- ধা | রা | বা | হি | ক
- ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২২
লঙ্কাগড়ের লঙ্কাকাণ্ড
পর্ব- ১৭
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাংলার নাড়াজোল রাজবংশ । সেই রাজবাড়ির পরিখায় তরবারি হাতে পাহাড়া দিতেন স্বয়ং দেবী জয়দুর্গা । জনশ্রুতি তাঁর অসির জ্যোতিতে অত্যাচারি ইংরেজরা চোখ ঢাকত। বর্গীরাও এই জনপদের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারতো না। সেই দেবী জয়দুর্গার অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে এই ধারাবাহিক…রাজবাড়িতে পৌছে রঙ্গীল লক্ষ করল অমূল্যজ্যেঠু সেই মিষ্টিতে বিষ মেশানোর ঘটনা ধরার পর থেকে বেশ মুষড়ে পড়েছেন।কোনও কিছুতেই যেন তেমন উৎসাহ নেই।সুনন্দাদিদি জ্যেঠুর হাতে জয়দুর্গার মূর্তি ফিরিয়ে দিতেই তার চোখে এক মুহূর্তে যেন আশার আলো জ্বলেই নিভে গেল।সুনন্দাদিদি অমূল্যজ্যেঠুকে চন্দনের কথা,অবনীকাকু ও গোপালকাকুর গোপন ষড়যন্ত্রর কথা,সব একে একে বলল।সেসব শুনে জ্যেঠু যেন আরও ভেঙে পড়লেন।তারপর বললেন।−ক্ষয় যখন অতিমারীর মতো চারিদিকে ছড়িয়ে যায় তখন ঠিক এমনটাই হয়।ওদের নিজের পরিবারের মতো আগলে রেখেছিলাম।আমারই ভুল।চন্দনের দায়িত্ব আমার আগেই নেওয়া উচিত ছিল।মা জয়দুর্গা আমার চোখ খুলে দিলেন।যাক।মা ফিরে এসেছেন।বামাচরণকে ডাকো।ও মাকে শুদ্ধিকরণ করে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করুক।জ্যেঠুর বিষণ্ণতা দেখে রঙ্গীলরা তখনই সেই ছবিগুলোর কথা কিছু বলল না।কিন্তু আড়চোখে সে দেখল তিন্নি সাদাপাতা নিয়ে ছবিগুলো আঁকতে বসে গেছে।দুপুর দুটোর সময় রথ ছাড়বে।এরই ভিতর রাজবাড়ির উঠোনে বেশ লোক সমাগম হয়ে গেছে।তাদের অনেকেরই মুখে মুখোশ নেই।রঙ্গীল ভাবতে থাকে।এখন আয়রন ম্যান এলে তাকেও বোধহয় মুখোশ পরেই আসতে হতো।ভাবতে ভাবতে অজান্তেই তার চোখ চলে যায় তিন্নির আঁকা প্রথম ছবিটার দিকে।একটা চাঁদ।তার পাশে সেই গরুর পূরাণের ঘোড়াটা।সেই ঘোড়ার মুখ সূর্যের দিকে ফেরানো।তারপর পর পর সাজানো তিনটি তির।তবে কি মথুরামোহন গুপ্তধন সন্ধান করতে সন্ধ্যাবেলায় বার হতে বলছেন।জোছনা রাতে।কখন যে পিছনে বাপি এসে দাঁড়িয়েছে সে বুঝতে পারেনি।−বাপি।তবে কি রাতের বেলাতেই চাঁদের দিকে আমাদের হাঁটতে হবে?কিন্তু তাহলে সূর্যর ছবি দেবার অর্থ কী?বাপি হেসে বলল,”নাও হতে পারে রঙ্গীল।আমার মনে হয় এই ছবি আরও গভীরে আমাদের প্রবেশ করতে হবে।কোনও বিষয় সম্পর্কে সত্যিই জানতে গেলে তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা চিন্তার কম্পাঙ্কর সঙ্গে নিজের চিন্তার কম্পাঙ্ক মেলাবার চেষ্টা করতে হবে।আগেকার দিনে একেই মানুষ ‘টেলিপ্যাথি’ বলত।−সেই সোনার কেল্লার ফেলুদার মতো?−ঠিক তাই।ভাববার চেষ্টা করো রঙ্গীল।মথুরামোহন একজন ধার্মিক মানুষ।একটি যাত্রার প্রথম সূত্র সে কি কোনও ঠাকুরকে স্মরণ না করেই রেখে যাবে?−তবে?−তবে যাকে তুমি চাঁদ ভাবছ,সে আসলে চাঁদ নয়।সে একটি রীতি।’চাঁদনি’ রীতি।সেই রীতিতে তৈরি দুটি মন্দির এই রাজবাড়ির আশপাশেই আছে।প্রথমটি নাড়াজোল গড় পরিখার উত্তরপশ্চিম কোণে থাকা রায়েদের দুর্গামন্দির।আর দ্বিতীয়টি এই রাজবাড়ির ঠাকুরবাড়ি সংলগ্ন সীতারাম জিউর মন্দির।এখানে আসবার আগে আমি ন্যাশানাল লাইব্রেরিতে আগেই পড়ে এসেছি।তিন্নি বলে,”তাহলে কোন মন্দিরটার কথা মথুরামোহন বললেন মেসো?”বাপি মাথা চুলকে বলে,”সম্ভবত দ্বিতীয়টি।এই চাঁদনি রীতিতে তৈরি মন্দির অযোধ্যা থেকে বেলেপাথর এনে ১৮১৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রাজা মোহনলাল খান।তখনকার সময় এই মন্দির তৈরিতে খরচ হয় এক লক্ষ টাকা।এই মন্দিরের দেববিগ্রহ রাম,সীতা,লক্ষণ,ভরত,শত্রুঘ্ন নিয়েই তো আজকের রথযাত্রা।রাজা মোহনলালের পৃষ্ঠপোষকতাতেই এই রথযাত্রার শুরু।রঙ্গীল আর তিন্নি চমকে ওঠে।বাপি বলে চলে।−মথুরামোহন এভাবেই সুকৌশলে তার সূত্র লেখার আগে ঠাকুরের কাছে তার প্রণাম সেরে নিয়েছেন।বৈদিক মতে একে বলে ‘মঙ্গলাচরণ’।এবার আমাদের কাজ হলো সেই সীতারাম জিউর মন্দিরের কাছে যাওয়া।কিন্তু তা কী করে সম্ভব।রাজা মোহনলাল খান ঠিক যেই মন্দির থেকে রথযাত্রার সূচনা করেন,আজ ঠিক তার সামনেই তো নাড়াজোলের সুপ্রাচীন রথ দাঁড়িয়ে।সেখানে লোকে লোকারণ্য।যাবার উপায় নেই।−’উপায় একটা আছে।চলো উপরে রাজবাড়ির বারান্দায় যাই আমরা।সেখানে দূর থেকে রথকে দেখতে পাবো আমরা।সেখান থেকে যদি কিছু সমাধান বের হয়।’বাপি বলে।রঙ্গীল তিন্নি আর বাপি রাজবাড়ির দোতলায় উঠে আসে।সেখান থেকেই সত্যিই সীতারাম জিউর মন্দির আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুসজ্জিত নাড়াজোলের রথ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।রথের ওপর রোদ এসে পড়েছে।হঠাৎ রঙ্গীলের মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল।রথের সামনে ঠিক ওই ছবিতে আঁকার মতোই একটি ঘোড়ার মূর্তি রয়েছে।−আচ্ছা বাপি।ওই ঘোড়াটা যদি গরুরপুরাণের ঘোড়া না হয়ে নাড়াজলের রথযাত্রার রথের ঘোড়া হয়?তিন্নি বলে ওঠে,”তাহলে সূর্য?”রঙ্গীল বলে,”সূর্য যেদিকে ওঠে সেটা পূর্ব দিক।এখন আমাদের দেখতে হবে ওই ঘোড়াগুলি যেদিকে মুখ করে আছে সেটা কোন দিক।রঙ্গীলের বাপির ফোনে কম্পাস থাকে।সেই কম্পাস মিলিয়ে দেখা গেল ওই দিকটা পূর্বদিক।সকলে ধাঁধা সমাধানের আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে।রঙ্গীল বলে।−এইবার তিনটে তিরের কী অর্থ।বাপি বলে,”পঞ্চবাণের তিন বাণ নয়তো?”−পঞ্চবাণ কী হয় মেসো?তিন্নি বলে।বাপি একটু হেসে বলে।−আমরা যখন ছোট ছিলাম আমাদের সংখ্যা চেনানো হতো এইভাবে।একে চন্দ্র,দুইএ পক্ষ,তিনে নেত্র,চারে চতুর্বেদ আর পাঁচে পঞ্চবাণ।কন্দর্পর এই পাঁচ বাণের নাম সম্মোহন,উন্মাদন,শোষণ,তাপন,স্তম্ভন।মতান্তরে তারা হলো পদ্ম,অশোক,আম্র,নবমল্লিকা,রক্তো ৎপল। −তার মানে তৃতীয় বাণ।’শোষণ’ বা ‘আম্র’!−আম্র মানে তো ‘আম’।তাই না দাভাই?−ঠিক বলেছিস তিন্নি।আমাদের ওই রথ ধরে পূবদিকে হেঁটে যেতে হবে।যতোক্ষণ না আমবাগান মেলে।রঙ্গীলদের কথোপকথনে এবার যোগ দেয় মাম আর সুনন্দাদিদি।−আমবাগান অবশ্যই হবে।আপাতত আমাদের দুজনের দুপুরের ভোজনে আমের চাটনিটি কেমন হয়েছে খেয়ে বলো তোমরা।সকলে নিচে খাবার ঘরে নেবে আসে।সেখানে অনেক পদ।তবে রামনবমীর দিন বলে আজ নিরামিষ।খেতে খেতেই রঙ্গীল ভাবতে থাকে।এতোবছরের পুরনো আমবাগান কি আজ আর থাকবে?নিশ্চয়ই সেসব কেটে বাড়ি হয়ে গেছে।তাহলে তারা পরবর্তী সূত্রে পৌছোবে কীকরে?সুনন্দাদিদিকে একথা জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়!দিদি অবশ্য শুনেই বলল,”এমন একটি আমবাগান ওইদিকটায় ছিল।সে এক বিশাল আম্রবন।শেষ খুঁজে পাওয়া যেত না।আমাদের ওদিকে যাওয়ার নিষেধ ছিল।সবাই ভয় দেখাত।ওই বনে যে একবার যায় সে আর ফেরে না!”−সে কি।কী ভয়ানক।মাম বলে ওঠে।−তবে আজ মেরেকেটে আটদশটা গাছ অবশিষ্ট আছে।বেশির ভাগ বন এখন হাসপাতালের জমিতে পড়ছে।−সুনন্দাদিদি।আমাদের বিকেলে ওই বনটা যেখানে ছিল,সেইখানে নিয়ে যেতে পারবে?আমাদের রহস্যর প্রথম সূত্রে ওই বাগানটাই ইঙ্গিত করছে।−কেন পারব না ? তাছাড়া আজ বিকেলে তো চন্দনও আসবে।চন্দন এতোটা ধাঁধা সমাধান করতে পেরেছে যখন,ওর বুদ্ধি আমাদের বাকিটুকুতেও অনেক সাহায্য করবে।আর তাছাড়া আমি মনস্থির করেছি।এই রহস্য সমাধান হোক বা না হোক।চন্দন এবার থেকে এই রাজবাড়ির পরিবারের একজন।ও এখানেই থাকবে।কথোপকথনের ভিতরেই মামের বকুনি খেয়ে সকলে খাওয়ায় মন দিল।আড়চোখে দেখা গেল মাম আর সুনন্দাদিদি বকুনি দিয়ে বেশ নিজেদের মধ্যে মিটিমিটি হাসছে।ক্রমশ..
❤ Support Us








