- মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
- মে ৯, ২০২২
কবিগুরুর ক্রিকেট প্রেম
রবি ঠাকুরের লেখা সহজপাঠ বইতে —কবি লিখেছিলেন একা একা খেলা যায় না। ও বাড়ি থেকে কয়েকজন ছেলে এলে বেশ হয়। গাছ নেই ঢেলা মেরে বেল পেরে নেব।’ খেলার প্রতি কবির ঝোঁক সেই ছেলেবেলা থেকে।
‘সহজ পাঠ’ -এর দ্বিতীয় ভাগের দ্বিতীয় অংশে কবিগুরু লিখেছেন, ‘অগত্যা বাইরে বসে আছি। দেখছি, ছেলেরা খুশী হয়ে নৃত্য করছে। কেউ বা ব্যাটবল খেলছে। নিত্যশরণ ওদের ক্যাপ্টেন। ‘
আচ্ছা ‘ব্যাটার’ কে কি ‘দন্ডপাণি’ বলা যায়? ….. অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর ‘সারাদিনের খেলা’ রচনায় বলতে গেলে এমনভাবেই ‘রাবীন্দ্রিক ক্রিকেট’ -এর সূত্রপাত।
‘রবীন্দ্রনাথ ক্রিকেট খেলতেন? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া না গেলেও ‘ক্রিকেট’ একেবারে অনুল্লিখিত নয় রবীন্দ্র সাহিত্যে।
১৯৬১ সালে বিষয়টি সবার নজরে আসে। জুন মাসে আমেরিকার ‘লাইফ ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় শ্রীমতী শান্তা রামরাওয়ের একটি প্রবন্ধ। সেখানে লেখা হয়েছিল ‘পরিণত বয়সে কবি ক্রিকেট পারদর্শী হওয়ার উদ্দেশ্যে খেলা শুরু করেন, কিন্তু খেলার কায়দা আয়ত্ত করতে না পেরে তিনি খেদোক্তি করে লিখেছিলেন, ‘ক্রিকেট আমার কাছে ভ্রান্তির সৃষ্টি করে!’১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত-ইংল্যান্ডের ক্রিকেট টেস্টের আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। সেখানে ‘অদ্ভুতাচার্য্য’ নামে যে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, সেখানে এই ‘লাইফ’ পত্রিকার লেখাটি উল্লেখ করে লেখক জানান যে, তিনি তৎকালীন কেন্দ্রীয় উপমন্ত্রী শ্রী অনিল কুমার চন্দর কাছে এই ব্যাপারে জানতে চান। শ্রী চন্দ তখন পালটা চিঠি লিখে জানান যে, এই ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। এরপর লেখক ঐ প্রবন্ধের লেখিকার কাছে এই ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি আরও অদ্ভুত উত্তর দিয়েছিলেন! শ্রীমতী শান্তা রামরাও সেই চিঠির উত্তরে লিখেছিলেন, তিনি নাকি শ্রী চন্দর কাছ থেকেই রবি ঠাকুরের ক্রিকেট প্রেম নিয়ে জেনেছেন! এবং শ্রী চন্দ জানতে পেরেছিলেন প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশের কাছ থেকে। ফলে লেখক অর্থাৎ ‘অদ্ভুতাচার্য্য’ পুরো ব্যাপারটাকেই সন্দেহজনক বলেন।
লন্ডন সফরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।এর কয়েক দিন পরে আরও একটি অদ্ভুত চিঠি প্রকাশিত হয় আনন্দবাজারে। ৩/১/১৯৬২ তারিখের সেই চিঠি লিখেছিলেন জনৈক জগদীশ রায়। তাঁর দাবি ১১ নম্বর স্টার রোডের বাড়িতে অর্থাৎ বালীগঞ্জে থাকার সময় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্রিকেট খেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তিনি তখন এই জগদীশ রায়কে দিয়ে ক্রিকেটের সরঞ্জাম আনিয়ে খেলা শুরু করেছিলেন এবং দুজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কোচও রাখেন। বাড়ির সামনেই ছিল অধুনা সিসিএফসি)। সেখানে নিয়মিত খেলা হত। শোনা যায় সেই মাঠের প্রভাবেই ঠাকুর পরিবারে ক্রিকেটের আগমন।
দাদা-র দেখাদেখি রবীন্দ্রনাথও ব্যাট-বলের যুদ্ধে মজেছিলেন। কিন্তু শুরুতেই দেখা গেল বিপত্তি। পায়ে বল লেগে চোট পাওয়ায় আর কোনওদিন কবিগুরু মাঠমুখী হননি। সত্যেন্দ্রনাথ অবশ্য অনেক বয়সেও খেলেছেন এবং ভাল খেলতেন। কিন্তু কবি আর মাঠে নামেননি। ঐতিহাসিকদের মতে এটা সম্ভবত ১৮৯৮-৯৯ সালের ঘটনা।কিন্তু ইতিহাসের এই তথ্য নিয়েও জোর ঝামেলা রয়েছে । ৯/১/১৯৬২ তারিখে আনন্দবাজারেই প্রকাশিত দাশরথি ঘোষের লেখা চিঠি। সেই লেখায় দাশরথি দাবি করে বসলেন ‘কবিগুরুর ক্রিকেট খেলা’ নামে একটি প্রবন্ধ নাকি আগেই বেরিয়েছিল ‘বসুমতী’ পত্রিকায়। ক্রিকেটের প্রতি রবি ঠাকুরের ভালবাসা নিয়ে সেখানে লিখেছিলেন শ্রী ব্রহ্মণ্যভূষণ ও শ্রীমতী ক্ষমা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দুই লেখকের দাবি ছিল, বিশ্বকবি তৎকালীন বিহার ও অধুনা ঝাড়খন্ডে নাকি একটা ক্রিকেট ম্যাচে খেলেছিলেন! এবং সেই খেলায় নাকি সুভাস চন্দ্র বসুও অংশ নিয়েছিলেন। তথ্য বলছে ১৯৬১-৬২ সালে ‘বসুমতী’-র সম্পাদক ছিলেন প্রাণতোষ ঘটক। তিনি জানালেন ‘হতে পারে’ খোঁজখুঁজি শুরু হল। কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না।
পত্রদাতাকে চিঠি পাঠানো হল। কিন্তু তিনি আলাদা করে কিছু বললেন না। জিজ্ঞাসা করা হল প্রমথনাথ বিশীকেও। তিনি জানালেন যে, ‘গুরুদেব অনেক কিছুই করেছেন, ব্যাট হাতে মাঠে নামা আশ্চর্য কিছু নয়। কিন্তু অনিল চন্দের উপস্থিতির সাথে সেখানে কোচবিহারের যে মহারাজার কথা বলা হচ্ছে সেটা অসম্ভব।’
পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে ‘অদ্ভুতাচার্য্য’ ১২/২/১৯৬২ তারিখের পত্রিকায় এই প্রবন্ধ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলেন। অবশেষে অধ্যাপক বিমলকুমার চট্টোপাধ্যায় লেখক শঙ্করীপ্রসাদ বসুকে জোগাড় করে দিলেন সেই প্রবন্ধ। ১৩৬২ (১৯৫৫ সাল) বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসের ‘বসুমতী’ পত্রিকায় রবি ঠাকুর ও তাঁর ক্রিকেট প্রেম নিয়ে লেখা ছিল। কিন্তু এত খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল, সেই লেখাটি একটি কাল্পনিক রম্যরচনা। মোটেই আসল খেলা নয়।কিন্তু কিছু বিষয় খুব আকর্ষণীয়। দল দুটির নাম টেগোর ওয়ান্ডারার্স এবং প্রিন্সেস ইলেভেন। টসে প্রিন্সেস দল জেতে। দলনায়ক ‘পাতিয়ালা’ কবিকে বলেন ‘কবি আপনি টসে হারলেও আশা করি আপনি খেলায় জিতবেন।’
কবির দল ধুতি পরে নেমেছিল। প্রিন্সেস ইলেভেন দলে ছিলেন পাতিয়ালা, পতৌদি, দলীপ, ভিজি। উপস্থিত ছিলেন রাজকুমারী শর্মিলা, শেলী ও মনি বেন, পঞ্চশ্রী দেববর্মা, জংবাহাদুরের মেয়েরা, ধারদোয়ানের রাজকুমারী, গায়কোয়াড় কন্যা প্রভৃতি অভিজাতবর্গ।
যদিও বলা হচ্ছে পুরোটাই কল্পনা। কিন্তু সবটাই কি কল্পনা?১৯৬২ সালের ৩ জানুয়ারি আনন্দবাজারে জগদীশচন্দ্র রায়ের লেখা চিঠি প্রমাণ করে যে রবীন্দ্রনাথের ক্রিকেট খেলা পুরোপুরি কল্পনা নয়। চিঠিটার একটা অংশ শঙ্করীপ্রসাদ বসু ‘সারাদিনের খেলা’ বইয়ে উদ্ধৃত করেছেন। এর অংশবিশেষ ঠিক এরকম…
‘১৯নং স্টোর রোডের সামনেই মিলিটারী মাঠ। সেই মাঠের একপাশে তখনকার দিনের ভারত বিখ্যাত সাহেবদের ক্রিকেট ক্লাব। ঐ ক্লাবে ভারতীয়দের সভ্য হওয়ার কোনও উপায় ছিল না, তাঁরা যতই বড় হউন না কেন। কোনও একদিন ঐ ক্লাবের ক্রিকেট খেলা দেখে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মেজদাদাকে আবদার করে বসেন। সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ম্যানেজার ভোগেল এবং আমাকে ব্যাট, বল, নেট প্রভৃতি কিনতে পাঠিয়েছিলেন। ঐ সঙ্গে বলে দেন – ভারতীয় দোকান থেকে জিনিস কিনতে। আমরা এস্প্ল্যানেডের উত্তর দিকের দোকান থেকে সমস্ত জিনিস কিনে ফিরি। তার পরদিন থেকেই খেলা আরম্ভ হয়। সত্যেন্দ্রনাথ দুই জন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানকে মাইনে দিয়ে খেলা শিখাবার জন্য নিযুক্ত করলেন। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো থেকে প্রত্যহ খেলা দেখতে ও খেলতে আসতেন। রবীন্দ্রনাথের এই খেলা কিন্তু মোটেই ভাল লাগেনি। তার কারণ একদিন খেলতে গিয়ে একটা বল তাঁর পায়ে লাগে এবং তিনি জখম হন। তাছাড়া ক্রিকেট খেলার যা বিশেষ দরকার, তা তাঁর ছিল না। অর্থাৎ তিনি তাঁর মন ও চোখ ঠিক রাখতে পারতেন না। প্রায় তিন মাস পরে ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় খেলা লাঠি নিয়ে থাকতেন। তাঁর দাদা অবশ্য বৃদ্ধ বয়সেও ক্রিকেট খেলতেন।’
কাজেই তিনি যে খেলতেন, তা নিয়ে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ নেই, তবে এটা ঠিক কবে সে ব্যাপারে সঠিক কিছু জানা যায় না।
কিন্তু তার মানে কি এই যে বিশ্বকবি ক্রিকেটের খোঁজ খবর রাখতেন না ? এমনটা কিন্তু নয়। বৈশাখ ১৩১২-এ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অভ্যর্থনা করার জন্য একটা সভার আয়োজন করে । (মে ১৯০৫)। সেখানে বক্তৃতা দিতে এসে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আজ সাহিত্য-পরিষদ আমাদিগকে যেখানে আহ্বান করিয়াছেন তাহা কলেজ-ক্লাস হইতে দূরে, তাহা ক্রিকেট-ময়দানেরও সীমান্তরে, সেখানে আমাদের দরিদ্র জননীর সন্ধ্যা বেলাকার মাটির প্রদীপটি জ্বলিতেছে।’
কিন্তু এর থেকেও বড় কথাটা আগেই বলেছিলেন ‘দিনের পড়া তো শেষ হইল, তার পরে ক্রিকেট খেলাতেও না হয় রণজিৎ হইয়া উঠিলাম।’ ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ‘রণজিৎ’ বলতে তিনি রঞ্জি সিংজিকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। কারণ ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ সালের দিকে রঞ্জি সিংজি তাঁর সেরা ছন্দে ছিলেন। ১৯০৪ সালে মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে আটটি শতরান ও পাঁচটি অর্ধ শতরান করেছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের জনক।
যাঁদের মনে এখনও সন্দেহের দানা উদ্বেগ হচ্ছে তাঁরা জেনে রাখুন, সম্ভবত চৈত্র ১৩০৮-এ (অর্থাৎ মার্চ বা এপ্রিল ১৯০২) কবি গুরু একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন, নাম ‘বারোয়ারি-মঙ্গল’। সেই প্রবন্ধে লিখেছেন “রামমোহন রায় আজ যদি ইংলণ্ডে যাইতেন তবে তাঁহার গৌরব ক্রিকেট খেলোয়াড় রঞ্জিত সিংহের গৌরবের কাছে খর্ব হইয়া থাকিত।’
বক্তৃতা ও প্রবন্ধ ছাড়াও ‘চিরকুমার সভা’ -র দ্বিতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যে কবিগুরু বলেছেন, ‘তোমরা যে দিনরাত্রি ফুটবল টেনিস ক্রিকেট নিয়ে থাক, তোমরা একবার পড়লে ব্যাট্বল গুলিডাণ্ডা সবসুদ্ধ ঘাড়-মোড় ভেঙে পড়বে। ‘বিশ্বকবির ক্রিকেট প্রেমের খোঁজ তাঁর বিখ্যাত ‘গোরা’ উপন্যাসেও দেখতে পাওয়া যায়। রবীন্দ্র রচনাবলীর ষষ্ঠ খণ্ডে লেখা আছে, ‘এখানকার মেলা উপলক্ষেই কলিকাতার একদল ছাত্রের সহিত এখানকার স্থানীয় ছাত্রদলের ক্রিকেট-যুদ্ধ স্থির হইয়াছে। হাত পাকাইবার জন্য কলিকাতার ছেলেরা আপন দলের মধ্যেই খেলিতেছিল। ক্রিকেটের গোলা লাগিয়া একটি ছেলের পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। ‘
সেই খণ্ডের কিছু আগে তিনি ফের বলেছিলেন, ‘ধাপার মাঠে শিকারির দলে নন্দর মতো অব্যর্থ বন্দুকের লক্ষ কাহারো ছিল না। ক্রিকেট খেলায় গোলা ছুঁড়িতেও সে অদ্বিতীয় ছিল। গোরা তাহার শিকার ও ক্রিকেটের দলে ভদ্র ছাত্রদের সঙ্গে এই-সকল ছুতার-কামারের ছেলেদের একসঙ্গে মিলাইয়া লইয়াছিল।’
ব্যাটবলের কথা কবির ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসেও ছিল। লিখেছিলেন, ‘বিপ্রদাস বাল্যকালে যে ইস্কুলে পড়ত সেই ইস্কুলেরই সংলগ্ন একটা ঘরে বৈকুণ্ঠ ইস্কুলের বই খাতা কলম ছুরি ব্যাটবল লাঠিম আর তারই সঙ্গে মোড়কে-করা চীনাবাদাম বিক্রি করত।’
একশো বছর পর গত ২০১৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে কবির গান বেজেছে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে।
আজ কবির ১৬১-তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা নিবেদন- ‘তোমারে স্মরণ করি আজ এই দারুন দুর্দিনে হে বন্ধু , হে প্রিয়তম’।
❤ Support Us









