Advertisement
  • এই মুহূর্তে বৈষয়িক
  • জুলাই ১৫, ২০২৫

হুগলির হিন্দমোটরে বন্দে ভারত ও মেট্রো রেলের কোচ তৈরির কারখানা, টিটাগড় রেল সিস্টেমস লিমিটেডকে আরো ৪০ একর জমি দিলেন মমতা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
হুগলির হিন্দমোটরে বন্দে ভারত ও মেট্রো রেলের কোচ তৈরির কারখানা, টিটাগড় রেল সিস্টেমস লিমিটেডকে আরো ৪০ একর জমি দিলেন মমতা

হুগলির হিন্দমোটরের প্রায় ৪০ একর জমি টিটাগড় রেল সিস্টেমস লিমিটেডকে ৯৯ বছরের জন্য লিজে দিল রাজ্য সরকার। বন্দে ভারত এক্সপ্রেস আর মেট্রো রেলের কোচ এখন থেকে তৈরি হবে বাংলার মাটিতেই। রাজ্যের শিল্প ও পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় পদক্ষেপ হিসেবে, সোমবার, নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্তে সরকারি সিলমোহর পড়ে।

সরকারি সূত্রের খবর, এই জমি কোতরং ও ভদ্রকালী মৌজায় অবস্থিত, টিটাগড়ের বর্তমান কারখানার সঙ্গেই যুক্ত। জমির মূল্য নির্ধারিত হয়েছে ১২৬ কোটি টাকা। প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে এখানে গড়ে উঠবে আধুনিক রেল কোচ তৈরির পরিকাঠামো। থাকছে কোচ ফার্মিং, টেস্টিং, কমিশনিংয়ের ইউনিট, এমনকি পরীক্ষার জন্য একটি পৃথক টেস্ট ট্র্যাকও নির্মাণ করা হবে। শিল্প মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু হুগলি শিল্পাঞ্চলের পুরনো মর্যাদা ফেরাবে না, কেন্দ্রীয় ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাংলাকে রেল উৎপাদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করবে। টিটাগড় রেল সিস্টেমস ইতিমধ্যেই প্রায় ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মেট্রো ও ইএমইউ ট্রেনের কোচ তৈরির বরাত পেয়েছে। সেই বরাত পূরণ করতেই কারখানা সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু জায়গার অভাবে এতদিন তা আটকে ছিল। সে প্রেক্ষাপটেই জমি লিজে দেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের শিল্পনীতির বাস্তব রূপ বলেই মনে করছে রাজ্য সরকার।

এই প্রকল্পে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা যেমন উজ্জ্বল, তেমনই হুগলি শিল্পাঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারে বলেই মনে করছে রাজ্য প্রশাসন। রাজ্য সরকারের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মেট্রো ও বন্দে ভারতের কোচ উৎপাদনের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গই হয়ে উঠতে পারে নতুন হাব। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা হিন্দুস্তান মোটর কারখানার জমি আবারো শিল্পে ব্যবহৃত হতে চলেছে, যা শিল্প-বিনিয়োগে আস্থা ফেরানোর বার্তা দিচ্ছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। তবে এ উদ্যোগ ঘিরে উঠছে কিছু প্রশ্নও। বিজেপি নেতা পঙ্কজ রায় অভিযোগ করেছেন, ‘হিন্দুস্তান মোটরের প্রায় ২৫০ জন প্রাক্তন শ্রমিক এখনও পিএফ এবং গ্র্যাচুইটির টাকা পাননি। তাঁদের স্বার্থের কথা সরকার ভাবেনি।’ সিপিএম নেতা আভাস গোস্বামীর দাবি, ‘শিল্পের জমিতে শিল্প চাই। তবে যাঁরা আগে ওই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদেকেই পুনরায় কাজে নেবার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।’ যদিও তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের নেতা উত্তম চক্রবর্তীর আশ্বাস, ‘টিটাগড় রেল সিস্টেমস কাজ শুরু করলে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা করব। অনেকদিন ধরে জমি ও যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়েছিল। এবার নতুন আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।’

এই জমির প্রাক্তন মালিক ছিল হিন্দুস্তান মোটরস। এক সময় হিন্দুস্তান মোটর কারখানায় তৈরি হতো রতন টাটার স্বপ্নের অ্যাম্বাসাডর ট্রেকার ও কন্টেসার গাড়ি। পরে কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৪ সালে সম্পূর্ণ বন্ধ হয় উৎপাদন। ফরাসি সংস্থা প্যাজিয়োর হাতে অ্যাম্বাসাডর বিক্রির পর থেকেই পতনের শুরু। ২০১৫ সাল থেকে হিন্দমোটরের একটি অংশ ব্যবহার করতে শুরু করে টিটাগড় ওয়াগন, যার নাম পরে টিটাগড় রেল সিস্টেমস হয়। ২০২২ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, ওই অঞ্চলে একটি বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব তৈরি হবে। বর্তমান প্রকল্পকে তারই প্রথম ধাপ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এদিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে আরও একটি মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের ২ জুন বালাসোর ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ১৩ জনের পরিবারকে সাহায্য করতে তাঁদের নিকটাত্মীয়দের ‘বিশেষ সংস্থান’ প্রকল্পের অধীনে হোমগার্ড ভলান্টিয়ার হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। অন্যদিকে, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির পরিষেবা সহজ করতে বড়ো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কলকাতা পুরনিগম এলাকায়। ‘বয়স্ক ভাতা’, ‘বিধবা ভাতা’ এবং মানবিক ভাতা স্কিমের আওতায় আবেদন গ্রহণ ও অনুমোদনের দায়িত্ব এখন থেকে সমাজকল্যাণ দফতরের পরিবর্তে থাকবে পুর কমিশনারের হাতে। প্রশাসনের যুক্তি, এতে করে প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে।

এ সবের পাশাপাশি রাজ্যের উন্নয়নের চিত্র উঠে এসেছে নীতি আয়োগের সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় দেশের গড়ের তুলনায় এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স-এ বার্তা দিয়ে বলেন, ‘এই উন্নয়ন রাজ্যের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অগ্রগতির প্রতিফলন।’ অন্যদিকে সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান এন. চন্দ্রশেখরনের বৈঠক ঘিরে রাজ্যে জোর জল্পনা সৃষ্টি হয়েছে, তবে কি ফের বাংলার শিল্প পরিসরে পা রাখতে চলেছে টাটা গোষ্ঠী? ২০০৬ সালের সিঙ্গুর-পর্ব আজো বাংলার রাজনীতি ও শিল্পনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই পর্বের ব্যর্থতা পেরিয়ে রাজ্য আবার শিল্পায়নের পথে ফিরছে বলেই মনে করছেন অনেকে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও, এ বার বাংলার মানুষ চাইছেন—শিল্প ফিরুক, কর্মসংস্থান হোক, হুগলির ধ্বংসপ্রাপ্ত কারখানা অঞ্চলে আবার বাজুক যন্ত্রের শব্দ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!