরুলের হুঁশিয়ারি, তিনি তৃণমূল ছেড়ে দেবেনই, অন্য দল থেকে প্রার্থী হবেন। তবে কোনও দলে যোগ দেবেন না কি, নির্দল প্রার্থী হিসাবে ভোটে দাঁড়াবেন সে সব নিয়ে মুখ খোলেননি। মনিরুলের জায়গায় ফরাক্কায় প্রার্থী করা হয়েছে সামশেরগঞ্জের বিদায়ী বিধায়ক আমিরুল ইসলামকে। প্রার্থী ঘোষণার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘প্রার্থী তালিকা দলের সিদ্ধান্তে হয়েছে। এ নিয়ে কারোও ক্ষুব্ধ হলে চলবে না, সবার দলের সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করতে হবে।’ তবে প্রার্থী তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর নরম-গরমে এই বাদ পড়া ৭৪ জন বিধায়কই কম বেশি ক্ষোভে প্রকাশ করেছেন দলের বিরুদ্ধে।
বলাগড়েও একই ছবি। বিদায়ী বিধায়ক, লেখক মনোরোঞ্জন ব্যাপারি টিকিট না পেয়ে নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে জানিয়ে দেন, তিনি রাজনীতি ছেড়ে আবার লেখালেখিতেই ফিরবেন। তাঁর কথায়, ‘গামছা গলায় এসেছিলাম, সেভাবেই চলে যাব।’ দলের প্রতি কোনো প্রকাশ্য ক্ষোভ না দেখালেও ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে ধোঁয়াশা রেখে দিয়েছেন তিনি। এদিকে জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জে প্রার্থী বদল ঘিরে তীব্র ক্ষোভ। ৪ বারের বিধায়ক খগেন্দ্র নাথ রায়কে সরিয়ে অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মনকে প্রার্থী করায় কার্যত বিস্ফোরণ ঘটে। পদত্যাগের ঘোষণা করেন খগেন্দ্রনাথ। তাঁর অনুগামীদের মধ্যেও ইস্তফার হিড়িক পড়ে। ব্লক স্তর থেকে শুরু করে শাখা সংগঠনের একাধিক নেতা পদত্যাগের পথে হাঁটেন। উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁয়ও প্রার্থী ঘোষণার পর গোষ্ঠী সংঘর্ষে জখম হন তৃণমূল কর্মীরা। বাঁশ-লাঠি নিয়ে সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে।
খণ্ডঘোষ, মিনাখাঁ, মন্তেশ্বর—সব জায়গাতেই একই ছবি, দলীয় অন্দরে অশান্তি। ২ বিদায়ী মন্ত্রী ও জেলা সভাপতিকে প্রার্থী রেখেই কাটোয়া ও কালনা ২ মহকুমার প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করল তৃণমূল। পূর্ব বর্ধমান জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে ৬ বিধায়ককে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। টিকিট পাননি ভাতারের বিধায়ক মানগোবিন্দ অধিকারী, মেমারির বিধায়ক মধুসূদন ভট্টাচার্য, পূর্বস্থলী উত্তরের বিধায়ক তপন চ্যাটার্জি, রায়নার বিধায়ক শম্পা ধাড়া, জামালপুরের বিধায়ক অলোক মাঝি ও আউশগ্রামের বিধায়ক অভেদানন্দ থান্দার। পূর্বস্থলী উত্তরে প্রার্থী করা হয়েছে প্রয়াত বাম নেতা ও মন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামীর মেয়ে বসুন্ধরা গোস্বামীকে। এছাড়া ভাতারের নয়া প্রার্থী শান্তনু কোনার, মেমারিতে রাসবিহারী হালদার, রায়নায় মন্দিরা দলুই, আউশগ্রামে শ্যামাপ্রসন্ন লোহার ও জামালপুরে ভূতনাথ মালিক। কাটোয়া ও পূর্বস্থলী দক্ষিণে ২ হেভিওয়েট নেতাকেই রেখেছে দল। দলের জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি বলেন, ‘জেলার ১৬টি আসনের সবকটি আসনেই গতবারের থেকেও বেশি মার্জিনে তৃণমূল প্রার্থীরা জিতবেন।’ প্রার্থী ঘোষণা হওয়ার পরই জোরকদমে শুরু হয়ে গেল দেওয়াল লিখন, প্রচার, মিছিল।
পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষে প্রার্থী নবীন বাগকে ঘিরে দলের অন্দরে ক্ষোভ চরমে ওঠে। ব্লক সভাপতি অপার্থিব ইসলাম, জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ বিশ্বনাথ রায়-সহ একাধিক নেতা পদত্যাগের হুঁশিয়ারি দেন। অভিযোগ ওঠে, ‘বহিরাগত’ ও দলবদলুদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, আর পুরনো কর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে মন্তেশ্বরে মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর নাম ঘোষণা হতেই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। দিগনগরে হাতাহাতি থেকে বোমাবাজির অভিযোগ— পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নামাতে হয়। একজন আহত হন বলেও খবর।
বিজেপিতেও প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত। ১৪৪টি আসনে প্রার্থী ঘোষণার পরেই বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে ‘বিদ্রোহ’। মহিষাদলে নতুন মুখ সুভাষ পাঁজাকে প্রার্থী করায় ক্ষুব্ধ হয়ে দল ছাড়ার ঘোষণা করেছেন বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক জানা। বিশ্বনাথ সরাসরি অভিযোগ করেন, দল কর্পোরেট সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছে। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘আমি কোনো সংস্থার কর্মচারী নই।’ আলিপুরদুয়ারে প্রার্থী পরিতোষ দাস-কে নিয়ে ক্ষোভে জেলা কার্যালয়ে ভাঙচুর চালান কর্মীরা। টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ, কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ, সব মিলিয়ে প্রবল উত্তেজনা ছড়ায়। জেলা সভাপতি মিঠু দাসকে ঘিরেও বিক্ষোভ দেখানো হয়। কুমারগ্রামেও প্রার্থী মনোজ ওরাওকে ‘তোলাবাজ’ বলে কটাক্ষ করেন দলেরই এক নেত্রী। বাঁকুড়ার ছাতনাতেও প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর বিজেপি কর্মীদের একাংশ বিক্ষোভে সামিল হন। করণদিঘিতে প্রকাশ্যে আসে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। সব মিলিয়ে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল অবস্থায় থাকা বিজেপির সামনে এই নির্বাচন বড়ো চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
বাম শিবিরেও একই চিত্র। সিপিআই(এম)-এর প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর কালীগঞ্জে প্রার্থী নিহত তামান্নার মা সাবিনা ইয়াসমিনকে প্রার্থী হিসাবে মানতে নারাজ হয়ে দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালান কর্মীদের একাংশ। অভিযোগ, সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন এমন একজনকে প্রার্থী করা হয়েছে। এদিকে প্রার্থী বণ্টন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফরওয়ার্ড ব্লক চিঠি দিয়েছে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুকে। অভিযোগ, একাধিক আসনে আলোচনা ছাড়াই প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। কোচবিহার উত্তর থেকে পুর্ব বর্ধমানের গলসি, একাধিক কেন্দ্র নিয়ে এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।সব মিলিয়ে প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ ক্রমশ উত্তপ্ত। তৃণমূল, বিজেপি, বাম—তিন শিবিরেই ‘বিদ্রোহ’-এর সুর স্পষ্ট। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কামান দাগার আগে নিজেদের ঘর সামলানোই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ শিবিরেই।
❤ Support Us







