- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৫
লাদাখে দাবানলের চেহারা নিচ্ছে ‘গণআন্দোলন’! পাল্লা দিয়ে চলছে পুলিশি ধরপাকর, তদন্তের মুখে সোনম ওয়াংচুক। কার্গিল, লেহ-তে চলছে কারফিউ
লাদাখে ষষ্ঠ তফসিল ও রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে জারি থাকা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আচমকাই রূপ নিয়েছে রক্তাক্ত সংঘর্ষে। বুধবার লেহ শহরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কার্যালয় ঘিরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ৪ জন। আহত প্রায় ৮০, যার মধ্যে ৪০ জন পুলিশকর্মী। সংঘর্ষের জেরে পুরো লেহ-তে জারি হয়েছে কার্ফু, আটক করা হয়েছে অন্তত ৫০ জনকে। এ অবস্থার মধ্যে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ব্যুরো তদন্ত শুরু করেছে পরিবেশ ও শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, তাঁর প্রতিষ্ঠিত হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অফ অলটারনেটিভস লাদাখ-এর বিদেশি অনুদান সংক্রান্ত নথিতে গরমিল রয়েছে। পাশাপাশি, চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর পাকিস্তান সফরও রয়েছে গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানের আওতায়। একদিকে যখন গোটা লাদাখ জুড়ে রাজ্যের মর্যাদা ও ষষ্ঠ তফসিলের দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, ঠিক তখনই ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলেই মনে করছে লেহ অ্যাপেক্স বডি এবং কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স।
ওয়াংচুক গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অনশনে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরও ১৫ জনের একটি দলও অনশনে অংশ নেয়। মঙ্গলবার তাঁদের মধ্যে দুইজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আন্দোলন আরো তীব্র হয়। লেহ অ্যাপেক্স বডি-র যুব শাখা রাস্তায় নামে, বিজেপির কার্যালয়ের দিকে মিছিল এগোতেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা প্রথমে গাড়ি ভাঙচুর করে, পরে আগুন লাগিয়ে দেয়। বাধ্য হয়েই পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে, লাঠিচার্জ করে। পুলিশের বিরুদ্ধে গুলি ছোড়ারও অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংসতা উসকে দিয়েছে। কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স-এর সহ-সভাপতি আসগর কারবালাই বলেছেন, ‘যেখানে গত ৫ বছর ধরে আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালাচ্ছি, সেখানে হঠাৎ করে পুলিশ গুলি চালিয়ে ৪ জনকে মেরে ফেলল। এটা কি গণতন্ত্র?’
এদিকে ওয়াংচুকের এক বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক আরো ঘনিভূত হয়েছে। অভিযোগ, তিনি তাঁর অনশন চলাকালীন ‘আরব বসন্ত’ এবং ‘নেপালের জেনারেশন জেন-জি আন্দোলন’-এর প্রসঙ্গ টেনে সাধারণ মানুষকে উসকেছেন। কেন্দ্র বলছে, এসব ইঙ্গিত করে যে আন্দোলন পরিকল্পিত এবং আন্তর্জাতিক আদলে অনুপ্রাণিত। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দাবি, ‘ওয়াংচুকের বক্তব্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল। এইচপিসি-র অধীনে যখন সরকার ও লাদাখি প্রতিনিধিদের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা চলছিল, তখন এ ধরনের উসকানি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ যদিও, জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ বলেন, ‘ওয়াংচুক কখনোই সহিংসতায় বিশ্বাস করেন না। তিনি গান্ধীবাদী। কিন্তু আজকের যুব সমাজ তাঁর কথা শুনছে না। সরকারকে বলছি, দমননীতি বন্ধ করুন। সংলাপের পথেই সমাধান হোক।’ ওমর আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘লাদাখকে কখনো রাজ্য মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি, তারা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পেয়ে খুশি ছিল। এখন তারাও প্রতারিত বোধ করছে। জম্মু-কাশ্মীরের সাথে ঘটে চলা অন্যায় আর বঞ্চনার কথা বুঝতে পারছেন।’ বুধবার এক ভার্চুয়াল সাংবাদিক সম্মেলনে ওয়াংচুক বলেছিলেন, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে, আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন এমন হিংস্র পথে যাবে। স্কুলের মেয়েরা, কলেজ ছাত্রছাত্রী, এমনকি ভিক্ষুরাও ছিল মিছিলে। কীভাবে পরিস্থিতি এভাবে বদলে গেল, কেউ জানে না।’
বিরোধী দলগুলির দাবি, সরকার রাজ্যের মর্যাদার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি বলেই এই পরিস্থিতির উদ্ভব। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা বলেছেন, ‘২০১৯ সালে সংসদে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল শান্তি ফিরবে। আজ ৬ বছর পর লাদাখে রক্ত ঝরছে। এটা বিজেপি সরকারের নিজের তৈরি সংকট।’ বাম দলগুলিও মোদি সরকারের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে বলেছে, ‘জনগণ প্রতারিত হয়েছে। দলীয় কার্যালয় আক্রমণ সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু তার পিছনে যে ক্ষোভ জমে আছে, সেটাও উপেক্ষা করা যায় না।’
বর্তমানে লেহ শহরে ১৬৩ ধারা জারি, পাঁচ জনের বেশি জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা। কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স বন্ধ ডেকেছে । লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর কাভিন্দর গুপ্ত নিরাপত্তা পর্যালোচনা বৈঠক ডেকে কড়া নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে — শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের হঠাৎ এই বর্ণচোরা রূপ কেন? সরকার কি সত্যিই কথা রাখেনি? না কি পরিস্থিতিকে সুচতুরভাবে ঘোলাটে করা হচ্ছে? উত্তর এখনও অন্ধকারেই।
❤ Support Us







