- এই মুহূর্তে দে । শ
- মার্চ ১৭, ২০২৬
বাংলার দু-দফার ভোটে নজিরবিহীন কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন, কড়া নজরদারিতে কমিশন
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে মাঠে নেমে পড়ছে রাজনৈতিক দলগুলো। দিন যত এগোবে, বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে, আইন-শৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করতে চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশনও। ‘এসআইআর’-এর বিতর্কের মাঝে এই মুহূর্তে বঙ্গে সুষ্ঠভাবে ভোট করাতে মরিয়া জ্ঞানেশ কুমারের টিম। এরইমাঝে ও ভোটারদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে এক অভূতপূর্ব প্রস্তুতির ইঙ্গিত মিলল নির্বাচন কমিশনের তরফে।
২৩ ও ২৯ এপ্রিল; দু–দফার ভোটে প্রতিটি পর্যায়ে প্রায় ২,২০০ থেকে ২,৫০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন হতে পারে বলে জানিয়েছেন, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল। সাম্প্রতিক কালে তো বটেই, রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসেও এত পরিমাণ বাহিনী মোতায়েনের নজির নেই বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক জানান, বুথভিত্তিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে এলাকা দখলমুক্ত রাখা, নাকা তল্লাশি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনী— সব ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা হবে মুখ্য।
মনোজ আগরওয়াল জানান, ‘প্রতিটি বুথের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ ভাবে সিআরপিএফ জওয়ানদের উপরেই ন্যস্ত থাকবে।’ নির্বাচন কমিশনের হিসাব বলছে, বুথের সংখ্যা এবং নির্দিষ্ট মোতায়েনের সূত্র ধরেই এই বিপুল সংখ্যক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা নির্ধারিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন এ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সিআরপিএফ, বিএসএফ, সিআইএসএফ, আইটিবিপি, এসএসবি, এনএসজি ও অসম রাইফেলস। কমিশন সূত্রে খবর, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় বাহিনী পাঠানোর বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে।
২০২১ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা টানলে এবারের প্রস্তুতির ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট হয়। সে বার ৮ দফায় ভোট হয়েছিল, এবং এক দফায় সর্বাধিক মোতায়েন ছিল প্রায় ১,১০০ কোম্পানি। কিন্তু এ বার দুই দফার প্রতিটিতেই সে সংখ্যাকে প্রায় দ্বিগুণ ছুঁয়ে ফেলতে পারে কেন্দ্রীয় বাহিনী, যা কার্যত নজিরবিহীন। নিরাপত্তার পাশাপাশি নজরদারিতেও থাকছে কড়াকড়ি।
কমিশনের নির্দেশ, ভোটের এক-দুদিন আগে বুথে পৌঁছনো সিআরপিএফ জওয়ান ও ভোটকর্মীর ছবি নথিভুক্ত করা হবে, যাতে নির্দিষ্ট বুথ কার দায়িত্ব তা স্পষ্ট থাকে। ওয়েবকাস্টিং ক্যামেরায় কারচুপি, ইভিএমে অনিয়ম বা বুথের ভিতরে অযাচিত ভিড়— এ ধরনের কোনো অভিযোগ উঠলে সরাসরি জবাবদিহি করতে হবে সংশ্লিষ্ট জওয়ানদেরই। অতীতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীদের একাধিক অভিযোগের প্রসঙ্গও এ দিন এড়িয়ে যাননি আগরওয়াল। তাঁর বক্তব্য, ‘এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে কমিশন সম্পূর্ণ অবগত। ঊর্ধ্বতন সেনাকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কোনো রকম গাফিলতি বা পক্ষপাতিত্ব বরদাস্ত করা হবে না। দোষ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কমিশনের কড়াকড়ির ইঙ্গিত মিলেছে প্রশাসনিক স্তরেও। মাঠপর্যায়ের কর্মী-অধিকর্তাদের জানানো হয়েছে, ভোট পরিচালনায় কোনও অনিয়ম ধরা পড়লেই ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা হবে। প্রয়োজনে সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৩১১’ (যেখানে জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে।) -এর অধীনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। এমনকি পুনর্ভোটের ক্ষেত্রেও কড়া অবস্থানে কমিশন। আগরওয়াল জানান, ‘কোনো বুথ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে বা গুরুতর অভিযোগ উঠলে পুনর্ভোট ঘোষণা করতে কমিশন এক মুহূর্তও দেরি করবে না।’ ক্যামেরা বিকল হওয়া, ভোটারদের ভয় দেখানো বা বুথে অযাচিত ভিড়— এ সব পরিস্থিতিকেই সম্ভাব্য পুনর্ভোটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়েও জোরকদমে কাজ চলছে। প্রায় ৬০.০৬ লক্ষ আবেদন বিচারাধীন রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২০ লক্ষের নিষ্পত্তি সোমবার রাতের মধ্যেই হয়ে যেতে পারে বলে আশা কমিশনের। কমিশন জানিয়েছে, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দফতর থেকে তালিকা পেলেই তা চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কমিশনের লক্ষ্য, প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখের আগেই সমস্ত আবেদন নিষ্পত্তি করা। তবে প্রশাসনিক সূত্রের একাংশের মতে, বিপুল সংখ্যক আবেদন এবং সীমিত সময়ের কারণে ৯ এপ্রিলের মধ্যে সব ক–টি মামলার নিষ্পত্তি করা সহজ হবে না। ফলে শেষ মুহূর্তে ভোটার তালিকা ঘিরে চাপানউতোরের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ভোটের নির্ঘন্ট ঘোষণার পরই শুরু হয়ে গেছে বুথ পরিদর্শন। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ইতিমধ্যেই মোতায়েন কার হয়েছে বাহিনী । কাটোয়া বিধানসভার হরিপুর গ্রাম ও লাগোয়া এলাকার ৫টি বুথ পরিদর্শন করলেন কাটোয়া থানার আধিকারিকের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। স্পর্শকাতর বুথ এলাকার পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখলেন। ভোটারদের মনোবল বাড়াতেই গ্রামে আধা সামরিক বাহিনির টহল শুরু হল বলে জানালেন জওয়ানরা। গ্রামের পুরুষ ও মহিলাদের সঙ্গে কথাও বলেন তারা। আশ্বস্ত করেন।
পূর্ব বর্ধমান জেলার ১৬টি বিধানসভায় ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। ভোট পরিচালনার জন্য ১৯টি মনিটরিং কমিটি তৈরি হয়েছে। সমাজমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমেও নজরদারি থাকবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী জেলায় ভোটারের সংখ্যা ৩৯,৫৮,৬৬২ জন। ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের সংখ্যা ৩,৫৩,৬০৮ জন। জেলাজুড়ে এ পর্যন্ত ৮০ হাজার ভোটারের ভবিষ্যৎ ‘নিষ্পত্তি’ হয়েছে। তবে তাদের নাম ভোটার তালিকায় থাকবে কিনা, তা জানা যাবে সাপ্লিমেন্টরি তালিকা প্রকাশের পর। বুথের ভিতরের পরিস্থিতিও দেখেন। বরুণ মাঝি নামে এক গ্রামবাসী জানালেন, ‘পাড়ায় পাড়ায় কেন্দ্রীয় বাহিনি টহল দেওয়ায় আমরা খুশি। সবাই যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে, সে ব্যাপারে পুলিশ ও জওয়ানরা আমাদের আশ্বস্ত করলেন।’
❤ Support Us







