- দে । শ
- ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬
দেশজুড়ে পরীক্ষা-উৎসবে সামিল ৩ কোটি ৬০ লক্ষ পরীক্ষার্থী। গড়ে উঠছে নতুন প্রজন্মের মানসিক ভিত?
ফেব্রুয়ারি- মার্চের হালকা রোদ, মৃদু হাওয়া। শীত শেষে ঋতু বদলের ইঙ্গিত, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা টেনশন, রাতজাগা পড়া, অঙ্কের খাতা আর সাজেশন নিয়ে শেষ মুহূর্তের দৌড়। কিন্তু এ বছর ছবিটা শুধু বাড়ির চার দেওয়ালে আটকে নেই। সারা দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ পড়ুয়া যখন দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় বসছে, তখন সেই পরীক্ষা কার্যত জাতীয় ঘটনায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষা মহলের মতে, এই বিশাল আয়োজন কেবল নম্বরের লড়াই নয়—এ এক প্রজন্মের মানসিক, নৈতিক ও সামাজিক পরিণতিরও পরীক্ষা।
ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে বোর্ড পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই ভবিষ্যতের সিঁড়ি বলে বিবেচিত। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ, পেশা নির্বাচন, এমনকি সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে এই ফলাফল। ফলে পরীক্ষার দিনগুলোতে পরিবার থেকে পাড়া, স্কুল থেকে প্রশাসন, সকলের তীক্ষ্ণ নজর থাকে পরীক্ষার্থীদের দিকে। শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, বোর্ড পরীক্ষা কেবল জ্ঞান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নয়, এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থারও পরিমাপ। প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা, পরীক্ষা কেন্দ্রে স্বচ্ছতা, মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা, সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা। সে বিশ্বাসই দীর্ঘমেয়াদে জাতি গঠনের ভিত শক্ত করে।
বোর্ড পরীক্ষার এই মহাযজ্ঞের আবহে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আর শুধু নম্বর নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও। পরীক্ষার মরসুমে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগ ও চাপ বেড়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে ঘিরে উচ্চ প্রত্যাশা থাকলে চাপ তৈরি হবেই। কিন্তু সে চাপকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে, তাকে সামলানোর উপায় শেখানোই জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন নিবিড় পরিকাঠামোর। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু মৌলিক অভ্যাসের উপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। নিয়মিত পড়াশোনা, সময় বেঁধে মক টেস্ট দেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম আহার—এগুলি যেমন ফলাফলে প্রভাব ফেলে, তেমনই মানসিক স্থিতিও বাড়ায়। প্রয়োজনে শিক্ষক, বন্ধু বা হেল্পলাইনের সাহায্য নেওয়াকেও তাঁরা ‘দুর্বলতা’ নয়, সচেতনতার লক্ষণ বলেই মনে করছেন অনেকে।
অভিভাবকদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তুলনার বদলে উৎসাহ, ফলাফলের চেয়ে প্রচেষ্টার প্রশংসা, নিয়মিত রুটিন বজায় রাখতে সহায়তা করা, এই কয়েকটি পদক্ষেপই পড়ুয়ার আত্মবিশ্বাসে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বাড়ির অতিরিক্ত প্রত্যাশাই চাপের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। স্কুলগুলির উপরেও রয়েছে কাঠামোগত দায়িত্ব। নির্ধারিত পাঠক্রমের পূর্ণাঙ্গ পাঠদান, পর্যাপ্ত অনুশীলনী পরীক্ষা, এবং প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলা, এসবই এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা জরুরি। নীতিনির্ধারকদের ক্ষেত্রেও বার্তা স্পষ্ট— শুধু পরীক্ষা নেওয়াই যথেষ্ট নয়, সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। আর্থ-সামাজিক বৈষম্য যাতে পরীক্ষার ফলাফলে প্রতিফলিত না হয়, তার জন্য প্রয়োজন পরিকাঠামোগত সমতা ও সহজলভ্য সহায়তা পরিষেবা। পরীক্ষার সময় হেল্পলাইনে কলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াই প্রমাণ করে, প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন কতটা প্রয়োজনীয়।
তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে একটি প্রশ্ন বারবার উঠছে, নম্বরই কি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি? শিক্ষামহলের একাংশের মতে, নম্বর গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কোনো পড়ুয়ার পরিচয় নয়। পরীক্ষার ফলাফল পরবর্তী পথনির্দেশ করতে পারে, উচ্চশিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ বা অন্য বিকল্প, কিন্তু তা ব্যর্থতার ছাপ হয়ে থাকা উচিত নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বোর্ড পরীক্ষা আসলে জীবনের প্রথম বড়ো জবাবদিহির জায়গা। এখানে সততা, নিয়ম মানা, চাপের মধ্যে স্থির থাকা—এই গুণগুলিই ভবিষ্যতের পেশাগত ও সামাজিক জীবনে কাজে লাগে। অর্থাৎ, পরীক্ষা শুধু বিষয়জ্ঞান যাচাই করে না, চরিত্রও গড়ে তোলে। যখন কোটি কোটি পরিবার একসঙ্গে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে শামিল হয়, তখন সমাজও সাময়িকভাবে শিক্ষাকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হয়। বাড়ির টেলিভিশন বন্ধ থাকে, আত্মীয়-স্বজনের আড্ডা কমে, পাড়ায় শব্দ নিয়ন্ত্রণের আবেদন ওঠে, এই সামষ্টিক সংবেদনশীলতাই প্রমাণ করে, শিক্ষা এখনও জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে। তবু মনে রাখা দরকার, বোর্ড পরীক্ষা জীবনযাত্রার একটি ধাপ, গন্তব্য নয়। ব্যর্থতা পথের শেষ নয়, সাফল্যও কোনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়। বহুমুখী প্রতিভা ও বিকল্প পথের স্বীকৃতি না দিলে আমরা নিজেরাই সম্ভাবনার পরিসর সংকুচিত করি। ফলে আমাদের প্রত্যাশা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন এই যে, নম্বরের বাইরে গিয়ে যদি আমরা সহনশীল, দায়িত্বশীল এবং আত্মবিশ্বাসী তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারি, তবেই এই পরীক্ষা সত্যিকারের জাতি গঠনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
❤ Support Us





