Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক
  • জানুয়ারি ৩০, ২০২২

অন্য ভাষা ভিন্ন স্বর

পর্ব-২

অংশুমান কর
অন্য ভাষা ভিন্ন স্বর

চিত্র: সংগৃহীত

annya-bhasa-bhinnya-swr


গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকে, বিদেশি ভাষার বহু স্বর, বহু সুর, নানা রকম ভাষাভঙ্গি আর বহুমাত্রিক বিষয়ের সংযোজনে ঋদ্ধ হয়েছে আমাদের কবিতা পাঠের মগ্ন চেতনা। কিন্তু এই উপমহাদেশের উত্তর আর দক্ষিণ, পূর্ব আর পশ্চিমের কবিতা, কবিতা ভাবনা দূরে পড়ে রইল এখনও । কেন ? ভারতীয় ভাষাচর্চায় বাঙালির অনীহা, না এক প্রতিবেশীর সঙ্গে আরেক প্রতিবেশীর, আরোপিত প্রকান্তরে অনুশাসিত দূরত্বই তৈরি করেছে অপরিচিতির চৌহদ্দি ? যুক্তিপ্রসূত জিজ্ঞাসা নিয়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষার কবিতার ধারাবাহিক তরজমায় প্রতিস্পর্ধী, সমান্তরাল চিন্তার বিশিষ্ট সহযোগী অংশুমান কর


কেদারনাথ সিংহ

হিন্দি ভাষার অন্যতম প্রধান কবি কেদারনাথ সিংহ (১৯৩৪-২০১৮) । জন্ম উত্তরপ্রদেশের এক গ্রামে । বেনারস শহরে কেটেছে জীবনের দীর্ঘ পর্ব । জেএনইউ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব অধ্যাপক সাহিত্য অকাদেমির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন । পেয়েছেন জ্ঞানপীঠ ও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ।
সাহিত্য সমালোচকেরা তাঁর কবিতায় খুঁজে পেয়েছেন নেরুদা আর পল এলুয়ারের প্রভাব । কালিদাস, সুরদাস, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নিরালা, বোদল্যের, অডেন, ডিলান টমাসের কাব্যধারা তাঁকে প্রভাবিত করেছে কাব্য চর্চায়, একথা তিনি লিখেছেন নানা প্রসঙ্গে ।

 

হাত

যেই আমি তার হাতটা
আমার হাতের মধ্যে নিলাম
অমনি আমার মনে হল পৃথিবীর হওয়া উচিত
সুন্দর আর উষ্ণ ঠিক একটা হাতের মতো

 

কাঠুরিয়া ও পাখি

কাঠের গুঁড়িগুলোকে চেরাই করছিল লোকটা
স্যাঁতস্যাঁতে জঙ্গলে
অনেকগুলো রাত কাটাবার পরে
লোকটা ঠিক করেছিল যে, এই কাজটা ও করবে
তাই এখন কাঠের গুঁড়িগুলোকে চেরাই করছে লোকটা

গুঁড়িটার শেকড়গুলোর ভেতরে
প্রায়ই পথ হারিয়ে ফেলছিল লোকটার করাত
প্রায়ই আটকে যাচ্ছিল
গুঁড়িটার ঘুমের মধ্যে
একটা পাখির বাসায়

গুঁড়িটার ভেতরে
লোকটা অনুভব করতে পারছিল
একটা কাঠবিড়ালির লেজের ঝিকিমিকি
শুনতে পাচ্ছিল গর্জন
একটি বাঘিনীর বাচ্চাগুলো ঘুমোচ্ছিল
গুঁড়িটার ভেতর
একটি পাখি
যে বীজটাকে সে ঠোকরাচ্ছিল
সেই বীজটাকে হারিয়ে ফেলেছিল
গুঁড়িটার ভেতরে
প্রত্যেকটি আঘাতে লোকটার করাত
কাঠের শস্যদানার ভেতর থেকে
টেনে বের করে আনছিল বীজটাকে
আর করাতের দাঁত থেকে
বীজটা খসে পড়ছিল
আর অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল

লোকটা কাঠ চেরাই করছিল
আর করাতের দু’পাশে
দু-টি পাটার মতো
ভেঙে পড়ছিল পৃথিবী

বীজটা
গুঁড়িটার বাইরে ছিল না
আর তাই পাখিটা নিশ্চিত ছিল যে
কাঠটার ভেতরেই কোথাও একটা বীজটা তখনও রয়েছে

লোকটা কাঠ চেরাই করছিল
কাঠটার ভেতরে
কোথাও একটা ছিল পাখিটা

চিৎকার করছিল

 

বাঘ

ওরা ভয় পায় যে একদিন
বাঘ এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে
এমন একদিন আসবে
যখন দিন বলে কিছু থাকবেই না
আর পৃথিবীর সমস্ত বাঘেরা
ছোটোদের বইয়ের ভেতরে হারিয়ে যাবে

এই ভয়টা আমিও পাই
কিন্তু আমার অন্য একটা ভয় আছে
যে কোনও বাঘের চেয়েও সেই ভয়টা অনেক বেশি ঝকঝক করে
হাত গুলো কোথায় থাকবে

বই পড়বে যে-চোখগুলো কোথায় থাকবে তারা
বই ছাপার জন্য ছাপাখানা গুলো থাকবে কোথায়
টাইপ গুলোকে ঝুলিয়ে রাখার জন্য
শহরগুলোই বা থাকবে কোথায়
কোথায় থাকবে কাগজ
যার ওপরে ঝাঁপাতে থাকা নাচতে থাকা PPLE-এর আগে
A অক্ষরটি বসবে
বাতাস যে অক্ষরগুলোর উচ্চারণ শুনবে
আর স্মৃতিতে ধরে রাখবে
একটা নিখুঁত সম্পূর্ণ শব্দ হিসেবে
পাতাগুলো যে শব্দটাকে আবৃত্তি করবে
আর যে আবৃত্তি পৃথিবীর
অদৃশ্য তারের মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়ে
হাসপাতালে জানলার পাশে
শুয়ে থাকা মৃত্যুপথযাত্রী লোকটির ঠোঁটে পড়ে
হয়ে যাবে জীবনের গান

আমার একটা ভয় আছে
খুব সরল সাদামাটা একটা ভয়
সেটা হল এই যে, ভয়ই বা তখন থাকবে কোথায় ?

 

লোকটাকে দেখো

রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে যে লোকটা তাকে দেখো
আমি জানি না
সে কোথা থেকে আসছে
এটাও বলা খুবই কঠিন
সে কোথায় যাচ্ছে ।

কিন্তু এইটুকু অন্তত পরিষ্কার যে–
লোকটা রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে
আর হাঁটতে হাঁটতে লোকটা ওপারে যেতে চায়
এক পা তোলা

অন্য পা-টি উঠবে বলে অপেক্ষা করছে
আমি শুনতে পাচ্ছি
তোলা হয়েছে যে পা-টি
সে অন্য পা-টি কে বলছে–
‘তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি–এটা একটা রাস্তা’
আর রাস্তা হচ্ছে সেই রকম একটা জিনিস
যেটা সারাক্ষণ একটা জায়গায় শুয়েই থাকে
আর যেহেতু রাস্তা কখনওই নড়াচড়া করে না
প্রত্যেকটি মানুষকে প্রতিবার
তার নিজের রাস্তাটি পার হতে হয়
প্রতিবার শুরু করতে হয় একটি নতুন সূচনা বিন্দু থেকে
তাই যে লোকটা রাস্তা পার হবে বলে অপেক্ষা করছে
সে সম্ভবত তিন হাজার তিনশ সাঁইত্রিশ বারের জন্য এই রাস্তাটা পার হচ্ছে
হতে পারে যে এই একই রাস্তা ধরে আর একবার
আগামীকাল সে এই রাস্তাটাই পার করবে
হয়তো রাস্তাটা পার করবে আবার তার পরের দিনও
এবং এটাও সম্ভব যে ভবিষ্যতে অগণিত বছর ধরে
সে ওই রাস্তাটা বার বার পার করবে
এবং সে বারবার পার করতেই থাকবে
আর অন্য কোনও নয়
ওই একটাই রাস্তা

দেখো–দেখো–
লোকটা এখনও ওখানে দাঁড়িয়ে আছে
আগ্রহী এবং ক্রুদ্ধ
আর এটা দেখে ভালো লাগছে–ভালো লাগছে–আমার

মানুষকে রাস্তা পার হতে দেখলে
আমার সব সময় ভালো লাগে
রাস্তা পার হচ্ছে মানুষ এই দৃশ্য
আমাকে এক ধরনের আশা দেয়
মনে হয়, রাস্তার এই পারে যে পৃথিবীটা আছে
হতেই পারে যে
ওই পারে সেই পৃথিবীটা আর একটু খানি ভালো


❤ Support Us
error: Content is protected !!