- ধা | রা | বা | হি | ক
- ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২২
কয়েকটি প্রেমের গল্প: |পর্ব ৩৫|
জীবনের রোজনামচায় আকস্মিক তার আগমন। স্থায়িত্বে কোথাও সে পূর্ণাঙ্গ, আবার কোথাও অসম্পূর্ণ। রূপক এ নয়, নানান জীবনচর্যায়, সেই পূর্ণ অপূর্ণের রূপ নিয়ে দেবপ্রিয় চক্রবর্তীর ধারাবাহিক কথামালা...
অলঙ্করণ: দেব সরকার
ভাল রাজপুত্র ও রাতের ছাত
জয়িতা
পাশে শুয়ে থাকা জয়িতার কোমরের ওপর একটা পা তুলে, ছোট ছোট হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে পিউ বলল, -‘তুমি সত্যি পরশু চলে যাবে জিত্তাদি?’
নিজের নামের এই অদ্ভুত অপভ্রংশ পিউয়ের মুখে আধো আধো উচ্চারণে মিষ্টি লাগে জয়িতার। পিউকে বুকের ভেতর টেনে এনে বলল, -‘হ্যাঁরে যেতেই হবে। আমার অফিস আছে তো।’
জয়িতার বুকের ভেতর থেকে মুখ বের করে চোখ উঁচু করে তার দিকে তাকিয়ে সরল মনে প্রশ্ন পিউয়ের, – ‘তুমি চলে গেলে আমি কার কাছে গল্প শুনবো? কার কাছে ঘুমোবো? অফিসে বলে দাও। লক্ষ্মী পুজো পর্যন্ত তোমার ছুটি। আমরাও তো থাকব ততদিন।’
পিউর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল জয়িতা, -‘পারলে কি আর থাকতাম না রে? মা-বাবার কাছে শুবি, সব সময় যেমন শোস্।’
-‘সে তো বাড়ি গিয়ে। মা তো তোমার মতো গল্প বলবে না। শুধু বলবে দুষ্টুমি অনেক হয়েছে সারা দিন। এবার লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে ঘুমো। আর আমাকে চুপচাপ ঘুমাতে হবে।’
-‘আমি আবার আসবো তো। আবার অনেক গল্প বলবো তোকে।’
জয়িতার থাকার ব্যবস্থা সোনুর সঙ্গে করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিনই পিউ জয়িতার সংগে ঘুমোনোর আবদার ধরে। যুক্তি ছিল দিদি যদি ঘুমোতে পারে তবে সেও নাকি পারবে। পিউয়ের মা বাবা বাধা দিলে জয়িতাই বলেছিল, -‘আমার কোন অসুবিধা হবেনা কাকিমা। বরং এমন মিষ্টি মেয়েটা পাশে শুলে আমার ভালোই লাগবে। তোমার আপত্তি না থাকলে আমিও চাই ও আমার সঙ্গে ঘুমোক। ওই অত বড় খাটে তো জায়গার অভাব নেই।’
পিউর মা পৃথা তার পরে আর আপত্তি করেনি। বাড়ির এই ভিড়ের মধ্যে পুজোর কটা দিন স্বামীর সঙ্গে একা শোবার সুযোগটা একটা কারণ হতে পারে অবশ্য।
-‘আচ্ছা তুমি তো মিষ্টিদাকে বিয়ে করছো। তাহলে এখন আমাকে সেই দুষ্টু রাজা আর ভালো রাজপুত্রের গল্পটা আবার বল।’ নিষ্পাপ মনে জয়িতার ভবিষ্যৎ জানিয়ে দিয়ে গল্পের ফরমাশ দিলো পিউ। মনে মনে ভাবল জয়িতা – এত সহজ যদি জীবন হতো। হয়তো হয় অনেকের, কিন্তু সেই ভাগ্য তার নয়। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে হেসে বলল, – ‘ঠিক আছে সোনা। তুই চোখ বন্ধ কর। আমি গল্প বলছি।’
-‘আচ্ছা।’ বলে জয়িতার বুকে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করলো পিউ। জয়িতা গল্প বলতে শুরু করল। সারাদিনের হইচইয়ে ক্লান্ত পিউ অবশ্য দু’এক মিনিটের মধ্যেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়।ল।
পিউয়ের ও পাশে খাটের ও ধারে শুয়ে সোনু চুপচাপ শুনছিল ওদের কথা। এবার তার দিকে চেয়ে চাপা গলায় বলল জয়িতা, -‘কি রে ঘুমোবি না? বাতিটা নিভিয়ে দিই?’
-‘হ্যাঁ ঘুম পাচ্ছে তো।’
উঠতে গিয়ে বাধা পেল জয়িতা। ঘুমের মধ্যেও আঁকড়ে ধরে আছে পিউ। নিরুপায় জয়িতা সোনু কে বলল, -‘তুই উঠবি? আমি উঠলে পিউ জেগে যাবে।’
উঠে বাতিটা নিভিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল সোনু। মাঝ রাতের নীরবতায় নিজের জীবনের জটিলতায় আবার ঘিরে যাচ্ছিল জয়িতা। হঠাৎ সোনুর কথায় বর্তমানে ফিরে এলো।
-‘জয়িতাদি। একটা কথা বলি?’
– ‘বল না।’
-‘তুমি মিষ্টিদাকে বিয়ে করছ তো?’
-‘ জানি না। ঠিক করিনি রে।’
-‘কেন জয়িতাদি? মিষ্টিদা খুব ভালো ছেলে। বিশ্বাস কর।’ নিজের দাদাকে সুপাত্র প্রমাণ করার কি কি যুক্তি দেবে সোনু তার অপেক্ষা না করে জয়িতা বলল, – ‘তোর মিষ্টিদার মত ছেলে খুব কম হয় রে। আর সেই জন্যেই ওর আমার চেয়ে অনেক ভাল কাউকে বিয়ে করা উচিত।’
সোনু বাধা দিল। -‘কি বলছ জয়িতাদি। তুমিও তো কত ভালো। আমরা সবাই তো চাই ও তোমাকে বিয়ে করুক। কেন করবে না?’
চুপ করে একটু ভেবে নিয়ে বলল জয়িতা, – ‘তুইতো এখন বড় হয়ে গেছিস। তাই তোকে বলছি। আমার আগে বিয়ে হয়েছিল। ডিভোর্স হয়ে গেছে।’
এবার অনেকক্ষণ কথা বলল না সোনু।
তারপর প্রশ্ন করল, -‘মিষ্টিদাকে বলেছ?’
-‘হ্যাঁ, ও জানে।’
-‘তাহলে আর কি? আর কাউকে না বললেই হলো। বিয়ের পর যদি জানতে পারে তখন আর কি হবে?’
সোনুর সহজ সমাধানের উত্তরে কি বলবে বুঝতে পারছিল না জয়িতা। বলল, – ‘তুই তো বড় হচ্ছিস। আস্তে আস্তে বুঝতে পারবি জীবন অত সহজ নয়। তবে একটা কথা বলি জীবনে মনে রাখিস – বিয়ে কেবল দুটো মানুষের মধ্যে হতে পারে। কিন্তু সেটা যদি সুখি এবং স্থায়ী হতে হয় তবে সেই দুটো মানুষের পরিবারের কাছে সেই বিয়ে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। তাছাড়া সব সময় মনে রাখবি মিথ্যে বলে বা লুকিয়ে কোন সম্পর্ক টেঁকে না। তার চেয়ে সম্পর্কটা না হওয়া ভালো।’
সোনুর চুপ করে থাকা থেকে জয়িতা বুঝতে পারলো, এ বিয়ে যে এই পরিবারে গ্রহণযোগ্য নয় সেটা সোনু এই বয়সেও বুঝতে পারছে। চমকে গেল তার পরের মন্তব্যে, -‘তুমি কাউকে বলো না। আমি মিষ্টিদাকে কথাটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বলেছে বিয়ে করলে ও শুধু তোমাকেই করবে।’
জয়িতা এই মন্তব্যের আনন্দটায় বুক ভরবে না নিজের জীবনের জটিলতায় বিষণ্ন হবে বুঝতে পারছিল না।
-‘জীবনটা এত সহজ হলে তো আর কথাই ছিল না রে। অনেক রাত হল এবার ঘুমো।’
-‘হ্যাঁ জয়িতাদি। তুমিও ঘুমোও। মিষ্টিদা যখন বলেছে, দেখো ঠিক তোমাকে বিয়ে করবে।’ দাদার ওপর অগাধ ভরসায় জয়িতার প্রেম কাহিনীর হ্যাপি এন্ডিং করে দিয়ে ও পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল সোনু।
গভীর ঘুমে ডুবে থাকা পিউর হাতটা আলতো করে সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস চেপে চিৎ হয়ে শুল জয়িতা। পরস্পর বিরোধী একরাশ অনুভূতির ভিড়ে আবার নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলো এই অচেনা বাড়িতে। অথচ এও বুঝতে পারছিল এই পরিবারের সদস্যদের স্নেহভালোবাসায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়ে তার ভুলে থাকা স্বপ্ন গুলো আবার জেগে উঠছে। সোনুর নিঃশ্বাসের শব্দে বুঝতে পারল ঘুমিয়ে পড়েছে সে।
হঠাৎ পাশের টেবিলের ফোনের স্ক্রীনটা জ্বলে উঠলো। পাশ ফিরে হাত বাড়িয়ে দেখল – অরুনের মেসেজ, “আজ তোমার আরেকটা রূপ দেখলাম। আর একটু বেশি ভালোবাসলাম। কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে? মাঝ রাস্তায় হাত ছেড়ো না। ভালবাসি, ভালবাসব।”
একরাশ ভালোবাসায় দ্বিধা, ভয় সব ভুলে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল জয়িতার। কিন্তু এত দিনের ভয়ের অভ্যেস ভারী শিকলের মত তার অনুভূতির পায়ে জড়িয়ে এগোনোর পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। উত্তর লিখল – “স্বপ্ন দেখিও না। ভেঙে গেলে হাত ছাড়ার শক্তিটুকুও থাকবে না। পথ চলা তো অনেক দূরের কথা।”
এবার ফোনটা বেজে উঠল। অরুণ কল করেছে। রাতে সাইলেন্ট করা থাকে বলে বাচ্চা দুটোর ঘুমের ব্যাঘাত হলো না। কলটা তুলে ফিসফিস করে বললো, – ‘একটু ধরো।’
অন্ধকারেই নিঃশব্দে উঠে, খুব সাবধানে দরজা খুলে বাইরের বারান্দায় এসে বলল, -‘ঘুমোও নি এখনও।’
-‘না তো। আমার বাড়িতে তুমি আছো তবু ওই ভিড়ের মধ্যে সবাই তোমাকে দখল করে বসে রয়েছে। এই কদিনে ক’বার তোমাকে একা পেলাম বলো তো?’
কথাটা সত্যি – কেউ না কেউ বারবার তাদের একা থাকায় বাগড়া দিয়েছে। ইচ্ছে করে নয় অবশ্য। আর নিজের মনের ভালো লাগার দুর্বলতা আর হারাবার ভয়ে জয়িতাও নিজেকে দূরে রেখেছে অরুণের কাছ থেকে।
আজ এই নিশুতি রাতে তার ইচ্ছে করছিলো একবার একান্তে অরুণের কাছে যেতে। বলল, – ‘কি করছো তুমি?’
-‘তোমাকে দেখছি। অন্ধকারে যদিও ভালো করে দেখতে পাচ্ছি না।’
অবাক হয়ে চারদিকে দেখল জয়িতা। -‘সেকি কোথায় তুমি?’
-‘বাঁ দিকে উপরে দেখো।’ অরুণ বলল।
বারান্দা থেকে বাইরে ঝুঁকে দেখল জয়িতা ওপরে ছাতের খিলানের ওধারে একটা সিলুয়েট দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয় অরুণ। হাত নাড়ছে। -‘ছাতের সিঁড়িটা দেখেছো তো। উঠে এসো না।’
কিছু আর ভাবতে ভালো লাগছিল না জয়িতার। “কেন চিরকাল সুখের ভয়ে পালিয়ে বেড়াব। আজ এই একটা রাত আমার প্রাপ্য।”
সব ভয়, দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে, বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাতে উঠে গেল সে। অনুভব করল বুকের ভেতর ধক্ধক্করছে তার। সব ভয়, সংযম, নিজেকে বেঁধে রাখার ক্ষমতা, অরুণের ডাকে হারিয়ে গেছে কোন এক অন্য জীবনের অন্ধকারে।
এই নিশুতি রাত তার জীবনে নতুন আলোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসছে যেন। কত কিছু বলার ছিল, শোনার ছিল দুজনের একে অন্যকে। নিজেকে ছিঁচকাঁদুনে কথায় কথায় চোখের জলে ডুবে যাওয়া মেয়ে হিসেবে জয়িতা কোনদিন হতে দেয় নি। কিন্তু ধীরে ধীরে আবছা রাতের আলোয় অস্পষ্ট অরুণের কাছে এগিয়ে যেতে যেতে জয়িতা বুঝতে পারছিল, তার চেতনার সমস্ত সুপ্ত অনুভুতি গুলো বাঁধভাঙা জোয়ারের মত ভাসিয়ে দিচ্ছে তাকে। কোন কথা, কোন প্রশ্ন উত্তরের জায়গা নেই আর। অরুণের দুহাতের নিশ্চিন্ত বেস্টনীতে ধরা দিয়ে এই প্রথম তার চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আলোর দিশা নিয়ে এলো এই মানুষটার একান্ত আপন হয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছে।
পুরুষ সান্নিধ্যে বহুকাল নির্লিপ্ত থাকা জয়িতার মনকে ঘিরে থাকা, যে সমস্ত বাধা, সংযম ভয় আর আশঙ্কার পরত গুলো ছিল, অরুণের তৃষিত ঠোঁটের ছোঁয়ায় এক এক করে মিলিয়ে যেতে লাগল। হারিয়ে ফেলা নারীত্বের এই প্রথম জেগে ওঠায় ভুলে গেল জয়িতা, ক্ষত ভরা অতীতের সব যন্ত্রণা।
ক্রমশ..
❤ Support Us








