- বি। দে । শ
- জুলাই ২২, ২০২৫
বিমান বিধ্বস্ত ঢাকায়, মৃত্যুমিছিল অব্যহত। মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৭, আহত কমপক্ষে ১৭০। প্রশ্ন উঠছে চিনা যুদ্ধবিমান ঘিরে
ঢাকার মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ২৭ জন। নিহতদের মধ্যে ২৫ জনই শিশু। যাঁদের অধিকাংশের বয়স ১২-এরও নিচে। আর বাকি ২ জন—একজন বিমানটির পাইলট এবং অপরজন মাইলস্টোন স্কুলের এক শিক্ষিকা। আহত হয়েছেন অন্তত ১৭০ জন। যাঁদের অনেকেই এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে। মঙ্গলবার সকালে ঢাকার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এক সাংবাদিক বৈঠকে চিকিৎসক ড. মহম্মদ সায়েদুর রহমান জানান, ‘ইতিমধ্যেই ২০টি দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৬টি দেহ এতটাই পুড়ে গিয়েছে যে শনাক্ত করা যায়নি। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার দুপুর ১টা ৬ মিনিটে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি থেকে ওড়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি ‘এফটি-৭ বিজিআই’ মডেলের যুদ্ধবিমান। এটি চিনের তৈরি প্রশিক্ষণ বিমান, এদিন মাটি ছাড়ার ১২ মিনিটের মধ্যেই বিমানটিতে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয়। পাইলট চেষ্টা করেন জনবসতিহীন কোনো এলাকায় নামাতে। পারেননি। তার আগেই বিমানটি ভেঙে পড়ে স্কুলের ভবনের উপর। যেখানে বিমানটি আছড়ে পড়ে, সেখানে ছিল স্কুলের প্রাথমিক বিভাগ। মোট ১৬টি ক্লাসরুম ও শিক্ষকদের ৪টি ঘর। ক্লাস চলাকালীনই বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে যায় গোটা ভবনটি। অনেক পড়ুয়া ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। আগুনে দগ্ধ হয় বহু শিশু। ঘটনাস্থলে ছুটে আসে দমকলের আটটি ইঞ্জিন। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে আগুন নেভানোর লড়াই। এরপর শুরু হয় উদ্ধারকাজ।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্কুলের সামনে ভিড় জমে অভিভাবকদের। কারও মুখে আতঙ্ক, কারও চোখে জল। ‘আমার ছেলে কোথায়?’, ‘ক্লাসে ছিল তো! বেরিয়ে এল না কেন?’— শোক চিৎকারে ফেটে পড়ছিলেন মা-বাবারা। কেউ স্কুলের ভিতরে ছুটছেন, কেউ অ্যাম্বুল্যান্সে সন্তানকে খুঁজছেন। কেউ হাসপাতালে গিয়ে দেহ শনাক্ত করতে চাইছেন, কেউ আবার অপেক্ষায়—হয়তো এক্ষুণি একটা খবর আসবে! হাসপাতাল সূত্রে জানা যাচ্ছে, চিকিৎসাধীনদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বার্ন ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, রক্তের চাহিদা মেটাতে অনেকেই রক্তদান করছেন। তবে বিরল গ্রুপের জন্য আলাদা আবেদন জানানো হয়েছে। প্রতিবেশী দেশের মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোমবার রাতে এক্স-হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, ‘ঢাকায় বিমান দুর্ঘটনায় বহু তরুণ প্রাণ হারানোর খবর শুনে ব্যথিত। ভারত বাংলাদেশের পাশে আছে। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি।’
বাংলাদেশে এরকম দুর্ঘটনা, এই প্রথম নয়। ২০১৮ সালে মধুপুরে এবং ২০২১ সালে চট্টগ্রামে একই মডেলের বিমান ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয়েছিল পাইলটদের। ‘এফটি-৭ বিজিআই মডেলের এই বিমানটি মূলত চিনের তৈরি। বাংলাদেশ ২০১৩ সালে চিন থেকে প্রথম এই যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করে। সেনা প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত এই বিমান নিয়ে আগেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি নিউইয়র্কভিত্তিক ‘এয়ারফোর্স টেকনোলজি‘ ওয়েবসাইট জানাচ্ছে, ২০১৩ সালেই এই মডেলের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার তদন্তে নেমেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। গঠন করা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। উঠে আসছে একাধিক প্রশ্ন—কেন বারবার একই মডেলের বিমান দুর্ঘটনায় পড়ছে? প্রশিক্ষণ চলাকালীন বিমান জনবহুল এলাকায় কেন ওড়ানো হচ্ছিল? প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিতরে কোনো গাফিলতি লুকিয়ে আছে কি? প্রশ্ন থাক, তার থেকেও বড় হয়ে উঠেছে নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলোর কান্না। ওই ছোট্ট ক্লাসরুমগুলো, যেখান থেকে প্রতিদিন হাসি আর স্বপ্ন উড়ে যেত, সেখানেই আজ চাপা পড়ে রয়েছে মৃত্যু আর বিষাদের ছায়া। ‘ক্লাসে ছিল… এখন কোথায়?’—এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো আর কোনোদিন পাবেন না তাঁরা।
❤ Support Us








