Advertisement
  • Uncategorized ধা | রা | বা | হি | ক
  • এপ্রিল ১৭, ২০২২

অন্য ভাষা ভিন্ন স্বর

পাক্ষিক ধারাবাহিক পর্ব ১০

অংশুমান কর
অন্য ভাষা ভিন্ন স্বর

   গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকে, বিদেশি ভাষার বহু স্বর, বহু সুর, নানা রকম ভাষাভঙ্গি আর বহুমাত্রিক বিষয়ের সংযোজনে ঋদ্ধ হয়েছে আমাদের কবিতা পাঠের মগ্ন চেতনা। কিন্তু এই উপমহাদেশের উত্তর আর দক্ষিণ, পূর্ব আর পশ্চিমের কবিতা, কবিতা ভাবনা দূরে পড়ে রইল এখনও । কেন ? ভারতীয় ভাষাচর্চায় অনীহা, না এক প্রতিবেশীর সঙ্গে আরেক প্রতিবেশীর, আরোপিত প্রকান্তরে অনুশাসিত দূরত্বই তৈরি করেছে অপরিচিতির চৌহদ্দি ? যুক্তিপ্রসূত জিজ্ঞাসা নিয়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষার কবিতার ধারাবাহিক তরজমায় প্রতিস্পর্ধী, সমান্তরাল চিন্তার বিশিষ্ট সহযোগী অংশুমান কর

 

থাংজম ইবোপিশক

থাংজম মণিপুরি কবিতার এক প্রধান কবি। ইম্ফলের একটি কলেজে তিনি মণিপুরি সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর কবিতা ভীষণভাবে রাজনৈতিক, দল-নিরপেক্ষ, বিদ্রুপময়। প্রকৃতি ও প্রেমও অনেক সময়ই তাঁর কবিতার দুই অক্ষ হয়ে উঠেছে। পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, মণিপুর স্টেট কলা আকাদেমি পুরস্কার এবং মণিপুর স্টেট অ্যাওয়ার্ড। কবিতার পাশাপাশি তিনি ভাস্কর্য নিয়েও চর্চা করেন ।

 

কবিতা

এ দেশে আজ
কেউ জোরে কথা বলতে পারে না,
কেউ প্রকাশ্যে ভাবতে পারে না।
তাই, কবিতা,
যেভাবে একটা ফুলের সঙ্গে খেলি, সেভাবেই তোমার সঙ্গে খেলি।

আমার চোখের সামনে, একটা ঘটনার পর আর একটা ঘটনা ঘটে যায়,
অবিশ্বাস্য, চুল খাড়া করে-দেওয়া।
হাঁটছি কিন্তু ঘুমিয়ে রয়েছি,
চোখ খোলা কিন্তু স্বপ্ন দেখছি,
দাঁড়িয়ে রয়েছি কিন্তু দুঃস্বপ্ন দেখছি,
স্বপ্নে, বাস্তবে,
কেবল ভয়ংকর, চুল খাড়া করে-দেওয়া ঘটনা।
তাই আমার চারপাশের ঘটনাকে এড়িয়ে, চোখ বন্ধ করে,
কানে তালু দিয়ে,
স্রেফ একটা মাটির বস্তুর ছাঁচে হৃদয়টাকে গড়ে নিয়ে
আমি ফুলেদের সম্পর্কে কবিতা লিখছি।

এ দেশে আজ
একজন মানুষের উচিত কেবল ফুলেদের সম্পর্কে ভাবা,
ফুলেদের স্বপ্ন দেখা,
আমার ছোট্ট সোনাটার জন্য, আমার স্ত্রীর জন্য,
আমার চাকরির জন্য,
বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য।

 

মেড ইন ইন্ডিয়া

আমি ভারতকে ভালোবাসি।
প্রিয় ভারতবর্ষ, যদিও আমি
তোমার ব্লাউজ হতে পারিনি,
আমাকে তোমার ব্রেসিয়ার হতে দাও;
একটু বেশি টাইট, যেন কারাগারে বন্দি
শ্বাস নিতে পারছে না—
প্লিজ, আমাকে ওদের ভার বহন করতে দাও।

কেবল ব্রেসিয়ারের কাপড়টা হতে হবে খাদির
যেন বানানো হয় ভারতে
আর বানায় বিড়লা ভাই।

 

শিশুদের বাজার

একটি শিশু বিক্রি করতে চাই
একটি শিশু বিক্রি করতে চাই
একটি শিশু বিক্রি করতে চাই

মৃত না জীবিত?
পচা না টাটকা?

বাচ্চাটা এখনও লাফাচ্ছে
ওর শরীরটা এখনও খুবই টাটকা
ওর শরীরটায় গেঁথে গিয়েছিল মাত্র একটা বুলেট;
এর চেয়ে আরও বেশি টাটকা
আর কিছুই পাবে না, বন্ধু

 

ওই টিয়াপাখিগুলো

আমি যখন ছোটো ছিলাম
শীতকালে
দেখতাম সারি দিয়ে টিয়াপাখিরা উড়ে যাচ্ছে
টিট্‌-টিট্‌-টিট্‌-টিট্‌ করে, স্নেহময় ডাক ডাকতে ডাকতে।
আমার পড়শির শিলিলিমা গাছের উঁচু ডালে বসে, ওরা ওই গাছটার ফল খেত;
আমাদের সবজির বাগানের কোণে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে-থাকা
কউবুলিয়া গাছটায় ওরা রাত কাটাত।

এখন
শীত বা গ্রীষ্ম, কোনও ঋতুতেই
ওই টিয়াপাখিগুলো আর আকশে উড়ে বেড়ায় না;
ওরা গলিতে আর বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে
সারিবদ্ধ ভাবে ওরা মাটির ওপর হাঁটে।
গর্ত আর ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে ওরা গুঁড়ি মেরে চলে
এসএলআর আর একে ফর্টি সেভেন হাতে
মেশিন গান বসাতে বসাতে—
ওরা এমনকি আর ফলও খায় না, ওরা শিশুদের খায়।

 

আমার জন্মদিনে

আজ আমার
আটান্নতম জন্মদিন।
‘তুমি কেমন আছ ইবোবিবাবু,
কোন গভীর ভাবনা নিয়ে নিবিড়ভাবে চিন্তা করছ?’
একজন বন্ধু জিজ্ঞেস করল।

আমি আর কিছুই ভাবি না
আমি আর কিছুই অনুভব করি না
কোনও পরিবর্তন নেই, কিছুই বদলায়নি।
বাতাস বয় না, এমনকি পাতারাও কাঁপে না,
ধারাপাশে পাখিদেরও দেখা যায় না,
সমস্তকিছুই শূন্য, পরিত্যক্ত, নীরব
এবং ভেতরের এই অসুখ কোনওদিন সারবে না।

একটা ফ্রেম বানিয়ে
আমার ঘরের ছোট্ট জানলাটা
খোলা আকাশকে ঢেকে দিয়েছে।
একটা ছোট্ট টিকটিকি আমার ঘরের দেওয়াল বেয়ে উঠছে
আবার দেওয়াল বেয়ে নামছে;
উঠছে আর নামছে
সময়ের নিয়মিত ব্যবধানে।
আমি ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে ওর গতিবিধি লক্ষ করি
ওর উদ্দেশ্য কী?
আমার জন্মদিনে
অন্তত আমি এই টিকটিকিটার একটা নাম দিতে চাই।
আমি কি ওর নাম দেব শ্রীইবোপিশক সিং?

♦–♦♦–♦♦–♦

 


❤ Support Us
error: Content is protected !!