- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মার্চ ১৩, ২০২৬
কেন্দ্রের চিঠিতে দার্জিলিংয়ের ডিএমকে সরাল নবান্ন
রাষ্ট্রপতির উত্তরবঙ্গ সফর ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে তীব্র হল রাজ্য–কেন্দ্র টানাপোড়েন। শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সি. সি. সুধাকর এবং দার্জিলিঙের জেলাশাসক মণীশ মিশ্রকে কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনে চেয়েছিল কেন্দ্র। নবান্নের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। এরপরই কেন্দ্রের আংশিক দাবি মেনে দার্জিলিঙের জেলাশাসক পদ থেকে মণীশ মিশ্রকে সরিয়ে দিল রাজ্য সরকার। তাঁর জায়গায় নতুন জেলাশাসক করা হয়েছে সুনীল আগরওয়ালকে। তবে শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনারকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি নবান্নের তরফে। ফলে তাঁকে ঘিরেও জল্পনা বাড়ছে— রাজ্য সরকার কি তাঁকেও সরাবে, নাকি কেন্দ্রীয় ডেপুটেশন প্রসঙ্গে অন্য কোনো অবস্থান নেবে?
বিতর্কের সূত্রপাত রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর উত্তরবঙ্গ সাম্প্রতিক উত্তরবঙ্গ সফরকে ঘিরে। একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলন’-এ যোগ দিতে শিলিগুড়িতে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি। প্রথমে শিলিগুড়ির বিধাননগরে অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা থাকলেও পরে সভাস্থল বদলে বাগডোগরা বিমানবন্দরের কাছে গোঁসাইপুরে সরিয়ে নেওয়া হয়। সভাস্থল পরিবর্তন এবং প্রোটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগ ঘিরেই শুরু হয় রাজনৈতিক তরজা। গোঁসাইপুরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি নিজেই প্রশ্ন তোলেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে। তাঁর বক্তব্য, বিধাননগরে অনুষ্ঠান হলে আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ সম্ভব ছিল। কিন্তু কেন সেখানে অনুমতি দেওয়া হয়নি, তা তাঁর কাছে পরিষ্কার নয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি বাংলার মেয়ে। বাংলার মানুষকে আমি ভালোবাসি। মমতা বোধহয় রাগ করেছেন।’
রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়ায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপি নেতৃত্ব রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁদের অভিযোগ, দেশের প্রথম নাগরিকের প্রতি অসম্মান দেখানো হয়েছে। পাল্টা তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির পদকে ব্যবহার করছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কড়া প্রতিক্রিয়া দেন। কলকাতায় ধর্নামঞ্চ থেকে তিনি বলেন, ‘আমি দুঃখিত, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, ম্যাডাম, আপনাকে বিজেপি ব্যবহার করছে।’ মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তিনি রাষ্ট্রপতির রাজ্য সফরের বিষয়ে অবহিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের আয়োজকদের সম্পর্কে তাঁর কাছে স্পষ্ট তথ্য ছিল না।
বিতর্কের মাঝেই পুরো বিষয়টি নিয়ে রিপোর্ট তলব করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে অন্তত ৫টি প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার পরেই রাষ্ট্রপতির সফরের সময় দায়িত্বে থাকা শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সি. সি. সুধাকর এবং দার্জিলিঙের জেলাশাসক মণীশ মিশ্রকে কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনে চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ আবহেই শুক্রবার বিকেলে নবান্ন থেকে জারি হয় একটি প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি। তাতে জানানো হয়, দার্জিলিঙের জেলাশাসক পদ থেকে মণীশ মিশ্রকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের বিশেষ সচিব করা হয়েছে। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, কার্যত এটি তাঁর পদোন্নতিই। অন্যদিকে, দার্জিলিঙের নতুন জেলাশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সুনীল আগরওয়াল, যিনি ১৯৯৪ সালের ডব্লিউবিসিএস (এক্সিকিউটিভ) ক্যাডারের অফিসার।
প্রশাসনিক মহলে আরেকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দার্জিলিঙের জেলাশাসককে সরানোর যে বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে, তাতে তারিখ হিসেবে ১২ মার্চের উল্লেখ রয়েছে, যদিও সেই নির্দেশ সামনে আসে ১৩ মার্চ। ফলে জল্পনা তৈরি হয়েছে, কেন্দ্রের চিঠি কি আগেই পৌঁছে গিয়েছিল নবান্নে? নাকি রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে পরিস্থিতির জটিলতা বুঝেই আগাম প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? বিতর্ক বাড়তেই অবশ্য সক্রিয় হয়েছে রাজ্য প্রশাসন। মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছে একাধিক নথি পাঠিয়েছেন। সেখানে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে হওয়ায় প্রশাসনিক স্তরে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী কেন ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি, তারও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে দিল্লি যে সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়, তা স্পষ্ট বলে মনে করছেন প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকেরা।
❤ Support Us






